মুখের কালো দাগ দূর করার উপায়: ঘরোয়া প্যাক ও নিয়মিত যত্ন
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
মুখের কালো দাগ সবার একরকম নয়। কারও ব্রণ সেরে যাওয়ার পর বাদামি ছোপ থেকে যায়, কারও গালে-কপালে প্রজাপতির ডানার মতো ছড়ানো মেছতা, কারও রোদে পোড়া ছোট ছোট দাগ। কোন দাগ কেন হয়েছে, তা বুঝতে পারলে মুখের কালো দাগ দূর করার উপায় বেছে নেওয়া সহজ হয়।
বিজ্ঞাপন
বেশির ভাগ কালো দাগই ত্বকে বাড়তি মেলানিন জমার ফল। এগুলো ধীরে ধীরে হালকা হয়, যদি নতুন করে রোদ বা প্রদাহ দাগকে উসকে না দেয়। তাই যেকোনো চিকিৎসার প্রথম শর্ত প্রতিদিন সানস্ক্রিন, দ্বিতীয় শর্ত ধৈর্য। কয়েক দিনে দাগ মুছে দেওয়ার দাবি সত্য নয়।
আগে দাগটা চিনে নিন
১. ব্রণের পর কালো দাগ: চিকিৎসার ভাষায় পোস্ট-ইনফ্লামেটরি হাইপারপিগমেন্টেশন। ব্রণ, পোকার কামড় বা ঘষা লেগে প্রদাহের পর বাদামি বা কালচে ছোপ থেকে যায়। শ্যামলা ত্বকে এটি বেশি হয় এবং কয়েক মাস থাকতে পারে।
২. মেছতা: গাল, কপাল, নাকের ওপর ও ঠোঁটের ওপরে দুই পাশে প্রায় সমানভাবে ছড়ানো বাদামি ছোপ। নারীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়; গর্ভাবস্থায়, জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি খাওয়ার সময় বা রোদে বাড়ে। এটি একগুঁয়ে, বারবার ফিরে আসে।
বিজ্ঞাপন
৩. রোদে পোড়া দাগ: বয়স বাড়ার সঙ্গে রোদ লাগা জায়গায় ছোট চ্যাপ্টা বাদামি দাগ দেখা দেয়।
৪. প্রসাধনীর প্রতিক্রিয়ায় দাগ: সুগন্ধি, কড়া স্ক্রাব বা অজানা ক্রিমে জ্বালা হয়ে ত্বক কালচে হয়ে যেতে পারে।
দ্রুত আকার বদলানো, উঁচু, অসমান রঙের বা রক্তপাত হওয়া কালো দাগ ঘরোয়া যত্নের বিষয় নয়। এমন দাগ দেখলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যান।
সানস্ক্রিন ছাড়া কোনো উপায় কাজ করবে না
বিজ্ঞাপন
দাগ হালকা করার সব চেষ্টা কয়েক মিনিটের রোদেই ভেস্তে যেতে পারে, কারণ অতিবেগুনি রশ্মি মেলানিন তৈরির কোষকে আবার সক্রিয় করে। প্রতিদিন সকালে এসপিএফ ৩০ বা তার বেশি ব্রড স্পেকট্রাম সানস্ক্রিন লাগান, ঘরে থাকলেও। জানালা দিয়ে আসা আলো এবং দীর্ঘ সময় চুলার তাপও মেছতা বাড়াতে পারে বলে মনে করা হয়। বাইরে থাকলে দুই-তিন ঘণ্টা পরপর আবার লাগান, সঙ্গে চওড়া কিনারার টুপি বা ছাতা ব্যবহার করুন।
মেছতায় আক্রান্তদের জন্য আয়রন অক্সাইডযুক্ত রঙিন বা টিন্টেড সানস্ক্রিন বেশি সুরক্ষা দেয়, কারণ এটি দৃশ্যমান আলোও কিছুটা আটকায়।
মুখের দাগ দূর করার ঘরোয়া উপায়
