কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় লালন তিরোধান উৎসবের দ্বিতীয় দিন
ফকির-সাধুদের সাধন-ভজন ও গানবাজনায় বেগুনাকৃত আখড়াবাড়ি প্রাঙ্গণ
কুষ্টিয়া জেলা প্রতিনিধি · কুমারখালী, কুষ্টিয়া
প্রকাশ:
রোববার কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় ফকির লালন শাহর ১৩৬তম তিরোধান দিবসের তিন দিনের আয়োজনের দ্বিতীয় দিন উৎসবমুখর পরিবেশে অতিবাহিত হয়। আখড়াবাড়ি প্রাঙ্গণে ছোট ছোট আসরে ফকির-সাধুরা তাঁদের সাঁইজি লালন শাহকে স্মরণ করেন। হেমন্তের সকালে সুরাইয়া মরিয়ম সাদা শাড়ি পরে বসে সুর তুলে গান গাইছেন, পাশে অন্য একজন একতারা বাজাচ্ছেন। নরসিংদীর পলাশ উপজেলার বালিয়া গ্রামের সুরাইয়া জানান, ‘সাঁইজির কথা ভালো লাগে। এবার কবুল হয়েছে, তাই আসতে পারছি। আনন্দ লাগছে, জানডা শীতল হয়ে গেছে।’
বিজ্ঞাপন
খুব সকালে গোষ্ঠগানের মধ্য দিয়ে ফকিরদের আচার শুরু হয় এবং সকালে ‘বাল্যসেবা’ পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। এই পর্বে কয়েকজন বাউল ‘ভেক গ্রহণ’ করেন এবং পায়েস-মুড়ি খেয়ে গানবাজনা ও তত্ত্ব আলোচনা করা হয়। দুপুরে নারী-পুরুষের অনেকেই কালী নদীতে রাজঘাটে গোসল করেন। দুপুরে ‘পূর্ণ সেবা’ অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে সাদা ভাত, ইলিশ মাছ, কলাইয়ের ডাল, সবজি ও দই পরিবেশন করা হয়। বিকেলেই শেষ হয় ২৪ ঘণ্টার সাধুসঙ্গ, তবু গানবাজনা ও মরমি আলোচনা চলতে থাকে।
আখড়াবাড়ি ঘুরে দেখা যায়, কেউ আপন মনে বাশি বাজাচ্ছেন, কেউ আঁকছেন লালনের ছবি এবং কেউ বাজাচ্ছেন দোতারা, একতারা, মন্দিরা ও ডুগি। এবারের সমাগম গত তিরোধানের আয়োজনের তুলনায় একটু কম ছিল। ৭০ বছর ধরে আখড়াবাড়িতে থাকা রাজবাড়ীর কালুখালীর আবদুল শাহ ফকির জানান, আগে ধামে গাছগাছালি এবং ছোট দুটি খড়ের ঘর ছিল, যেখানে চার-পাঁচটা আসর বসত, এখন কত ভিড় ও বিভিন্ন দেশের মানুষ আসেন। নাটোর থেকে আসা নূর মোহাম্মদ বলেন, ‘মনের টানে আসা। লালনের কথা জানলে বা শুনলে হবে না, অন্তরে ধারণ করতে হবে। চর্চা করতে হবে, সাধন-ভজন করতে হয়। কেউ যদি তাঁর কথা অনুসরণ করেন, তাঁর জীবন ধন্য হবে।’
বিকেলের পর কয়েকজন ফকির-সাধু আখড়াবাড়ি ছেড়ে যেতে দেখা যায়। তাঁরা মন্তব্য করেন, আত্মার সম্মিলন শেষে নিজের ডেরায় যাওয়ার সময়ও তৃষ্ণা থেকে যায়। উদ্বোধনী রাতে শিল্পী বিউটিসহ লালন একাডেমির শিল্পীরা গান গান। গতকাল আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন খুলনা বিভাগীয় কমিশনার আবদুল্লাহ হারুন। লালন একাডেমির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন-হাসানের সভাপতিত্বে সম্মানিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন লেখক-চিন্তক ফরহাদ মজহার। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে আজ সোমবার সন্ধ্যায় আলোচনা ও রাতে মঞ্চে গানের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের আয়োজন।