যুদ্ধের কারণে বাড়তি আমদানি ব্যয় ৪১২ কোটি ডলার, ঋণ চাইছে বাংলাদেশ
আইএমএফের সঙ্গে সাড়ে চার বিলিয়ন ডলারের কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা, বিশ্বব্যাংকের কাছে ১০ বিলিয়ন ডলার চেয়েছে সরকার
অর্থনীতি ডেস্ক · ঢাকা
প্রকাশ:
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের জেরে গত সাত মাসে জ্বালানি ও সার আমদানিতে বাংলাদেশকে বাড়তি খরচ করতে হয়েছে ৪১২ কোটি ডলার, দেশীয় মুদ্রায় যা প্রায় ৫০ হাজার ২৬৪ কোটি টাকা। যুদ্ধ লম্বা হলে মাসে আরও প্রায় ৬০ কোটি ডলার বাড়তি খরচের আশঙ্কা আছে। একদিকে এই চাপ, অন্যদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগে স্থবিরতায় দেশের অর্থনীতি কঠিন সময় পার করছে।
বিজ্ঞাপন
এ পরিস্থিতিতে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের কাছে বাড়তি অর্থায়ন চেয়েছে বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের কাছেও আরও বিনিয়োগের অনুরোধ জানানো হয়েছে। অর্থনীতিবিদেরা অবশ্য প্রশ্ন তুলছেন, ঋণ ও বিনিয়োগের তৎপরতা সত্ত্বেও বিনিয়োগকারীদের আস্থা কতটা ফিরেছে। তাঁদের বক্তব্য, কেবল ঋণ, বিনিয়োগ সম্মেলন বা প্রণোদনায় অর্থনীতি চাঙ্গা হবে না; এর জন্য আইনশৃঙ্খলার উন্নতি, আইনের শাসন, ব্যবসার নিরাপত্তা ও সংস্কারের কার্যকর বাস্তবায়ন দরকার।
থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভা চলছে। সেখানে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে এসব বিষয়ে কথা বলছে। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের কর্মকর্তা এবং চীনের এক্সিম ব্যাংকের প্রতিনিধিদের কাছে অর্থায়ন ও বিনিয়োগ বাড়ানোর অনুরোধ করা হয়েছে। আইএমএফের সঙ্গে চলছে নতুন তিন বছর মেয়াদি সাড়ে চার বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচির আলোচনা। আগামী তিন বছরে বিশ্বব্যাংকের কাছে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার চেয়েছে বাংলাদেশ। এসব অর্থায়নে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তহবিল জোগাড়ের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোও সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হানের মূল্যায়নে বাংলাদেশে বিনিয়োগ নিয়ে আস্থার বড় সংকট তৈরি হয়েছে। দুর্বল প্রবৃদ্ধি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ কাটাতে এখন বিনিয়োগ বাড়ানোই সবচেয়ে জরুরি। অথচ সাম্প্রতিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তাঁর কথায়, মব সন্ত্রাস, পিটিয়ে হত্যা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ নানা ক্ষেত্রে ধর্মীয় উগ্রতা বাড়ছে, অনেক ক্ষেত্রে সংখ্যালঘুরা এসব ঘটনার লক্ষ্যবস্তু। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এসব ঘটনা বাংলাদেশের নিরাপত্তা, সহনশীলতা ও স্থিতিশীলতা নিয়ে নেতিবাচক বার্তা পাঠাচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
ড. সেলিম রায়হান মনে করেন, বিনিয়োগ সম্মেলন করে বা প্রণোদনা দিয়ে এই আস্থাহীনতা কাটানো যাবে না। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিশ্বাস করতে হবে যে রাষ্ট্র আইনের শাসন কায়েম করতে এবং মানুষের জীবন, সম্পদ ও ব্যবসার নিরাপত্তা দিতে সক্ষম। নিজেদের, কর্মীদের ও প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকলে বিনিয়োগকারীরা নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিতে পারেন, এমনকি চালু বিনিয়োগ অন্য দেশে সরিয়ে নেওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়। তাই বিদেশি বিনিয়োগ টানার উদ্যোগের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলার উন্নতি ও কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করা দরকার।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর বড় চাপ ফেলেছে। গত সাত মাসে তেল, গ্যাস ও সার কিনতে বাড়তি খরচ হয়েছে ৪১২ কোটি ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। যুদ্ধ চললে প্রতি মাসে আরও প্রায় ৬০ কোটি ডলার বাড়তি লাগতে পারে।