প্রাকৃতিক উপায়ে মুখের দাগ দূর করা ধীর প্রক্রিয়া। নিচের প্যাকগুলো নিরাপদ এবং ত্বক মসৃণ রাখতে সাহায্য করে; হালকা দাগে সামান্য উপকার দিতে পারে, গভীর বা পুরোনো দাগে নয়। প্রতিটি সপ্তাহে দুই-তিন দিন ব্যবহার করুন এবং আগে কানের পেছনে পরীক্ষা করে নিন।
বিজ্ঞাপন
১. অ্যালোভেরা: রাতে মুখ ধোয়ার পর পাতলা স্তরে তাজা অ্যালোভেরা জেল লাগিয়ে রাখুন। এতে থাকা অ্যালোইন নামের উপাদান নিয়ে দাগ হালকা করার প্রাথমিক গবেষণা হয়েছে। পাতা কাটার পর বের হওয়া হলুদ কষ ত্বকে লাগাবেন না।
২. টক দই ও মধু: এক চা-চামচ টক দইয়ের সঙ্গে আধা চা-চামচ মধু মিশিয়ে ১৫ মিনিট রেখে ধুয়ে ফেলুন। দই মৃদু এক্সফোলিয়েন্ট, মধু আর্দ্রতা দেয়।
৩. গ্রিন টি: ঠান্ডা করা গ্রিন টিতে তুলা ভিজিয়ে মুখে বুলিয়ে নিন। এতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রোদের ক্ষতি থেকে ত্বককে কিছুটা রক্ষা করতে পারে।
৪. আলুর রস বা শসা: শীতল ও আরামদায়ক; দাগে বড় পরিবর্তন আশা না করলেও ত্বক সতেজ রাখে।
বিজ্ঞাপন
লেবুর রস, আপেল সিডার ভিনেগার, টুথপেস্ট বা কাঁচা হলুদের ঘন প্রলেপ সরাসরি দাগে লাগানো থেকে বিরত থাকুন। এগুলো জ্বালা তৈরি করে নতুন দাগের জন্ম দিতে পারে।
মুখের দাগ দূর করার ক্রিম: কোন উপাদান দেখবেন
বাজারের ক্রিমের নাম নয়, উপাদান দেখে কিনুন। নিচের উপাদানগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণা আছে এবং সাধারণত প্রেসক্রিপশন ছাড়াও পাওয়া যায়।
১. নিয়াসিনামাইড: ত্বকের রং সমান করে, প্রদাহ কমায়, বেশির ভাগ ত্বকে সহনীয়।
বিজ্ঞাপন
২. ভিটামিন সি: অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, দাগ হালকা করতে ও উজ্জ্বলতা বাড়াতে সাহায্য করে। সিরাম আলো ও বাতাসে নষ্ট হয়, তাই গাঢ় রঙের বোতলে, ঠান্ডা জায়গায় রাখুন।
৩. অ্যাজেলাইক অ্যাসিড: ব্রণ ও ব্রণের দাগ দুটিতেই কাজ করে।
৪. আলফা আরবুটিন ও কোজিক অ্যাসিড: মেলানিন তৈরিতে বাধা দেয়।
৫. রেটিনয়েড: কোষের পুনর্গঠন দ্রুত করে; রাতে অল্প মাত্রায় শুরু করতে হয়, গর্ভাবস্থায় ব্যবহার নিষেধ।
বিজ্ঞাপন
হাইড্রোকুইনোন বা স্টেরয়েডযুক্ত ক্রিম কেবল চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ব্যবহার করা যায়। নিজে নিজে দীর্ঘদিন মাখলে ত্বক পাতলা হওয়া, উল্টো কালো হয়ে যাওয়া বা লাল রগ ফুটে ওঠার মতো সমস্যা হয়। উপাদান না লেখা ক্রিম একেবারেই নয়।
নতুন দাগ যেন না পড়ে
