আইএমএফের সঙ্গে নতুন চুক্তি ডিসেম্বরে, বাংলাদেশ ঋণ পাচ্ছে কত?
৩৬ মাসের জন্য ৪৫০ কোটি ডলারের নতুন ঋণ কর্মসূচি চেয়েছে সরকার, শর্ত ও কিস্তি এখনও চূড়ান্ত নয়
অর্থনীতি ডেস্ক · ঢাকা
প্রকাশ:
বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে ৩৬ মাসের জন্য ৪৫০ কোটি ডলার বা সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলারের নতুন ঋণ কর্মসূচি চেয়েছে। ২০২৬ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর, এই তিন বছরের কর্মসূচির আওতায় ঋণ নিতে চায় সরকার। ঋণের পরিমাণ, শর্ত ও অর্থ ছাড়ের সময়সূচি নিয়ে আলোচনা চলছে। সব ঠিকঠাক থাকলে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই কর্মসূচি নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছানোর আশা সরকারের।
বিজ্ঞাপন
আইএমএফের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক নাইজেল ক্লার্কের সঙ্গে বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে বৈঠক করে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল। বৈঠক শেষে দলের কর্মকর্তারা এ তথ্য জানান। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার ফাঁকে হওয়া ওই বৈঠকে নতুন ঋণ কর্মসূচির পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, কর আদায় বৃদ্ধি, ব্যাংকের পুনর্মূলধনিকরণ ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে আলোচনা হয়।
সরকারের পরিকল্পনা হলো, চলতি অক্টোবরের শেষ দিকে আইএমএফের একটি স্টাফ মিশন বাংলাদেশে আসতে পারে। ওই মিশনের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনার পর ঋণের পরিমাণ ও শর্ত নিয়ে সমঝোতা হলে স্টাফ লেভেল অ্যাগ্রিমেন্ট (এসএলএ) হতে পারে। আইএমএফের নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় চূড়ান্ত অনুমোদন মিললে তারপর ঋণের অর্থ ছাড় শুরু হবে। ডিসেম্বরের মধ্যে চুক্তি সইয়ের আশা থাকলেও ঋণের চূড়ান্ত পরিমাণ, শর্ত ও অনুমোদনের সময়সূচি এখনও নিশ্চিত নয়।
নতুন ঋণ কর্মসূচির জন্য বাংলাদেশকে কয়েকটি ধাপ পেরোতে হবে। প্রথম ধাপে আইএমএফের সঙ্গে ঋণের পরিমাণ, মেয়াদ এবং সংস্কারের অগ্রাধিকার নিয়ে আলোচনা হবে। এরপর সংস্থাটির প্রতিনিধিদল বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, রাজস্ব আয়, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং চলমান সংস্কারের অগ্রগতি পর্যালোচনা করবে।
পর্যালোচনার পর ঋণের শর্ত ও নীতিগত পদক্ষেপে দুই পক্ষ একমত হলে স্টাফ লেভেল অ্যাগ্রিমেন্ট হবে। তবে এটি ঋণের চূড়ান্ত অনুমোদন নয়। আইএমএফের নির্ধারিত প্রক্রিয়া মেনে নির্বাহী বোর্ডের অনুমোদনও নিতে হবে। সেই অনুমোদনের পরই অর্থ ছাড়ের পথ খুলবে।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের এক কর্মকর্তা জানান, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার পরিকল্পনা আইএমএফের কাছে তুলে ধরা হবে। এর মধ্যে থাকবে আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা, খেলাপি ঋণ কমানো এবং ব্যাংক খাতে আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা।
এই মুহূর্তে বাংলাদেশ আইএমএফের বিদ্যমান ঋণ কর্মসূচির আওতায় সহায়তা পাচ্ছে। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে অনুমোদিত ওই কর্মসূচির অধীনে তিন ধরনের ঋণ সুবিধা আছে: এক্সটেন্ডেড ক্রেডিট ফ্যাসিলিটি (ইসিএফ), এক্সটেন্ডেড ফান্ড ফ্যাসিলিটি (ইএফএফ) এবং রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি ফ্যাসিলিটি (আরএসএফ)।
বিদ্যমান কর্মসূচির ধারাবাহিকতার বাইরে নতুন একটি কর্মসূচির জন্য বাংলাদেশ চলতি বছরের ৩ জুন আইএমএফের কাছে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ পাঠায়। এই কর্মসূচির মাধ্যমে আগামী তিন বছরে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখা, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা মোকাবিলা এবং রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে চায় সরকার। কীভাবে অর্থ ছাড় হবে, কত কিস্তিতে পাওয়া যাবে এবং আগের কর্মসূচির তুলনায় কী ধরনের শর্ত যুক্ত হবে, তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে। তিনি স্পষ্ট করেন, ঋণ পেতে হলে সংস্থাটির শর্ত পূরণ করতে হবে।