তাঁর বক্তব্য, ডলারের সংকট ও নিত্যপণ্যের দামের চাপে থাকা বাংলাদেশের জন্য এটি উদ্বেগের। যুদ্ধে সরাসরি না জড়ালেও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও সারের দাম বাড়ায় দেশকে বড় ক্ষতি সইতে হচ্ছে, তাই ক্ষতিপূরণ চাওয়ার যুক্তি আছে। কিন্তু অর্থটা কে দেবে, কীভাবে আদায় হবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্পষ্ট কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে এ দাবি বাস্তবায়ন কঠিন হতে পারে।
ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ৩০ থেকে ৪০টি দেশের সঙ্গে সম্ভাব্য সহায়তা নিয়ে বিশ্বব্যাংক আলোচনা করছে, এটি আশার খবর। সহজ শর্তের ঋণ বা বিশেষ তহবিল মিললে বাংলাদেশের ওপর তাৎক্ষণিক চাপ কিছুটা কমতে পারে। তবে শুধু আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর ভরসা করলে চলবে না। তাঁর মতে, জ্বালানি আমদানির উৎস বাড়ানো, সারের মজুত ও সরবরাহ নিশ্চিত করা, অপচয় কমানো এবং সৌরশক্তিসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো দরকার। একই সঙ্গে দরিদ্র পরিবার ও কৃষকদের লক্ষ্য করে সহায়তা দিতে হবে, যাতে বাড়তি খরচের বোঝা তাঁদের জীবনযাত্রা ও কৃষি উৎপাদনকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত না করে।
বিজ্ঞাপন
ব্যাংককে বার্ষিক সভার সাইডলাইনে আলাদা দুটি বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের কর্মকর্তা ও চীনের এক্সিম ব্যাংকের প্রতিনিধিদের কাছে অর্থায়ন ও বিনিয়োগ বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে উড়োজাহাজ, জ্বালানি, সয়াবিনসহ নানা পণ্য আমদানি করছে। দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের কথা তুলে ধরে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বাড়তি সহায়তা চেয়েছেন।
অর্থমন্ত্রী জানান, সরকারের অর্থনৈতিক নীতিতে ঋণনির্ভরতা কমিয়ে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ ও যৌথ বিনিয়োগ বাড়াতে জোর দেওয়া হচ্ছে। চীনের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গেও এ নিয়ে কথা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকট, বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতির প্রভাব ও অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। ব্যাংক খাত সংস্কার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও দারিদ্র্য কমাতে সরকারের কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, চীনের এক্সিম ব্যাংক এবং যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা চলছে। আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে এ ক্ষেত্রে অগ্রগতি হতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
আন্তর্জাতিক অর্থায়ন এখন বাংলাদেশের জন্য জরুরি হলেও ঋণ পাওয়াই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের একমাত্র পথ নয়। নতুন ঋণ বৈদেশিক মুদ্রার ওপর তাৎক্ষণিক চাপ কমাতে ও সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নে সহায়তা করতে পারে। তবে এই অর্থ সুদসহ ফেরত দিতে হবে। তাই অর্থের পরিমাণের পাশাপাশি শর্ত, ব্যবহার ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও বিবেচনায় রাখা দরকার।
বিজ্ঞাপন
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে বেড়ে যাওয়া আমদানি ব্যয় সামলাতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চাইছে বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা জানিয়েছেন, যুদ্ধ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে ক্ষতিগ্রস্ত ৩০ থেকে ৪০টি দেশের সঙ্গে সম্ভাব্য সহায়তা নিয়ে কথা চলছে।