জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আমদানি ও বিকল্প উৎসে জোর
নতুন করে ৯টি এলএনজি কার্গো কেনার সুপারিশ, ৩১০ কোটি ডলারের ঋণসুবিধা অনুমোদন
অর্থনীতি ডেস্ক · ঢাকা
প্রকাশ:
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং লোহিত সাগরকেন্দ্রিক অনিশ্চয়তার মধ্যে দেশের জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আমদানি ও বিকল্প উৎসের ওপর জোর দিচ্ছে সরকার। জ্বালানি তেল আমদানির সঙ্গে সঙ্গে এলএনজি কেনার একাধিক উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। নাইজেরিয়া, নরওয়ে, মালয়েশিয়া ও আলজেরিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল আনার সম্ভাবনাও যাচাই করছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।
বিজ্ঞাপন
সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি এলএনজির সরবরাহ নিশ্চিত করতে নতুন করে ৯টি কার্গো কেনার প্রস্তাব অনুমোদনের সুপারিশ করেছে। ট্রাফিগুরা পিটিই লিমিটেডের কাছ থেকে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে এসব কার্গো কেনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) ভার্চুয়ালি হওয়া কমিটির ৪৯তম সভায় এ সুপারিশ আসে।
জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের প্রস্তাব অনুযায়ী, সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) ব্যবস্থায় এই এলএনজি কেনা হবে। দাম নির্ধারণের প্রস্তাবিত সূত্র হলো জেকেএম সূচকের চেয়ে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটে (এমএমবিটিইউ) শূন্য দশমিক ১০ ডলার কম। উভয় পক্ষ রাজি থাকলে কার্গোর সংখ্যা কমবেশি করার সুযোগও রাখা হয়েছে।
একই দিন অনুষ্ঠিত অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির ২০২৬ সালের ৩৩তম সভায় এলএনজি কেনার আরও দুটি প্রস্তাব নীতিগতভাবে অনুমোদনের সুপারিশ করা হয়। এর প্রথমটিতে চেনিয়েরে মার্কেটিং ইন্টারন্যাশনাল এলএলপি ও ট্রাফিগুরা পিটিই লিমিটেডের সরবরাহ প্রস্তাব জিটুজি পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াকরণের কথা বলা হয়েছে।
দ্বিতীয় প্রস্তাবটি রাষ্ট্রীয় জরুরি প্রয়োজন ও জনস্বার্থে গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার জন্য। এতে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে বিপি সিঙ্গাপুর পিটিই লিমিটেড, সাহারা এনার্জি রিসোর্স লিমিটেড এবং শেল ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিং মিডল ইস্ট লিমিটেড এফজেডই থেকে এলএনজি কেনার কথা আছে।
বিজ্ঞাপন
আমদানির অর্থায়নেও উদ্যোগ চলছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের নন-কনসেশনাল ঋণসংক্রান্ত স্থায়ী কমিটি গত ৭ অক্টোবর জ্বালানি তেল ও এলএনজি আমদানির জন্য ৩১০ কোটি ডলারের ঋণসুবিধা অনুমোদন করেছে। এর মধ্যে ৬০ কোটি ডলার দেবে জেদ্দাভিত্তিক আন্তর্জাতিক ইসলামিক ট্রেড ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইটিএফসি), তাদের নিজস্ব তহবিল থেকে। বাকি ২৫০ কোটি ডলার আসবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহ-অর্থায়নে। বিপিসি জ্বালানি তেল আমদানিতে ২৫০ কোটি ডলার এবং পেট্রোবাংলা এলএনজি আমদানিতে ৬০ কোটি ডলার ব্যবহার করবে।
কাতারের সঙ্গে নতুন এলএনজি সরবরাহ চুক্তি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সৌদি আরবের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহ ও টার্মিনাল স্থাপন নিয়ে। আলজেরিয়ার সঙ্গে এলএনজি ও এলপিজি আমদানিতে সহযোগিতার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পেট্রোবাংলার এক কর্মকর্তা বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সব দেশই জ্বালানির অনিশ্চয়তায় পড়েছে এবং প্রত্যেকেই নিজের দেশের জ্বালানি নিশ্চিত করতে চাইছে। বাড়তি দাম দিয়ে হলেও সংকট কাটাতে সবাই মরিয়া। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশও সংকট কাটানোর চেষ্টা করছে, তাই নানা দেশের সঙ্গে আমদানি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
বিপিসি সূত্র জানায়, ডিসেম্বর পর্যন্ত পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে, ফলে এ সময়ে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা খুব একটা নেই। তবে আন্তর্জাতিক ও ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি মাথায় রেখে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের সম্ভাবনাও দেখা হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
বিপিসির চেয়ারম্যান ড. মো. রফিকুল ইসলাম সম্প্রতি সাংবাদিকদের জানান, স্বল্প মেয়াদে জ্বালানি তেলের সরবরাহে যেন কোনও ব্যাঘাত না ঘটে, সেটিই এখন বিপিসির প্রধান লক্ষ্য। পাশাপাশি মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি স্থানীয়ভাবে কারও নিয়ন্ত্রণে নেই, এটি মূলত একটি বৈশ্বিক সংকট। তার মধ্যেও দেশের জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখাই বিপিসির অগ্রাধিকার। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং দামে স্থিতিশীলতা ধরে রাখার চেষ্টা চলছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংকটে জ্বালানি তেল আমদানির প্রিমিয়াম বাড়া এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে পরিশোধিত জ্বালানি সরবরাহ প্রসঙ্গে বিপিসি চেয়ারম্যান জানান, সামনের দিনগুলোতে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে আরও প্রতিযোগিতামূলক দামে জ্বালানি তেল সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক ও ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে লোহিত সাগরকেন্দ্রিক অনিশ্চয়তার কথা মাথায় রেখে বিকল্প উৎস খোঁজা হচ্ছে। নাইজেরিয়া, নরওয়ে, মালয়েশিয়া ও আলজেরিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল এনে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধন করা যায় কি না, সেই সম্ভাবনা পরীক্ষা করা হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বিডি রহমতুল্লাহর মতে, ‘‘জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে আমদানির বিষয়ে আমাদের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে যাওয়া জরুরি৷ এতে আমরা কম খরচে বেশি দিনের জ্বালানির নিশ্চয়তা পাবো।’’ আমদানির পাশাপাশি দেশীয় অনুসন্ধানেও যাতে জোর দেওয়া হয়, সেটিও তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষ্য, ‘‘এখন কাজ শুরু করলেও নতুন গ্যাস বা তেল পেতে পেতে অনেক সময় লেগে যাবে। তাই এখনই উদ্যোগ জোরদার করা দরকার।’’