বিজ্ঞাপন
নাইজেল ক্লার্কের সঙ্গে বৈঠকের পর বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের অর্থমন্ত্রী বলেন, নতুন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা ভালো হয়েছে। ঋণ পেতে শর্ত থাকবে এবং সেগুলো পূরণও করতে হবে। কোনও বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা হবে।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও বৈশ্বিক নানা চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় নিয়ে আইএমএফ দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে সন্তোষ প্রকাশ করেছে। ব্যাংকিং খাত, কর-জিডিপি অনুপাত, ব্যাংকের পুনর্মূলধনিকরণ এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে সংস্থাটির যেমন কিছু পর্যবেক্ষণ আছে, তেমনি বাংলাদেশেরও কিছু নিজস্ব পর্যবেক্ষণ আছে।
তিনি জানান, বেশ কিছু বিষয়ে ইতোমধ্যে অগ্রগতি হয়েছে এবং বাকিগুলো নিয়ে আলোচনা চলবে। এই প্রক্রিয়া আগামী কয়েক মাস চলতে পারে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
নতুন ঋণ কর্মসূচিতে ব্যাংক খাতের দুর্বলতা মোকাবিলা বড় বিষয় হয়ে উঠতে পারে। দীর্ঘদিনের খেলাপি ঋণ, আর্থিক অনিয়ম, মূলধন ঘাটতি এবং আমানতকারীদের আস্থার সংকট কাটাতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা আইএমএফের কাছে তুলে ধরতে চায় সরকার। আলোচনায় আছে ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো, আর্থিক বিবরণীতে স্বচ্ছতা বাড়ানো, আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাংকের পুনর্মূলধনিকরণের বিষয়গুলো।
বিজ্ঞাপন
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বৃহস্পতিবার ব্যাংককে সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশের নিজস্ব অগ্রাধিকার ও সংস্কার কৌশল অনুযায়ী আইএমএফ, বিশ্বব্যাংকসহ উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তা পাওয়ার বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং আর্থিক খাতে জবাবদিহি নিশ্চিত করা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।
আইএমএফের সঙ্গে আলোচনায় রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত তুলনামূলক কম হওয়ায় সরকারি ব্যয় নির্বাহ, উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বাড়াতে রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার জরুরি বলে মনে করছে সরকার। ড. তিতুমীর জানান, ২০৩০ সালের মধ্যে জিডিপির অনুপাতে কর আহরণ ১০ শতাংশে তুলতে চায় সরকার। এ জন্য কর আদায়ের পরিধি বাড়ানো এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের নিজস্ব অগ্রাধিকার অনুযায়ী সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নিতে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের পাশাপাশি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকসহ বিভিন্ন বহুপাক্ষিক উন্নয়ন সহযোগীর সঙ্গে আলোচনা চলছে। নতুন ঋণের বিপরীতে কোন সংস্কার কত দিনের মধ্যে বাস্তবায়ন করতে হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত শর্ত এখনও ঠিক হয়নি।
বাংলাদেশের লক্ষ্য ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে চুক্তিতে পৌঁছানো। তাই চলতি মাসের শেষ দিকে সম্ভাব্য আইএমএফ মিশনের সঙ্গে আলোচনা হবে গুরুত্বপূর্ণ। ঋণের পরিমাণ, সংস্কারের অগ্রাধিকার এবং শর্ত নিয়ে সমঝোতা হলেই পরবর্তী ধাপগুলো এগোবে।
বিজ্ঞাপন
সরকার চায়, নতুন কর্মসূচির মাধ্যমে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং ব্যাংক ও রাজস্ব খাতের সংস্কার এগিয়ে নেওয়া। অন্যদিকে ঋণ পেতে হলে আইএমএফের সঙ্গে সম্মত নীতিগত পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করতে হবে। ফলে সাড়ে চার বিলিয়ন ডলারের ঋণ প্রস্তাবটি এখনও আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে। চূড়ান্ত ঋণের পরিমাণ, শর্ত, অনুমোদন এবং অর্থ ছাড়ের সময়সূচি নির্ভর করবে দুই পক্ষের সমঝোতা ও আইএমএফের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন প্রক্রিয়ার ওপর।