ডেঙ্গুতে মৃত্যু তিনশো ছাড়িয়েছে, মশা নিয়ন্ত্রণ নির্দেশিকা মানা নিয়ে প্রশ্ন
বিশেষজ্ঞেরা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মশা নিয়ন্ত্রণ ও দ্রুত চিকিৎসার কথা বলেছেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলছেন সরকার ব্যর্থ নয়
স্বাস্থ্য ডেস্ক · ঢাকা
প্রকাশ:
দেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে ৩০৩ জনে দাঁড়িয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় এ রোগে আরও চারজন মারা গেছেন, আর নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২ হাজার ১৯৩ জন। মশা নিয়ন্ত্রণে জাতীয় নির্দেশিকা থাকা এবং কীটতত্ত্ববিদদের সতর্কতা সত্ত্বেও কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রাজধানীসহ দেশের সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে নির্দেশনা অনুযায়ী মশক নিধন কার্যক্রম না চলায় অক্টোবরেও ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগজনক।
বিজ্ঞাপন
রবিবার (১১ অক্টোবর) স্বাস্থ্য অধিদফতরের ডেঙ্গুবিষয়ক নিয়মিত প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, রবিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় খুলনা বিভাগের সিটি করপোরেশন এলাকার বাইরে ডেঙ্গুতে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিভাগের সিটি করপোরেশন এলাকার বাইরে মারা গেছেন একজন করে।
একই সময়ে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ঢাকা বিভাগের সিটি করপোরেশন এলাকার বাইরে, ৫৩০ জন। এ ছাড়া খুলনা বিভাগে ৩০৪ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ২৯৩ জন, বরিশাল বিভাগে ২৩৬ জন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ২৫০ জন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ২৫০ জন, রাজশাহী বিভাগে ১৬০ জন, রংপুর বিভাগে ৮৪ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৭০ জন এবং সিলেট বিভাগে ১৬ জন ভর্তি হয়েছেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ কবীরুল বাশার বলেন, ডেঙ্গুর উচ্চ সংক্রমণের আশঙ্কা আগে থেকেই ছিল। বারবার মশা নিধনের পরামর্শ দেওয়া হলেও রোগটি নিয়ন্ত্রণে একধরনের অবহেলা দেখা গেছে।
বিজ্ঞাপন
তাঁর ভাষ্য, সেপ্টেম্বরের তুলনায় চলতি মাসে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে পারে। পরিস্থিতি আগামী মাস পর্যন্ত চলার আশঙ্কাও রয়েছে। বৈজ্ঞানিক তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে কার্যকর মশা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মোশতাক হোসেন বলেন, ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দ্রুত কমানো নাও যেতে পারে। মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগের সুফল পেতে দুই থেকে তিন বছর সময় লাগতে পারে। তবে এর মধ্যে ডেঙ্গুতে মৃত্যু কমানোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
তাঁর মতে, যেসব এলাকায় ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি, সেখানে পরীক্ষার কিট নিয়ে জ্বরে আক্রান্ত ব্যক্তিদের পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। ডেঙ্গু শনাক্ত হলে তাঁদের যথাযথ চিকিৎসা ও পরিচর্যার ব্যবস্থা করতে হবে। জেলা, উপজেলা কিংবা দ্বিতীয় স্তরের হাসপাতাল—সব জায়গাতেই এ সেবা নিশ্চিত করা জরুরি।
মোশতাক হোসেন মশা নিয়ন্ত্রণে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পরিকল্পিত কর্মসূচি বাস্তবায়নের ওপর জোর দেন। তাঁর মতে, শুধু লোকদেখানো পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম কিংবা ঘরবাড়ি ঝাড়ু দিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। প্রাপ্তবয়স্ক মশা ধ্বংসে সরকারকে পরিকল্পিতভাবে কার্যক্রম চালাতে হবে।
বিজ্ঞাপন
মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের পাশাপাশি প্রাপ্তবয়স্ক মশাও নিধন করতে হবে। প্রশাসনকে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালাতে হবে, আর ব্যক্তিগত পর্যায়েও মশার কামড় থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা নিতে হবে।
তিনি জানান, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত কিছু রোগীর শারীরিক অবস্থা দ্রুত খারাপ হচ্ছে। কেউ কেউ এক থেকে দুই দিনের মধ্যেই গুরুতর অসুস্থ হয়ে শকের পর্যায়ে চলে যাচ্ছেন। তাই জ্বর হলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী এবং ক্যানসার ও যকৃতের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জ্বর হলে বিশেষ সতর্কতা নিতে বলেন তিনি।
ডা. আবদুল্লাহ আরও বলেন, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে পর্যাপ্ত তরল খাবার গ্রহণ জরুরি। তবে বমি, খাবার খেতে অসুবিধা কিংবা পাতলা পায়খানা হলে দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। জ্বর হলে নিজের ইচ্ছামতো ফার্মেসি থেকে ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়াও এড়িয়ে চলতে হবে।
তাঁর মতে, রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা শুরু করা গেলে দ্রুত সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। তবে চিকিৎসা নিতে দেরি হলে বা রোগীর অবস্থা গুরুতর হয়ে শক দেখা দিলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হতে পারে। রোগী অন্য কোনো রোগে আক্রান্ত থাকলে ঝুঁকি আরও বাড়ে।
বিজ্ঞাপন
মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম বলেন, প্রতিবছরই মানুষ ডেঙ্গু ভাইরাসের নতুন ধরনে আক্রান্ত হচ্ছেন। শিশুদের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতির পেছনে দ্বিতীয়বার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়া একটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, শুধু ডেঙ্গু শনাক্ত হওয়ার পর নয়, রোগটির উপসর্গ দেখা দিলেও গুরুত্ব দিতে হবে। আক্রান্ত ব্যক্তির শারীরিক অবস্থার ওপর নিবিড় নজর রাখার পাশাপাশি জ্বর হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ খেতে ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে হবে।
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকার বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ডেঙ্গুর ধরন পাল্টে গেছে। ডেঙ্গু রোগীদের প্লাজমা লিকেজ ঠেকাতে চিকিৎসকদের সতর্ক করা হয়েছিল এবং তাঁরা সে বিষয়ে সতর্কও ছিলেন। তবে পরে কিছু রোগীর হার্ট অ্যাটাক বা শক হচ্ছে বলে জানান তিনি। এতে কয়েক মিনিটের মধ্যেই রোগীর মৃত্যু হতে পারে বলেও জানান মন্ত্রী।
মন্ত্রী বলেন, ডেঙ্গুর বর্তমান ধরনে রোগীর শারীরিক অবস্থা দ্রুত খারাপ হচ্ছে, ফলে তাঁকে সুস্থ করে তোলা কঠিন হয়ে পড়ছে।
বিজ্ঞাপন
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকার ব্যর্থ কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমি মনে করি না সরকার ব্যর্থ।’
মন্ত্রী জানান, ডেঙ্গু চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় প্রটোকল যথাযথভাবে মানা হচ্ছে। প্রতি শনিবার পরিচ্ছন্নতা অভিযান চলছে। প্রাপ্তবয়স্ক মশা মারতে বিভিন্ন স্থানে স্প্রে করা হচ্ছে এবং লার্ভা ধ্বংসে ট্যাবলেট ব্যবহার করা হচ্ছে।
মন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশ ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। মানুষের অসচেতনতার কারণে বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকে। এমনকি ছাদের টবে জমে থাকা পানি থেকেও এডিস মশার লার্ভা জন্ম নেয়। এ বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে সরকারের কার্যক্রম চলছে।
ডেঙ্গু পুরোপুরি নির্মূল হয়ে গেছে, এমন দাবি সরকার করছে না বলে জানান মন্ত্রী। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিভিন্ন উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে।