ডেঙ্গু ওয়ার্ডে ১০ দিন বয়সি নবজাতক রায়ান
চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যু বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৪২ জনে, আক্রান্ত ১ লাখ ১০ হাজার ৩১২ জন
ঢাকা জেলা প্রতিনিধি · ঢাকা
প্রকাশ:
জন্মের মাত্র ৯ দিন পেরিয়েছে নবজাতক রায়ানের। জন্মের পঞ্চম দিন থেকে তার জ্বর শুরু হয়। গতকাল হাসপাতালে আনার পর পরীক্ষায় জানা যায়, সে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত; রক্তেও সংক্রমণ দেখা দিয়েছে। এখন ডেঙ্গু ওয়ার্ডে ছোট একটি কাচের বাক্সের ভেতর রেখে তাকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে, চলছে স্যালাইন। রায়ানের মায়ের হাতে এখনো ক্যানোলা লাগানো আছে।
বিজ্ঞাপন
মা লিমা আক্তার বলেন, ঢাকা মেডিক্যালে সিজারের মাধ্যমে রায়ানের জন্ম হয়। সেখান থেকে বাসায় ফেরার পরই তার জ্বর শুরু হয়।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাজধানীর শ্যামলী শিশু হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডের ৫১ নম্বর বেডে রায়ানকে চিকিৎসাধীন দেখা যায়। দেশে এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু এখন মারাত্মক আকার নিয়েছে; ১০ দিন বয়সি শিশুও এর হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। তরুণ, যুবক, বৃদ্ধ—সব বয়সের মানুষই আক্রান্ত হচ্ছেন। রোগীর চাপে নার্স ও চিকিৎসকদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে এ সময় রোগী ভর্তি ছিলেন ৫২ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গুবিষয়ক নিয়মিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় (শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) দেশে ডেঙ্গুতে আরও সাত জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৮৫২ জন। শুধু চলতি অক্টোবরের ১৭ দিনেই আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার ৬৯২ জনে, আর এই ১৭ দিনে মারা গেছেন ৯৭ জন রোগী।
অধিদপ্তরের তথ্যে আরও দেখা যায়, চলতি বছর এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৪২ জনে। দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ১০ হাজার ৩১২ জন। এর মধ্যে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১ লাখ ৪ হাজার ১৯৯ জন। বর্তমানে হাসপাতালগুলোতে ভর্তি আছেন ৫ হাজার ৭৭১ জন। ২০২৫ সালে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত আক্রান্ত রোগী ছিলেন ৫৮ হাজার ২৮০ জন এবং মৃত্যু হয়েছিল ২৪৩ জনের। এ বছর একই সময়ে আক্রান্ত রোগী বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ৩১২ জনে; মৃত্যু হয়েছে ৩৪২ জনের।
বিজ্ঞাপন
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে হাসপাতালে মায়েরা উৎকণ্ঠায় আছেন। ১০ মাসের শিশু তাওহিদকে নিয়ে মিরপুর ১ নম্বর থেকে এসেছেন তার মা আমেনা। জ্বরের পর শিশুটির গায়ে র্যাশ দেখা দিয়েছে। আমেনা বলেন, ‘আমার প্রথম বাচ্চা ৫৭ দিন বয়সে মারা গেছে। এই বাচ্চাও তিন মাস নিউমোনিয়া নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিল। ধারদেনা করে ৬ লাখ টাকা ব্যয় করেছি, এখন আবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। দোয়া করেন, যেন আমার বাচ্চাটার কিছু না হয়।’
এদিকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু সরকারের উদ্যোগের ওপর নির্ভর না করে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও তরুণ প্রজন্মকে নিজেদের বাসাবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব নিতে বলেন তিনি। ডেঙ্গু পরিস্থিতি, চিকিৎসাসেবা ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম সরেজমিনে দেখতে গতকাল শনিবার রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি ভবনে আকস্মিক পরিদর্শনে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. আতিকুল ইসলাম বলেন, ডেঙ্গু রোগী বাড়ছে। জ্বরের এক থেকে তিন দিনের মধ্যে ডেঙ্গুর ‘এনএস ওয়ান’ পরীক্ষা করে ফেলতে হবে। এখন ডেঙ্গুর মৌসুম চলছে বলে সরকারিভাবে এ পরীক্ষা সম্পূর্ণ ফ্রি। ডেঙ্গু পজিটিভ হলে শিশুদের তৎক্ষণাৎ হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ক্রিটিক্যাল ফেসটা হাসপাতালে কাটাতে পারলে ভালো। কারণ এ সময় রোগীর পালস প্রেশার কমে যায়, ২০ নামলে সেটি অ্যালার্মিং। বমি হয়, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যায়, খিঁচুনি হয়, প্লেটিলেট কমে যায়। ত্বক বা দাঁতের গোড়া থেকে রক্তক্ষরণ শুরু হলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
বিজ্ঞাপন
এই রোগীরা হাতের কাছে থাকলে অবস্থা বেশি খারাপ হয় না। এটিকে চিকিৎসকেরা বলেন ‘এক্সপান্ডেট ডেঙ্গু সিনড্রোম’। কিন্তু রোগী দেরিতে হাসপাতালে এলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, কারণ ডেঙ্গুর রোগী দ্রুত খারাপের দিকে চলে যায়।