ইসরায়েলের নির্বাচনে ‘কিংমেকার’ কে এই আব্বাস, নেতানিয়াহুকেও সরিয়েছিলেন যিনি
২০২১ সালে বিরোধী জোটে যোগ দিয়ে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে ভূমিকা রেখেছিল মনসুর আব্বাসের দল রাম
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ:
প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নির্বাচনী প্রচারে ইসরায়েলের আসন্ন ভোট নিয়ে বারবার শোনা যাচ্ছে মনসুর আব্বাসের নাম। নেতানিয়াহু ও তাঁর সহযোগীরা আব্বাসকে ইসরায়েলের জন্য একটি হুমকি হিসেবে দেখাচ্ছেন। অথচ দেশটির বহুদলীয় রাজনীতিতে আব্বাসের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর দল ইউনাইটেড আরব লিস্ট বা রাম-এর সমর্থন না পেলে নেতানিয়াহুবিরোধী দলগুলোর জন্য সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া কঠিন হতে পারে। তাই নির্বাচনের পর সরকার গঠনে আবারও নিয়ামক শক্তি হয়ে উঠতে পারেন এই আরব রাজনীতিক।
বিজ্ঞাপন
ইসলামপন্থী দল ‘ইউনাইটেড আরব লিস্ট’ বা ‘রাম’-এর নেতা মনসুর আব্বাস। নির্বাচনী প্রচারণায় ইহুদি ভোটারদের উদ্দেশে নেতানিয়াহুর সতর্কবার্তা হলো, তিনি ক্ষমতা হারালে পরবর্তী সরকারের প্রকৃত ক্ষমতা থাকবে মনসুর আব্বাসের হাতে, আর সেটি ইসরায়েলের জন্য ‘ঘরের ভেতরের’ বিপদ। ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনকে ডানপন্থী ইসরায়েলিরা সবচেয়ে বেশি ভয় পান, আর নেতানিয়াহুর ভাষায় এর পেছনের প্রধান চালিকা শক্তি এই মনসুর আব্বাস।
বাস্তবে নির্বাচনে মনসুর আব্বাসের ঘোষিত অগ্রাধিকারের সঙ্গে ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর ও গাজার যোগ সামান্যই। তাঁর সব মনোযোগ ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের ঘিরে। ইসরায়েলের জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশই ইসরায়েলি আরব। কট্টরপন্থী ইহুদিদের সহিংস অপরাধ ও বৈষম্যমূলক আবাসন নীতির শিকার তাঁরাই।
নেতানিয়াহুর নির্বাচনী প্রচারে আব্বাসকে উপস্থাপন করা হচ্ছে এমনভাবে, যেন ক্ষমতার চাবিকাঠি তাঁর হাতে গেলে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে। আব্বাস বলছেন ভিন্ন কথা: নেতানিয়াহুর বর্ণবাদী, ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ঘটাতে চান তিনি, আর এমন এক সরকার গড়তে সহযোগী হতে চান, যার অংশীদার হবেন আরব নাগরিকেরা। তাঁর কথায়, ‘এমন সরকার প্রতিষ্ঠা করতে চাই, যেখানে আমাদের কথা বলার সুযোগ থাকবে, আমাদের প্রভাব থাকবে।’
আব্বাসের বিরুদ্ধে নেতানিয়াহুর আক্রমণাত্মক প্রচারণাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে একটি বিষয়: আসন্ন নির্বাচনে মনসুর আব্বাসই শেষ পর্যন্ত ‘কিংমেকার’ বা সরকার গঠনের নিয়ামক হয়ে উঠতে পারেন। আগেও তিনি এই ভূমিকায় ছিলেন।
বিজ্ঞাপন
ইসরায়েলের রাজনীতিতে আব্বাস প্রথম বড় আকারে আলোচনায় আসেন ২০২১ সালে, যখন নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে জোট বাঁধেন। তার আগে ইসলামপন্থী আরব দলগুলো সরকারের বাইরে থেকে নীতির সমালোচনা করাকেই বেছে নিত। রামের সরকারে যোগ দেওয়া তাই ছিল সেই প্রচলিত অবস্থান থেকে বড় ধরনের সরে আসা। ওই জোটের কারণে টানা ১২ বছর প্রধানমন্ত্রী থাকার পর ক্ষমতা হারান নেতানিয়াহু। পরের বছর নির্বাচনে জিতে অবশ্য তিনি আবার প্রধানমন্ত্রীর পদে ফেরেন।
এই রাজনৈতিক কৌশল আব্বাসকে ইসরায়েলের অন্যতম প্রভাবশালী আরব রাজনীতিক করে তুলেছে। যদিও আরব সম্প্রদায়ের ভেতরেই তাঁর অবস্থান নিয়ে বিতর্ক আছে। গাজা ও পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের নিয়ে তুলনামূলক কম কথা বলা এবং ইসরায়েলি সরকারের অংশীদার হওয়ার কৌশল নিয়ে তিনি সমালোচিত।
ইসরায়েলের নির্বাচনী রাজনীতিতে মনসুর আব্বাসের উত্থান হচ্ছে এমন সময়ে, যখন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণা দেশটির ডানপন্থী ভোটারদের কাছে ব্যাপকভাবে অজনপ্রিয়। নেতানিয়াহু ও তাঁর সহযোগীরা আব্বাসকে দেখাতে চাইছেন সন্ত্রাসীদের প্রতি সহানুভূতিশীল হিসেবে। এদিকে একসময় তাঁকে সাহসী রাজনৈতিক পথপ্রদর্শক বলে প্রশংসা করেছিলেন, এমন কিছু নেতানিয়াহুবিরোধী রাজনীতিকও এখন তাঁর কাছ থেকে দূরত্ব রাখছেন।
