অনলাইন বেটিংয়ে মাইক্রো-বেটিং যেভাবে আসক্তি বাড়ায়
কয়েক সেকেন্ডে ফল জানা যায় বলে বারবার বাজি ধরার তাগিদ তৈরি হয়, বিশেষজ্ঞরা বলছেন পেশাদার সহায়তার কথা
লাইফস্টাইল ডেস্ক · ঢাকা
প্রকাশ:
ধরুন, কোনো খেলার ফলাফল নিয়ে আপনি বাজি ধরলেন। মাত্র কয়েক সেকেন্ডেই জানা গেল ফল। জিতলেন কিংবা হারলেন, তারপর মনে হলো আরও একবার চেষ্টা করলে এবার হয়তো জেতা যাবে। ছোট অঙ্কের বাজির এই ধারায় কখন যে ঘন ঘন বেটিংয়ের অভ্যাস গেড়ে বসে, অনেকে টেরই পান না।
বিজ্ঞাপন
অনলাইন স্পোর্টস বেটিংয়ের জগতে এমনই একটি প্রবণতা ‘মাইক্রো-বেটিং’। এতে পুরো ম্যাচের ফলের বদলে খেলার ছোট ছোট ঘটনা নিয়ে বাজি ধরা হয়। যেমন ক্রিকেটে পরের বলটি স্ট্রাইক হবে, নাকি বল, এমন ঘটনা নিয়েও বাজি ধরা যায়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ফল জানা যায় বলে অল্প সময়ে বারবার বাজি ধরার সুযোগ মেলে। এই দ্রুতগতির আবর্তনই জুয়ার প্রতি আসক্তির ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
মনোবিজ্ঞান ও স্নায়ুবিজ্ঞানের আলোচনায় দেখা যায়, এ ধরনের বেটিংয়ের আকর্ষণ শুধু টাকা জেতার সম্ভাবনায় সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মস্তিষ্কের পুরস্কার পাওয়ার প্রত্যাশা, উত্তেজনা এবং ডোপামিন নামের একটি রাসায়নিক বার্তাবাহক।
ডোপামিনকে প্রায়ই আনন্দের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। তবে এটি শুধু আনন্দ অনুভব করার বিষয় নয়; প্রেরণা, প্রত্যাশা ও পুরস্কার পাওয়ার তাগিদ তৈরিতেও ভূমিকা রাখে। তাই বাজির ফল জানার আগের মুহূর্তটিও বেশ জরুরি হয়ে ওঠে।
কোনো বাজিতে জেতা যাবে কি না, আগে থেকে তা নিশ্চিত জানার উপায় নেই। এই অনিশ্চয়তাই পরবর্তী ফলের জন্য কৌতূহল বাড়িয়ে দিতে পারে। একবার জেতা, একবার হারা, এভাবে অনিয়মিত পুরস্কার মেলার অভিজ্ঞতা মানুষকে ফের চেষ্টায় টেনে আনতে পারে।
বিজ্ঞাপন
মাইক্রো-বেটিংয়ে এই আবর্তন চলে অতি দ্রুত। একটি বাজির ফল আসামাত্র আরেকটি ধরার সুযোগ মেলে। তাই জেতার আশা, উত্তেজনা আর আবার চেষ্টার তাগিদ বারবার ফিরে আসতে পারে। একসময় কেউ কেউ খেলাটি উপভোগের চেয়ে বাজি ধরার প্রক্রিয়ার দিকেই বেশি ঝুঁকে পড়েন।
জুয়ার অভ্যাস সমস্যা হয়ে দাঁড়ালে মস্তিষ্কের যে ব্যবস্থাগুলো পুরস্কার, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে জড়িত, সেগুলো প্রভাবিত হতে পারে। পুরস্কারের সঙ্গে সম্পর্কিত মস্তিষ্কের অংশ আরও তীব্র উত্তেজনার খোঁজ করতে পারে। উল্টো দিকে পরিকল্পনা, ঝুঁকির বিচার এবং তাৎক্ষণিক তাগিদ ঠেকানোর সামর্থ্য দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
ফলে আগের মতো উত্তেজনা পেতে কেউ ক্রমে বড় অঙ্কের বাজি ধরতে পারেন। হারানো টাকা ফিরে পেতে আবারও বাজিতে নামার আশঙ্কা থাকে। এমনকি ক্ষতি বুঝতে পারলেও খেলা বন্ধ করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
ক্ষতি শুধু আর্থিক নয়। পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্ক, কাজ বা পড়াশোনাও এতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বাজির অঙ্ক বা সময় নিয়ে মিথ্যা বলা, খেলা কমাতে গেলে অস্থির বোধ করা এবং লোকসান পুষিয়ে নিতে বারবার ফিরে যাওয়াও সমস্যাজনক জুয়ার লক্ষণ হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
অনলাইন বেটিং নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে নিজেকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। বরং কোন পরিস্থিতিতে বাজি ধরার তাগিদ বাড়ে, কোন মানসিক অবস্থায় বেশি বেটিং হয় এবং সেই তাগিদ কীভাবে সামলানো যায়, তা বোঝা দরকার।
মনোবিজ্ঞানের একটি চিকিৎসাপদ্ধতি কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি (সিবিটি)। এতে বাজির পেছনের চিন্তা, আবেগ ও আচরণের ধরন চিহ্নিত করে সেগুলো পাল্টানোর চেষ্টা করা হয়। যাঁরা জুয়ার আসক্তি কাটিয়ে উঠেছেন, তাঁদের সহায়তা গোষ্ঠীতে অভিজ্ঞতা বিনিময়, উৎসাহ ও জবাবদিহির সুযোগ মিলতে পারে। দরকার হলে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাহায্যও নেওয়া উচিত।
এ ছাড়া বেটিং অ্যাপ থেকে দূরে থাকা, বাজি ধরার সুযোগ সীমিত রাখা এবং যেসব পরিস্থিতি তাগিদ বাড়ায় সেগুলো এড়ানোও কাজে দিতে পারে। দীর্ঘদিনের বা গুরুতর আসক্তিতে অবশ্য কেবল ইচ্ছাশক্তির ওপর ভরসা না করে পেশাদার সহায়তা নেওয়াই ভালো।
স্নায়ুবিজ্ঞানী নিকোল এ. তেত্রো তার এক লেখায় ব্যাখ্যা করেছেন, মস্তিষ্কের পরিবর্তনশীলতার ক্ষমতা আছে বলে আচরণের পুরোনো ছক ভেঙে নতুন অভ্যাস গড়া সম্ভব। তবে এর জন্য সময়, ধারাবাহিক চেষ্টা ও উপযুক্ত সহায়তা লাগে।
বিজ্ঞাপন
ছোট অঙ্কের বাজি ধরলেই যে কেউ আসক্ত হবেন, তা নয়। কিন্তু অল্প সময়ে বারবার বাজির সুযোগ, অনিশ্চিত পুরস্কারের আশা আর হারানো টাকা ফেরত পাওয়ার তাগিদ একসঙ্গে ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বাজির অভ্যাস যখন অর্থ, সম্পর্ক বা দৈনন্দিন জীবনের ক্ষতি করতে থাকে, তখন তাকে নিছক বিনোদন ভেবে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়।