নিম্ন আয়ের দেশের জন্য সহায়তা বাড়ানোর আহ্বান আইএমএফের, সুনির্দিষ্ট ঘোষণা নেই
গত এক দশকে রাজস্বের যে অংশ ঋণের সুদে যায়, তা ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৪ শতাংশে উঠেছে
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ:
যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট ও ঋণের বাড়তি বোঝায় চাপে থাকা নিম্ন আয়ের দেশগুলোর জন্য আর্থিক সহায়তা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংঘাতে বাণিজ্যপথে বিঘ্ন, জ্বালানি ও খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং উচ্চ সুদের ঋণের চাপ সামলাতে এসব দেশের আরও সহায়তা দরকার বলে মনে করছে সংস্থাটি। তবে নতুন অর্থায়নের পরিমাণ, ঋণ মওকুফ কিংবা যুদ্ধের ক্ষতি সামলাতে বিশেষ আর্থিক প্যাকেজ নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো ঘোষণা না আসায় অনিশ্চয়তা কাটেনি।
বিজ্ঞাপন
শনিবার (১৭ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সম্মেলনের শেষ দিনে নিম্ন আয়ের দেশগুলোর অর্থনৈতিক সংকট, ঋণের চাপ ও উন্নয়নের অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা হয়। এতে সহজ শর্তে ঋণ, ঋণ পুনর্গঠন, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়।
আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেন, নিম্ন আয়ের দেশগুলোর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ন্যায্য রাজস্বনীতি এবং সরকারি ব্যয়ের সঠিক অগ্রাধিকার ঠিক করা জরুরি। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হবে এবং দরিদ্র মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
তবে যুদ্ধ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো ঠিক কতটা বাড়তি সহায়তা পাবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ফলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর আশ্বাসের পাশাপাশি বাস্তবে অর্থায়ন বাড়ানোর দাবি আরও জোরালো হচ্ছে।
নিম্ন আয়ের দেশগুলোর জন্য বড় উদ্বেগ এখন ঋণের সুদ পরিশোধ। জর্জিয়েভার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে এসব দেশের রাজস্বের যে অংশ ঋণের সুদ মেটাতে ব্যয় হয়, তা ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৪ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ সরকার যে রাজস্ব আদায় করছে, তার বড় অংশই চলে যাচ্ছে সুদ পরিশোধে। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, অবকাঠামো ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মতো খাতে খরচ করার সুযোগ কমে আসছে।
বিজ্ঞাপন
জর্জিয়েভা বলেন, নিম্ন আয়ের অনেক দেশ ঋণ নিয়ন্ত্রণ ও আর্থিক অবস্থার উন্নতিতে অগ্রগতি দেখিয়েছে। কিন্তু উচ্চ সুদের কারণে ঋণ পরিশোধের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সেই অগ্রগতির সুফল পুরোপুরি মিলছে না। তাঁর মতে, মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের ওপর করের মতো প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায় এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি দাম তাঁদের জীবনযাত্রা আরও কঠিন করে তোলে।
সব দেশকে একই ধরনের ব্যয় সংকোচনের পথে যেতে হবে—এমন ধারণার বিরোধিতা করেছেন আইএমএফের প্রধান। তাঁর বক্তব্য, প্রতিটি দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ঋণের ধরন ও আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে নীতি ঠিক করতে হবে।
নিম্ন আয়ের দেশগুলোর অর্থায়নের সুযোগ বাড়াতে আইএমএফের দারিদ্র্য হ্রাস ও প্রবৃদ্ধি সহায়তা তহবিলের (পিআরজিটি) আওতায় বাড়তি অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ তহবিল থেকে যোগ্য দেশগুলো তুলনামূলক সহজ শর্তে ঋণ পায়। শনিবার আইএমএফের নীতিনির্ধারণী কমিটির বৈঠকেও তহবিলে সদস্যদেশগুলোর অবদান বাড়ানোর বিষয়ে সমর্থন জানানো হয়। সংঘাত, বাণিজ্যপথে বিঘ্ন এবং জ্বালানি ও খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর সহায়তা বাড়ানোর ওপরও জোর দেওয়া হয়।