পর্যবেক্ষকেরা মনে করেন, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের প্রতি সন্দেহ ও অবিশ্বাস আরও বেড়েছে। ওই হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত হন এবং হামাস প্রায় ২৫০ জনকে জিম্মি করে নিয়ে যায়। হামলার দিনই আব্বাস তার নিন্দা জানান। পরে গাজা সীমান্ত এলাকা থেকে পালিয়ে আসা ইসরায়েলিদের আবাসনের ব্যবস্থায়ও সহায়তা করেন তিনি। আব্বাস বারবার বলেছেন, এ ধরনের সহিংসতা ফিলিস্তিনিদেরও ক্ষতি করেছে।
বিজ্ঞাপন
এরপরও আব্বাসের অবস্থান নিয়ে সমালোচনা থামেনি। আরব নাগরিকদের কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, ইসরায়েলের হামলায় গাজায় বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার পরও তিনি কেন আরও জোরালো প্রতিবাদ করছেন না। অ্যাব্রাহাম ইনিশিয়েটিভস ইসরায়েলে আরব-ইহুদি সম্পর্ক উন্নয়নে কাজ করে; প্রতিষ্ঠানটির সহসভাপতি বাশার ফাহুম-জায়ৌসি বলেন, আব্বাসের রাজনৈতিক সমঝোতার কৌশল নিয়ে আরব সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে।
ইসলামিক মুভমেন্টের চেয়ারম্যান সাফওয়াত ফ্রেজের মতে, আব্বাসের বক্তব্যের সঙ্গে ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের সবাই একমত নন। তবে অনেকে মনে করেন, সমঝোতা তাঁর রাজনৈতিক কৌশলেরই অংশ।
রাজনীতিতে আসার পেছনে আব্বাসের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও ভূমিকা রেখেছে। তাঁর জন্ম গ্যালিলির মাঘার শহরে, যেখানে দ্রুজ, খ্রিষ্টান ও মুসলিমদের বাস। বাবা ছিলেন মুদিদোকানি। শৈশব থেকেই প্রতিবেশীদের বিরোধ মেটাতে ভূমিকা রাখতেন তিনি। স্কুলে পড়ার সময়ও শিক্ষার্থীদের মধ্যকার সমস্যা মেটাতে তাঁকে মধ্যস্থতা করতে বলা হতো।
পেশায় আব্বাস দন্তচিকিৎসক ছিলেন। নিজ এলাকায় দ্রুজ ও খ্রিষ্টানদের সংঘর্ষ, ভাঙচুর এবং বাড়িঘরে আগুন দেওয়ার ঘটনা তিনি দেখেছেন। সহিংসতার কারণে বহু মানুষকে এলাকা ছেড়ে পালাতে হয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর পুনর্নির্মাণের সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত তিনি নিজের পেশাগত কাজ বন্ধ রেখেছিলেন। মানুষের জন্য আরও বেশি কিছু করার আকাঙ্ক্ষা থেকেই রাজনীতিতে আসার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। তাঁর বিশ্বাস, বৃহত্তর পরিসরে মানুষের সেবা করতে হলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও প্রতিষ্ঠানকে কাজে লাগাতে হবে।
বিজ্ঞাপন
তিন সন্তানের বাবা মনসুর আব্বাস ২০১৯ সালে ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটে নির্বাচিত হন। সেই থেকে আরব অধ্যুষিত এলাকায় অপরাধ ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ তাঁর রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের তালিকায় আছে। এসব উদ্যোগের কারণে সংগঠিত অপরাধী চক্রসহ বিভিন্ন পক্ষ থেকে হুমকি পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন আব্বাস।
২০২১ সালের মে মাসে ইসরায়েলের বিভিন্ন এলাকায় আরব ও ইহুদিদের সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়লে লোড শহরের একটি পুড়ে যাওয়া সিনাগগ ঘুরে দেখেন আব্বাস। সঙ্গে ছিলেন ওই শহরের কট্টরপন্থী ইহুদি মেয়র। সিনাগগ পুনর্নির্মাণে সহায়তার প্রস্তাব দেওয়ার পাশাপাশি সহিংসতার নিন্দা জানান তিনি। কিন্তু ইসরায়েলি পুলিশ আরব নাগরিকদের গ্রেপ্তার করায় তার প্রতিবাদে তাঁর নিজের সম্প্রদায়ের একাংশও তাঁর পদত্যাগ দাবি করে।
আব্বাসের যুক্তি হলো, কেবল বিরোধিতা করে আরব নাগরিকদের সমস্যা মেটানো সম্ভব নয়; নীতিনির্ধারণে প্রভাব রাখতে সরকারে অংশ নিতেই হবে। তাই প্রয়োজনে আরব নাগরিকদের একাংশের কাছে অজনপ্রিয় কিছু নীতির দায়ও তিনি নিতে প্রস্তুত।
আসন্ন নির্বাচনে আব্বাসের রাজনৈতিক কৌশলের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক মধ্য-বামপন্থী ইহুদি রাজনীতিক ইয়াভ সেগালোভিচের সঙ্গে জোট গঠন। সাবেক এই শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা রামের প্রার্থী তালিকার দ্বিতীয় অবস্থানে থাকবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন আব্বাস। নাজারেথে এক সংবাদ সম্মেলনে তাঁদের একসঙ্গে উপস্থিতি ইসরায়েলের মূলধারার আরব ও ইহুদি রাজনীতির মধ্যে নতুন ধরনের সহযোগিতার ইঙ্গিত দিয়েছে।