ফর্সা হওয়ার উপায়: ত্বক উজ্জ্বল করার নিরাপদ ঘরোয়া পদ্ধতি
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
ত্বকের রং মূলত বংশগত; তা নির্ধারণ করে মেলানিন নামের একটি রঞ্জক। কোনো ক্রিম, প্যাক বা খাবার জন্মগত গায়ের রং স্থায়ীভাবে বদলে দিতে পারে না, আর যে পণ্য কয়েক দিনে ধবধবে ফর্সা করার দাবি করে, সেটিই সবচেয়ে বিপজ্জনক। তবে রোদে পোড়া কালচে ভাব, মরা কোষের স্তর আর অযত্নে ম্লান হয়ে যাওয়া ত্বককে নিজের স্বাভাবিক উজ্জ্বলতায় ফিরিয়ে আনা যায়। ফর্সা হওয়ার উপায় বলতে বাস্তবে এটুকুই সম্ভব, এবং এটুকুতেই চেহারায় চোখে পড়ার মতো পরিবর্তন আসে।
বিজ্ঞাপন
এই পরিবর্তনের তিনটি ভিত্তি: রোদ থেকে সুরক্ষা, নিয়মিত পরিষ্কার ও আর্দ্র রাখা, আর ভেতর থেকে পুষ্টি। ঘরোয়া প্যাক এর সঙ্গে সহায়ক হতে পারে, কিন্তু প্রথম তিনটি বাদ দিয়ে শুধু প্যাক মাখলে লাভ সামান্য।
রোদই ত্বক কালো করার প্রধান কারণ
সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি ত্বকে মেলানিন বাড়িয়ে দেয়। এ কারণেই হাত-মুখ শরীরের ঢাকা অংশের চেয়ে কালো দেখায়। বাংলাদেশে প্রায় সারা বছর রোদ কড়া, তাই সানস্ক্রিনই সবচেয়ে কার্যকর ঘরোয়া অস্ত্র।
১. সানস্ক্রিন বাছাই: এসপিএফ ৩০ বা তার বেশি এবং ব্রড স্পেকট্রাম লেখা সানস্ক্রিন নিন। তৈলাক্ত ত্বকে জেল বা লোশন ধরনের, শুষ্ক ত্বকে ক্রিম ধরনের সুবিধাজনক।
বিজ্ঞাপন
২. পরিমাণ ঠিক রাখুন: পুরো মুখ ও গলার জন্য মোটামুটি দুই আঙুলের দৈর্ঘ্যের সমান সানস্ক্রিন লাগে। বাইরে যাওয়ার ১৫-২০ মিনিট আগে লাগান।
৩. আবার লাগান: বাইরে থাকলে বা খুব ঘামলে দুই-তিন ঘণ্টা পরপর আবার লাগাতে হয়।
৪. ছাতা-টুপিও কাজে দেয়: সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত রোদ সবচেয়ে কড়া। এ সময় বাইরে গেলে ছাতা, টুপি, সানগ্লাস ও হালকা রঙের লম্বা হাতার জামা পরুন।
মেঘলা দিনেও অতিবেগুনি রশ্মি পৌঁছায়, তাই সানস্ক্রিন শুধু রোদেলা দিনের জন্য নয়।
বিজ্ঞাপন
প্রতিদিনের সহজ যত্ন
সকালে ও রাতে মৃদু ফেসওয়াশ দিয়ে মুখ ধুয়ে নিন। কড়া ক্ষারীয় সাবান ত্বক শুষ্ক ও খসখসে করে, তাতে মুখ আরও নিষ্প্রভ দেখায়। ধোয়ার পর হালকা ময়েশ্চারাইজার লাগান; আর্দ্র ত্বক আলো ভালোভাবে প্রতিফলিত করে বলে বেশি উজ্জ্বল দেখায়।
