শিশুতে বেশি চিনি খাওয়ালে ঝুঁকি জানুন
গবেষণায় দেখা গেছে প্রথম ১ হাজার দিনে চিনি সীমিত করলে প্রাপ্তবয়স্কে উদ্বেগের ঝুঁকি ৩৩ শতাংশ কমে
স্বাস্থ্য ডেস্ক · ঢাকা
প্রকাশ:
চিনি শুধু বয়স্ক বা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য নয়; অতিরিক্ত চিনি শিশুর জন্যও ক্ষতিকর হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে শিশুর প্রথম ১ হাজার দিন (পৌনে তিন বছর) চিনি গ্রহণের পরিমাণ ভবিষ্যতে মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
বিজ্ঞাপন
যুক্তরাজ্যের সারে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা ১৫ দশমিক ৭ বছরের দীর্ঘমেয়াদী গবেষণার ফলাফল গত আগস্টে প্রকাশ করেন। গবেষণার লক্ষ্য ছিল শৈশবে চিনি সংস্পর্শের ফলে প্রাপ্ত বয়সে মানসিক স্বাস্থ্য, খাবারের অভ্যাস এবং স্নায়ু বিকাশে কী প্রভাব পড়ে তা জানার।
গবেষণায় গর্ভকালীন ও প্রথম দুই বছরের চিনি সংস্পর্শ না থাকা ব্যক্তিদের উদ্বেগের ঝুঁকি কম দেখা গিয়েছে, যেখানে শিশুকালে বেশি চিনি গ্রহণকারীদের মস্তিষ্কে প্রদাহ দেখা যায়, যা প্রাপ্ত বয়সে উদ্বেগ বাড়ায়।
গবেষক দলটি যুক্তরাজ্যের বায়োব্যাংকের ৪৬ হাজার ৪৪৮ প্রাপ্তবয়স্কের স্বাস্থ্য ও খাদ্যাভ্যাসের ডেটা বিশ্লেষণ করেন। এই ব্যক্তিরা ১৯৫১ সালের ১ অক্টোবর থেকে ১৯৫৬ সালের ৩১ মার্চের মধ্যে জন্মগ্রহণ করেছেন, যখন যুক্তরাজ্যে কঠোর রেশন ব্যবস্থা চালু ছিল এবং ১৯৫৩‑১৯৫৪ সালে তা ধীরে ধীরে সরিয়ে নেওয়া হয়।
অংশগ্রহণকারীদের গর্ভকালীন ২৭০ দিন, গর্ভকাল থেকে প্রথম ১ হাজার দিন এবং রেশনবহির্ভূত সময়ের ভিত্তিতে বিভিন্ন দলে ভাগ করা হয়। রেশনকালের মানুষ সীমিত পরিমাণে চিনি পেতেন।
বিজ্ঞাপন
ফলাফল দেখায়, জীবনের প্রথম ১ হাজার দিন চিনি সীমিত করে কাটানো ব্যক্তিরা প্রাপ্তবয়সে উদ্বেগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ৩৩ শতাংশ এবং বিষণ্নতায় ২৯ শতাংশ কম দেখায়। প্রথম ৬৩৫ বা ৮১৭ দিন কম চিনি গ্রহণকারী গোষ্ঠীতেও উদ্বেগের ঝুঁকি ধারাবাহিকভাবে কম রেকর্ড করা হয়েছে।
পরিসংখ্যানিক বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট হয়েছে যে শৈশবে চিনি সংস্পর্শের প্রভাব স্থায়ী; পরবর্তী জীবনে চিনি গ্রহণ হ্রাস করলেও উদ্বেগের ওপর প্রভাব অবিচল থাকে, যদিও বিষণ্নতার ক্ষেত্রে খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনে কিছুটা পার্থক্য দেখা যায়।
গবেষকরা প্রায় ৬ হাজার অংশগ্রহণকারীর মস্তিষ্কের এমআরআই বিশ্লেষণ করে ৮০টি অঞ্চলে ধূসর পদার্থের পরিমাণে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পেয়েছেন। বিশেষ করে সেরিবেলাম ও ব্রেনস্টেমের ১১টি অঞ্চলে কম চিনি গ্রহণকারী ও স্বাভাবিক চিনি গ্রহণকারীর মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য লক্ষ করা গেছে, যা মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে যুক্ত বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শিশুকালে দীর্ঘ সময় চিনি থেকে দূরে থাকা ব্যক্তিরা প্রাপ্ত বয়সে মিষ্টি খাবারের প্রতি কম আসক্তি প্রদর্শন করেছেন।
বিজ্ঞাপন
গবেষকরা উল্লেখ করেন, শিশুর বিকাশের সংবেদনশীল সময়ে পুষ্টির পরিবেশ শুধুমাত্র শারীরিক স্বাস্থ্যের (যেমন ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ) নয়, মস্তিষ্কের নিউরো-ডেভেলপমেন্টের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিশ্বজুড়ে শিশুদের খাদ্যে অতিরিক্ত চিনি ও মিষ্টি পানীয়ের ব্যবহার বাড়ার প্রবণতা রয়েছে। গবেষকদের মতে, জীবনের প্রথম ১ হাজার দিনে চিনি গ্রহণ নিয়ন্ত্রণ করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানসিক ব্যাধি হ্রাসে কার্যকর জনস্বাস্থ্য নীতি গড়ে তোলা সম্ভব।
‘বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, চিনি শিশুদের মস্তিষ্কে প্রদাহ সৃষ্টি করে, যা প্রাপ্ত বয়সে উদ্বেগ সৃষ্টির কারণ। শিশুদের নিয়ন্ত্রিত চিনি খাওয়ানো উচিত। সাধারণ অভিভাবকদের পাশাপাশি বিষয়টি জনস্বাস্থ্য নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।’
সুদি্প্ত কুমার মুখার্জী, সহযোগী অধ্যাপক, শিশু স্নায়ুরোগ বিভাগ, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটাল, প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, চিনি শিশুদের মস্তিষ্কে প্রদাহ সৃষ্টি করে, যা প্রাপ্ত বয়সে উদ্বেগ সৃষ্টির কারণ। শিশুদের নিয়ন্ত্রিত চিনি খাওয়ানো উচিত। সাধারণ অভিভাবকদের পাশাপাশি বিষয়টি জনস্বাস্থ্য নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।’