বালিশের পাশে ফোন রেখে ঘুমালে যেসব ঝুঁকি থাকে
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ফোন কাছে রাখলেই ক্যানসার হওয়ার প্রমাণ মেলেনি, তবে ঘুমের ব্যাঘাত ও চার্জের সময় আগুনের ঝুঁকি আছে
লাইফস্টাইল ডেস্ক · ঢাকা
প্রকাশ:
ঘুমানোর আগে ফোন ঘাঁটা আর ঘুম ভাঙার পরপরই ফোন হাতে নেওয়া এখন অনেকের নিত্যদিনের অভ্যাস। কেউ ফোন রাখেন বালিশের পাশে, কেউ খাটের পাশের টেবিলে, আবার কেউ চার্জে লাগিয়েই ঘুমিয়ে পড়েন। বিশেষজ্ঞদের মতে, রাতে ফোন হাতের নাগালে রাখার এই অভ্যাস ঘুমের মান খারাপ করে, সঙ্গে কিছু নিরাপত্তা ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।
বিজ্ঞাপন
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মোবাইল ফোনের বিকিরণ নিয়ে নানা উদ্বেগ থাকলেও কেবল বিছানার পাশে ফোন রাখলেই ক্যান্সার বা গুরুতর কোনো রোগ হয়, এর প্রমাণ এখনো মেলেনি। তবে রাতে ফোন ব্যবহারের কারণে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে এবং চার্জ দেওয়ার সময় ফোন অতিরিক্ত গরম হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
ফোনের স্ক্রিন থেকে বের হওয়া নীল আলো শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়ি বা সার্কাডিয়ান রিদমকে প্রভাবিত করতে পারে। সন্ধ্যা বা রাতে বাড়তি আলোর সংস্পর্শে এলে মেলাটোনিন হরমোনের নিঃসরণ কমে যেতে পারে। এই হরমোন ঘুম ও জাগরণের চক্র নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা রাখে। ঘুমের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ক্রল করা, ভিডিও দেখা বা বার্তা পড়লে ঘুম আসতে দেরি হতে পারে। শুধু আলোই নয়, ফোনের আকর্ষণীয় বিষয়বস্তুও মস্তিষ্ককে সজাগ রাখে।
এ কারণে ঘুমানোর অন্তত ৩০ থেকে ৬০ মিনিট আগে ফোন ব্যবহার বন্ধ করা এবং রাতে ফোন থেকে দূরে থাকার অভ্যাস করা ভালো। নাইট মোড নীল আলোর সংস্পর্শ কিছুটা কমায় ঠিকই, কিন্তু দীর্ঘ সময় ফোন ব্যবহারের প্রভাব পুরোপুরি দূর করতে পারে না।
ফোন ব্যবহার না করলেও কল, বার্তা, নোটিফিকেশন বা ভাইব্রেশনের কারণে ঘুম ব্যাহত হতে পারে। এসব কারণে ঘুম ভেঙে গেলেও অনেক সময় সকালে তা মনে থাকে না। বারবার এমন হলে ঘুমের ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়, ফলে দিনের বেলায় ক্লান্তি, বিরক্তি ও মনোযোগের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া বালিশের পাশে ফোন থাকলে রাতে ঘুম ভাঙলেই মেসেজ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেখার প্রবণতা তৈরি হয়।
বিজ্ঞাপন
এ ধরনের সমস্যা এড়াতে ঘুমানোর আগে ‘ডু নট ডিস্টার্ব’ বা সাইলেন্ট মোড চালু করা যেতে পারে। জরুরি প্রয়োজনে নির্দিষ্ট কারও কল আসার অনুমতি রেখে ফোনটি বালিশ থেকে কিছুটা দূরে রাখাই ভালো।
মোবাইল ফোন থেকে রেডিওফ্রিকোয়েন্সি বা আরএফ শক্তি নির্গত হয়, যা নন-আয়োনাইজিং বিকিরণের একটি ধরন। এক্স-রের মতো আয়োনাইজিং বিকিরণের তুলনায় এর শক্তি এমন নয় যে তা ডিএনএকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করবে। ফোনের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে গবেষণা এখনো চলছে। আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা সংস্থা রেডিওফ্রিকোয়েন্সি ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ডকে ‘সম্ভাব্য ক্যানসার সৃষ্টিকারী’ হিসেবে গ্রুপ ২বি শ্রেণিতে রেখেছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে মোবাইল ফোন ক্যানসারের কারণ, এমন প্রমাণ মিলেছে।
পরবর্তী বিভিন্ন গবেষণায়ও মোবাইল ফোন ব্যবহার ও মস্তিষ্কের টিউমারের মধ্যে নিশ্চিত কার্যকারণ সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। ফলে শুধু বিছানার পাশে ফোন রাখলেই ক্যানসার হবে, এই দাবির পক্ষে শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তবে বিকিরণের সংস্পর্শ কমাতে ফোন কিছুটা দূরে রাখা, কথা বলার সময় স্পিকার ব্যবহার করা কিংবা প্রয়োজন না থাকলে এয়ারপ্লেন মোড চালু করা যেতে পারে।
রাতে ফোন কাছে রাখার সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ঝুঁকিগুলোর একটি হলো চার্জ দেওয়ার সময় অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়া। বালিশ, কম্বল বা তোশকের নিচে ফোন রেখে চার্জ দিলে তাপ বেরোনোর সুযোগ কমে যায়। এতে ফোন বেশি গরম হয় এবং আগুন লাগার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাটারি, ত্রুটিপূর্ণ চার্জার বা নষ্ট তার এই ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।
বিজ্ঞাপন
তাই ফোন চার্জে দেওয়ার সময় সেটি বিছানা, বালিশ, কম্বলসহ দাহ্য জিনিস থেকে দূরে শক্ত ও সমতল জায়গায় রাখা উচিত। প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা অনুযায়ী উপযুক্ত চার্জার ও তার ব্যবহার করাও জরুরি।
বিছানার পাশে ফোন থাকলে গভীর রাতেও খবর, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অফিসের বার্তা কিংবা ই-মেইল দেখার প্রবণতা তৈরি হয়। বিশেষ করে মন খারাপ করা খবর বা কাজের চাপসংক্রান্ত বার্তা ঘুমের আগে মনকে শান্ত করা কঠিন করে তোলে। ফোন কাছে থাকলেই উদ্বেগ বা বিষণ্ণতা তৈরি হবে, এমন নয়। তবে রাত জেগে অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার, দেরিতে ঘুমানো এবং ঘুমের মান খারাপ হওয়া দীর্ঘমেয়াদে মানসিক সুস্থতায় প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই ঘুমের আগে ফোন ব্যবহারের একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা ঠিক করা এবং রাতে ফোন থেকে দূরে থাকার অভ্যাস গড়ে তোলা ভালো। এর বদলে বই পড়া, আরামদায়ক অডিও শোনা কিংবা শ্বাস-প্রশ্বাসের সহজ অনুশীলন ঘুমের প্রস্তুতিতে সহায়ক হতে পারে।