সপ্তাহে এক-দুই দিন মৃদু এক্সফোলিয়েশন করলে মরা কোষ উঠে যায়। এর জন্য খুব দানাদার স্ক্রাব ঘষবেন না; ত্বকে সূক্ষ্ম ক্ষত হয়ে উল্টো দাগ পড়তে পারে। সংবেদনশীল ত্বকে সপ্তাহে একবারই যথেষ্ট।
রাতে মেকআপ তুলে তবেই ঘুমাবেন। সারা দিনের ধুলা, ঘাম আর প্রসাধনী মুখে থেকে গেলে লোমকূপ বন্ধ হয়, ব্রণ হয়, ত্বক ম্লান দেখায়।
বিজ্ঞাপন
ত্বকের ধরন বুঝে পণ্য বাছাই করুন। মুখ ধোয়ার এক ঘণ্টা পর কপাল ও নাক চকচক করলে ত্বক তৈলাক্ত; টানটান ও খসখসে লাগলে শুষ্ক; শুধু কপাল-নাক তেলতেলে আর গাল স্বাভাবিক হলে মিশ্র ধরনের। তৈলাক্ত ত্বকে হালকা জেল ময়েশ্চারাইজার, শুষ্ক ত্বকে একটু ঘন ক্রিম ভালো কাজ করে। শীতকালে প্রায় সবারই ত্বক শুষ্ক হয়ে যায়, তখন ময়েশ্চারাইজার বদলে নেওয়া যায়। যেটাই কিনুন, সুগন্ধি কম এমন পণ্য বেছে নিন, কারণ সুগন্ধি থেকে অনেকের ত্বকে জ্বালা ও কালচে ছোপ হয়।
ফর্সা হওয়ার ঘরোয়া উপায়: কয়েকটি নিরাপদ প্যাক
ঘরোয়া প্যাক সপ্তাহে দুই-তিন দিনের বেশি দরকার নেই। প্রথমবার ব্যবহারের আগে কানের পেছনে বা কবজিতে অল্প লাগিয়ে ২৪ ঘণ্টা দেখে নিন, চুলকানি বা লালচে ভাব হয় কি না।
১. টক দই ও বেসন: দুই চা-চামচ বেসনের সঙ্গে এক-দেড় চা-চামচ টক দই মিশিয়ে পেস্ট করুন। মুখে লাগিয়ে ১০-১৫ মিনিট রেখে আলতো করে ধুয়ে ফেলুন। দইয়ের ল্যাকটিক অ্যাসিড মৃদুভাবে মরা কোষ তুলতে সাহায্য করে।
বিজ্ঞাপন
২. মধু ও দুধের সর: শুষ্ক ত্বকের জন্য এক চা-চামচ মধুর সঙ্গে সামান্য দুধের সর মিশিয়ে ১০ মিনিট রেখে ধুয়ে ফেলুন। এতে ত্বক নরম ও সতেজ থাকে।
৩. অ্যালোভেরা জেল: গাছ থেকে তাজা জেল বের করে পরিষ্কার করে লাগাতে পারেন। রোদে পোড়া ত্বক ঠান্ডা করতে এটি বেশ আরামদায়ক।
৪. পাকা পেঁপে: পাকা পেঁপে চটকে ১০ মিনিট মুখে রেখে ধুয়ে নিন। সংবেদনশীল ত্বকে জ্বালা করলে সঙ্গে সঙ্গে ধুয়ে ফেলুন।
লেবুর রস সরাসরি মুখে ঘষার প্রচলিত পরামর্শটি এড়িয়ে চলাই ভালো। লেবুর অম্লতা ত্বকে জ্বালা তৈরি করে, আর লেবু লাগিয়ে রোদে গেলে কালো ছোপ পড়ার ঝুঁকি থাকে। টুথপেস্ট, বেকিং সোডা বা ব্লিচ মুখে লাগানোও ক্ষতিকর।
বিজ্ঞাপন
কী খেলে ফর্সা হয়?
