শেকৃবির হলে মাদকের আসর, প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ শিক্ষার্থীদের
বিজয়-২৪ হল ও নবাব সিরাজউদ্দৌলা হলের ছাদে রাতে গানের আসরের আড়ালে গাঁজা ও মদ সেবনের অভিযোগ
ঢাকা জেলা প্রতিনিধি · ঢাকা
প্রকাশ:
রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শেকৃবি) মাদকের প্রসারের অভিযোগ উঠেছে। ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোর অবস্থা সবচেয়ে বেশি খারাপ হয়েছে। গানের আসরের নামে হলের ছাদে ও কিছু নির্দিষ্ট কক্ষে নিয়মিত গাঁজা সেবনের আসর চলে। মদ, ফেনসিডিল ও ইয়াবা সেবনের তথ্যও বিভিন্ন সূত্রে মিলেছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, প্রশাসন দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা ভয় ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে আছেন।
বিজ্ঞাপন
অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২২ শে ডিসেম্বর ২০২৫ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলো মাদকবিরোধী মানববন্ধন করে এবং উপাচার্যের কাছে লিখিত অভিযোগ দেয়। তারা ৬ দফা দাবিতে স্মারকলিপিও জমা দিয়েছিল। শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, এরপরও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি।
একাধিক সূত্র ও ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা জানান, ছেলেদের হলগুলোর মধ্যে বিশেষ করে বিজয়-২৪ হল ও নবাব সিরাজউদ্দৌলা হলের ছাদ গভীর রাত থেকে মাদকসেবীদের দখলে থাকে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছোট-বড় ১০ থেকে ১২টি মাদকচক্র তৈরি হয়েছে। এগুলো প্রতিদিন ভিন্ন ভিন্ন স্থানে আসর জমায়। কোনো কোনো চক্রে ২০ থেকে ৩০ জন একসঙ্গে বসে গানের আসরের আড়ালে গাঁজাসহ নানা মাদক সেবন করে।
বিজয়-২৪ হলের ১০ তলার এক আবাসিক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করে জানান, ‘৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে মাদকের অবস্থা ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। ভোররাত পর্যন্ত এসব মাদকাসক্তদের আসা-যাওয়া চলে। নেশাগ্রস্ত অবস্থায় তারা প্রায়ই অস্বাভাবিক আচরণ করে ও উচ্চস্বরে চিল্লাচিল্লি করে। হলের ছাদ এখন সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য ভীতিকর জায়গা। লিফটে উঠলেই গাঁজার তীব্র গন্ধ পাওয়া যায়। তারা এতটাই সংগঠিত ও উগ্র যে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ভয়ে প্রতিবাদ করার সাহস পায় না।’
নিরাপত্তারক্ষীরাও নিজেদের চরম অসহায় বলে জানিয়েছেন। তাদের কথায়, মধ্যরাতে অনেক শিক্ষার্থী দল বেঁধে ছাদে ওঠেন, কয়েক ঘণ্টা পর নেমে আসেন। তাদের আচরণ আর শারীরিক অবস্থা দেখেই মাদক সেবনের বিষয়টি পরিষ্কার বোঝা যায়।
বিজ্ঞাপন
এক মাদকসেবীর বর্ণনা অনুযায়ী, ক্যাম্পাসের মাদকের বড় অংশ আসে মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প, আগারগাঁও সংগীত কলেজ এলাকা, পুরনো বাণিজ্য মেলার মাঠসংলগ্ন এলাকা, ৬০ ফিট, মিরপুর শেওড়াপাড়া ও ঢাকা কলেজ এলাকা থেকে। ক্যাম্পাসের কিছু শিক্ষার্থী বহিরাগত মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে এ কারবার চালাচ্ছে। জিয়া উদ্যানের সামনের ফাঁকা মাঠ ও কলেজ গেটের চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গেও তাদের ঘনিষ্ঠতা আছে। গাঁজা ও মদের পাশাপাশি ইয়াবা ও ফেনসিডিলের ব্যবহারও আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে, আর এর কেন্দ্রবিন্দু এখন ‘বিজয়-২৪ হল’।