পুরোনো দাগ হালকা করার পাশাপাশি নতুন দাগ ঠেকানোও সমান জরুরি। ব্রণ হলে শুরুতেই তার চিকিৎসা করুন, কারণ প্রতিটি ব্রণ শ্যামলা ত্বকে একটি সম্ভাব্য কালো দাগ। ব্রণ, ফুসকুড়ি বা মশার কামড় খুঁটবেন না, নখ দিয়ে চুলকাবেন না। মুখে জোরে স্ক্রাব ঘষা, রুক্ষ তোয়ালে দিয়ে মোছা আর ঘন ঘন ফেসিয়াল-ব্লিচ করানো বন্ধ করুন।
নতুন কোনো প্রসাধনী একসঙ্গে পুরো মুখে না মেখে আগে অল্প জায়গায় পরীক্ষা করে নিন। সুগন্ধিযুক্ত ক্রিম ও আতর সরাসরি মুখ-গলায় লাগালে রোদে গিয়ে অনেকের ত্বকে কালচে ছোপ পড়ে। যাঁরা দীর্ঘক্ষণ চুলার পাশে রান্না করেন, তাঁরা পারলে রান্নাঘরে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখুন এবং মুখ ঘেমে গেলে ঠান্ডা পানিতে ধুয়ে নিন।
বিজ্ঞাপন
পর্যাপ্ত ঘুম, ফল-সবজিসমৃদ্ধ খাবার আর ধূমপান না করা ত্বকের সার্বিক সুস্থতা রক্ষা করে, দাগ সারার গতিও বাড়ায়। থাইরয়েডের সমস্যা বা হরমোনের ওষুধ খাওয়ার সময় দাগ বাড়লে বিষয়টি চিকিৎসককে জানান।
কত দিনে ফল পাবেন, কখন চিকিৎসক
ব্রণের পর হওয়া হালকা দাগ নিয়মিত যত্নে তিন থেকে ছয় মাসে অনেকটা মিলিয়ে যায়। মেছতা নিয়ন্ত্রণে আরও বেশি সময় লাগে, এবং রোদ লাগলে আবার ফিরে আসে। ছয় থেকে আট সপ্তাহ নিয়ম মেনে চলার পরও উন্নতি না হলে, দাগ ছড়াতে থাকলে বা চুলকানি থাকলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ দেখান। কেমিক্যাল পিল, লেজারসহ বিভিন্ন চিকিৎসা আছে, তবে শ্যামলা ত্বকে ভুল পদ্ধতিতে এগুলো উল্টো দাগ বাড়াতে পারে, তাই প্রশিক্ষিত চিকিৎসকের কাছেই করাবেন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিজ্ঞাপন
মেছতা কি পুরোপুরি সারে?
অনেক ক্ষেত্রে অনেকটা হালকা হয়, তবে রোদ, হরমোন ও তাপে আবার বাড়তে পারে। তাই চিকিৎসার পরও সানস্ক্রিন চালিয়ে যেতে হয়।
রাতে কী লাগালে দাগ কমে?
রাতে পরিষ্কার মুখে নিয়াসিনামাইড বা অ্যাজেলাইক অ্যাসিডযুক্ত সিরাম এবং তারপর ময়েশ্চারাইজার লাগানো যায়। একসঙ্গে অনেক অ্যাসিড মেশাবেন না।
বিজ্ঞাপন
গর্ভাবস্থায় মুখে দাগ পড়লে কী করব?
গর্ভাবস্থায় হরমোনের কারণে মেছতা হওয়া সাধারণ ঘটনা, প্রসবের পর অনেকের কমে আসে। সানস্ক্রিন ও মৃদু যত্ন নিন; কোনো ক্রিম লাগানোর আগে চিকিৎসকের অনুমতি নিন।
দাগ ঢাকতে মেকআপ কি ক্ষতিকর?
না, তেলমুক্ত কনসিলার দিয়ে দাগ ঢাকা যায়। রাতে ভালোভাবে মেকআপ তুলে ফেলাই আসল কথা।
বিজ্ঞাপন
ছেলেদের মুখের দাগে কি আলাদা যত্ন লাগে?
নিয়ম একই। তবে দাড়ি কামানোর সময় কাটাছেঁড়া ও রেজারের ঘষা থেকে অনেক ছেলের গালে কালচে দাগ পড়ে। ধারালো ও পরিষ্কার রেজার ব্যবহার করুন, লোমের দিক অনুযায়ী কামান এবং পরে ময়েশ্চারাইজার লাগান।