এমন কোনো খাবার নেই যা খেলে গায়ের রং বদলে যায়। তবে সুষম খাবার ত্বককে সুস্থ ও উজ্জ্বল রাখে। ভিটামিন সি-যুক্ত আমলকী, পেয়ারা, লেবু, কমলা ও টমেটো ত্বকের কোলাজেন তৈরিতে কাজে লাগে। গাজর, মিষ্টিকুমড়া, পাকা আম, পেঁপে ও সবুজ শাকে আছে বিটা ক্যারোটিন। মাছ, ডিম, ডাল ও বাদাম থেকে আসে প্রোটিন ও প্রয়োজনীয় চর্বি।
দিনে পর্যাপ্ত পানি খান, যাতে প্রস্রাবের রং হালকা হলুদ থাকে। চিনি ও ডুবো তেলে ভাজা খাবার কমালে অনেকের ব্রণ ও তৈলাক্ত ভাব কমে, মুখ পরিষ্কার দেখায়। রাতে সাত-আট ঘণ্টা ঘুম আর ধূমপান না করা ত্বকের জন্য যেকোনো ক্রিমের চেয়ে বেশি উপকারী।
রং ফর্সাকারী ক্রিম কেনার আগে সাবধান
বিজ্ঞাপন
বাজারে অনেক ক্রিম মোড়কে উপাদানের তালিকা ছাড়াই বিক্রি হয়। এর কিছুতে পারদ বা স্টেরয়েড মেশানো থাকতে পারে বলে বিভিন্ন সময় সতর্ক করা হয়েছে। শুরুতে মুখ ঝকঝকে দেখালেও পরে ত্বক পাতলা হয়ে যাওয়া, লাল রগ ফুটে ওঠা, ব্রণ, অবাঞ্ছিত লোম ও স্থায়ী কালো দাগ হতে পারে। পারদ শরীরের ভেতরে কিডনি ও স্নায়ুরও ক্ষতি করে।
উপাদান না লেখা, নিবন্ধনহীন বা কয়েক দিনে ফর্সা করার দাবি করা পণ্য কিনবেন না। মুখে কোনো ওষুধযুক্ত ক্রিম লাগাতে চাইলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। নিয়াসিনামাইড, ভিটামিন সি বা অ্যাজেলাইক অ্যাসিডের মতো উপাদান অসম রং কমাতে সাহায্য করে, তবে এগুলোও ধীরে কাজ করে।
মুখ ফর্সা হওয়ার উপায় নিয়ে বাস্তব প্রত্যাশা
নিয়মিত সানস্ক্রিন আর যত্নে চার থেকে আট সপ্তাহের মধ্যে রোদে পোড়া ভাব কমতে শুরু করে। ত্বকের কোষ বদলাতে সময় লাগে, তাই সপ্তাহ দুয়েক পরে ফল না দেখে হাল ছেড়ে দেবেন না। লক্ষ্য রাখুন নিজের স্বাভাবিক রঙের সবচেয়ে সুস্থ রূপটির দিকে; শ্যামলা বা কালো ত্বকও যত্নে সমান উজ্জ্বল ও সুন্দর দেখায়।
বিজ্ঞাপন
মুখে হঠাৎ ছোপ ছোপ কালো দাগ, সাদা দাগ, দ্রুত বাড়তে থাকা তিল বা দীর্ঘদিনের চুলকানি থাকলে ঘরোয়া প্যাকে সময় নষ্ট না করে চিকিৎসকের কাছে যান।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
কত দিনে ত্বক উজ্জ্বল হয়?
প্রতিদিন সানস্ক্রিন ব্যবহার করলে রোদে পোড়া ভাব কমতে সাধারণত এক থেকে দুই মাস লাগে। তবে জন্মগত রং বদলায় না।
বিজ্ঞাপন
হলুদ মাখলে কি মুখ ফর্সা হয়?
হলুদের কিছু উপাদান ত্বকের জন্য উপকারী হতে পারে, তবে এটি রং বদলায় না। অনেকের ত্বকে হলুদ ছোপ বা জ্বালা হয়, তাই অল্প পরিমাণে ও পরীক্ষা করে ব্যবহার করুন।
ছেলেদের জন্য কি আলাদা নিয়ম?
না। ছেলেদের ত্বক সাধারণত একটু বেশি তৈলাক্ত, তাই জেল ধরনের সানস্ক্রিন ও ফেসওয়াশ সুবিধাজনক। দাড়ি কামানোর পর ময়েশ্চারাইজার লাগালে জ্বালা কমে।
বিজ্ঞাপন
গ্লুটাথিয়ন ইনজেকশন কি নিরাপদ?
ত্বক ফর্সা করার জন্য এ ধরনের ইনজেকশনের নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা প্রমাণিত নয় এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি আছে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এমন কিছু নেবেন না।