প্রশাসন সূত্র ও অনুসন্ধানে জানা যায়, বিজয়-২৪ হলের ২১ ও ২২ ব্যাচের কয়েকজন শিক্ষার্থীর মাদক সেবনের অভিযোগ পেয়ে প্রক্টর একদিন দুপুরে ছাদে অভিযান চালান। সেখানে মাদক মেলেনি, কিন্তু মাদকের গন্ধ ছিল; তাই লিখিত নিয়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। এরপর ওই শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধেই মাদক কেনাবেচা ও সেবনের নতুন অভিযোগ ওঠে। এ চক্রের একজন এখন রিহাবে চিকিৎসা নিচ্ছেন। অভিযোগ আছে, অভিযুক্তরা গুরুতরভাবে মাদকে আসক্ত হওয়ার পাশাপাশি ক্যাম্পাসে মাদক সরবরাহের কাজেও সক্রিয়।
এর আগে পুকুরপাড়ে মদ্যপানের সময় হাতেনাতে ধরা পড়ার পরও তাদের কাছ থেকে লিখিত মুসলেকা নিয়ে ছেড়ে দিয়েছিলেন প্রক্টর।
সাধারণ শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, মাদকবিরোধী অভিযানে প্রশাসন পুরোপুরি ব্যর্থ ও উদাসীন। বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, প্রক্টর ও হল প্রভোস্টদের বারবার বলেও কোনো সুরাহা হয়নি। ফোন করলে প্রক্টর অনেক সময় আসার আশ্বাস দেন, কিন্তু পরে আর ফোন ধরেন না। ট্রেজারার ও উপাচার্যকে (ভিসি) জানানো হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ মেলেনি।
বিজ্ঞাপন
বিজয়-২৪ হলের শিক্ষার্থী মো. জাহিদ হাসান (২২ ব্যাচ) বলেন, ‘বিজয়-২৪ হল এখন মাদক সেবনের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। জুনিয়র থেকে সিনিয়র—সবাই মাদকের সার্কেলে জড়িয়ে পড়েছে। হলের ছাদ ও লিফটে গাঁজার গন্ধ পাওয়া যায় এবং বহিরাগতদের এনেও মাদকের আসর বসানো হয়। প্রশাসনের উদাসীনতায় মাদকের প্রসারের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ও মানসিক অবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে।’
নবাব সিরাজউদ্দৌলা হলের শিক্ষার্থী মো. আরাফাত হোসেন (২৫ ব্যাচ) বলেন, ‘গভীর রাতে গানের আসরের আড়ালে মদ ও গাঁজার আড্ডা বসে, যা এখন ব্যবসায় রূপ নিয়েছে। বিকেলে সেন্ট্রাল ফিল্ডসহ ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের উপদ্রব বাড়ে। এটি জ্ঞানচর্চার পরিবেশ ও জাতি ধ্বংস করছে। মাদকের বিরুদ্ধে প্রশাসনের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।’
শেরেবাংলা হলের শিক্ষার্থী সাকিব তালুকদার (২৪ ব্যাচ) বলেন, পুরো ক্যাম্পাসে মাদক ছড়িয়ে পড়লেও তা দেখার কেউ নেই। রাতে ছাদ, নির্জন জায়গা ও কক্ষে কক্ষে গানের আড্ডার নামে দেদার মাদক সেবন চলছে। তার দাবি, হলের অনেক ক্যান্টিন বয়ও মাদকাসক্ত এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের যোগসাজশ রয়েছে।
ফ্যাকাল্টি অব এগ্রিকালচারের শিক্ষার্থী মো. রাফিউল ইসলাম রিশন (৮২ ব্যাচ, ২০২২-২০২৩ সেশন) বলেন, অনেকের কাছে মাদক এখন নেশা নয়, পেশা। কিছু ড্রপআউট শিক্ষার্থী জুনিয়রদের ভুলিয়ে-ভালিয়ে মাদকে জড়িয়ে ব্যবসা বাড়াচ্ছে। তার মতে, রুম বা বারান্দায় মাদক বা এর সরঞ্জাম পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে। সুস্থ ও সুন্দর ক্যাম্পাসের জন্য মাদকমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. আরফান আলী মাদক বিস্তারের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘যখনই খবর পাই, সঙ্গে সঙ্গে যাই। কিন্তু হাতেনাতে ধরা যায় না, আমরা পৌঁছানোর আগেই তারা ছাদ থেকে সরে যান। তবে তাদের নামের তালিকা আমাদের কাছে আছে, শিগগিরই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর আগেও আমরা কয়েকজনকে শাস্তির আওতায় এনেছি।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. আব্দুল লতিফ জানান, ‘আমরা মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স। মাদকসহ ধরা পড়লে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। আমরা প্রতিদিন রাতে বিশ্ববিদ্যালয় টহল দিই এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে বহিরাগত প্রবেশ রাতে সম্পূর্ণ নিষেধ করে দেওয়া হয়েছে।’