আইএমএফের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন সংস্কারের ফলে আগের চেয়ে সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার সুযোগ তিন গুণেরও বেশি বাড়ানো সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি দেশগুলোর আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতেও সহায়তার ব্যবস্থা আছে। তবে তহবিলে নতুন করে কত অর্থ যুক্ত হবে, কোন দেশ কতটা পাবে এবং কবে নাগাদ সেই অর্থ ছাড় হবে—এসব বিষয়ে নির্দিষ্ট ঘোষণা আসেনি। ফলে সংকটে থাকা দেশগুলোর তাৎক্ষণিক অর্থের চাহিদা কতটা মিটবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
বিজ্ঞাপন
আইএমএফ মনে করছে, ঋণের চাপ কমাতে শুধু নতুন ঋণ দেওয়া যথেষ্ট নয়। যেসব দেশের ঋণ পরিশোধ কঠিন হয়ে পড়েছে, তাদের জন্য দ্রুত ও কার্যকর ঋণ পুনর্গঠনও দরকার। জর্জিয়েভা বলেন, যেসব দেশের ঋণ পুনর্গঠন প্রয়োজন, সেখানে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে জি-২০-এর কমন ফ্রেমওয়ার্ক বড় অবদান রাখতে পারে।
জর্জিয়েভা আরও বলেন, কিছু দেশের ঋণ দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হলেও তাৎক্ষণিক অর্থের ঘাটতি রয়েছে। এসব দেশের রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অর্থায়ন এবং বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণের পরিবেশ তৈরির ওপরও তিনি জোর দেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঋণ পুনর্গঠনে দীর্ঘসূত্রতা থাকলে সুদ ও কিস্তির চাপ চলতেই থাকে। এতে নতুন বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং উন্নয়নমূলক ব্যয়ের জন্য সরকারের হাতে অর্থ কমে যায়। তাই ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতা দেশগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ দরকার।
বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাংগার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের উদ্যোগে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে রেকর্ড ১১২ বিলিয়ন ডলারের বেসরকারি মূলধন সংগ্রহ করা হয়েছে। কিন্তু নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে এ ধরনের বিনিয়োগের পরিমাণ মাত্র ৩ বিলিয়ন ডলার। এতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে বিনিয়োগের অসম বণ্টন স্পষ্ট হয়েছে। সামগ্রিকভাবে বেসরকারি মূলধন বাড়লেও সবচেয়ে দরিদ্র দেশগুলো এর সুবিধা তুলনামূলক কম পাচ্ছে।
দুর্বল অবকাঠামো, বিদ্যুৎ ও পরিবহন সংকট, ব্যবসায়িক ঝুঁকি এবং বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা এসব দেশে মূলধন আকর্ষণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অথচ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদন বাড়ানো এবং অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে বেসরকারি বিনিয়োগ জরুরি। তাই আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহায়তা শুধু ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা ধরে রাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং বেসরকারি মূলধন আকর্ষণের পরিবেশ তৈরিতেও সহায়তা প্রয়োজন।
বিজ্ঞাপন
ঋণের বোঝা এবং জ্বালানি-খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধির মধ্যে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সামনে কঠিন নীতিগত চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। এক দিকে রাজস্ব ঘাটতি ও ঋণ পরিশোধের চাপ, অন্য দিকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি—দুটি পরিস্থিতিই সামলাতে হচ্ছে সরকারগুলোকে। আইএমএফ সরকারি আর্থিক ভারসাম্য ফেরাতে ব্যয় কমানো বা রাজস্ব বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। জ্বালানি ও খাদ্যসংকট মোকাবিলায় সবার জন্য সমান ভর্তুকির বদলে যাঁদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তাঁদের লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দেওয়ার কথাও বলছে সংস্থাটি।
তবে উন্নয়নকর্মীদের আশঙ্কা, যথাযথ বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া ভর্তুকি কমানো বা সরকারি ব্যয়ে কাটছাঁট করলে দরিদ্র মানুষের দুর্ভোগ বাড়তে পারে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার মতো খাতে ব্যয় কমে গেলে দীর্ঘ মেয়াদে মানবসম্পদ উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হবে।