উখিয়ায় রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যু
পরিবেশ অধিদপ্তর ও ফায়ার সার্ভিসের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে চলছিল টুপটুপ রিসোর্ট
কক্সবাজার জেলা প্রতিনিধি · উখিয়া, কক্সবাজার
প্রকাশ:
১০ অক্টোবর সকালে কক্সবাজারের উখিয়ায় পাটুয়ারটেক সৈকতের টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ জন পর্যটক নিহত হয়েছেন। স্বজন-পরিজন হারিয়ে দিশাহারা ভুক্তভোগীদের পরিবার, মরদেহের অপেক্ষায় এখনো দিন গুনছেন স্বজনেরা। এই অগ্নিকাণ্ড ও মর্মান্তিক মৃত্যুকে কেবল দুর্ঘটনা হিসেবে নয়, বরং প্রশাসনিক অবহেলা ও দীর্ঘদিনের অনিয়মের এক চরম পরিণতি হিসেবে দেখতে হবে।
বিজ্ঞাপন
এটি মোটেও আকস্মিক কোনো ঘটনা নয়, কারণ ঘটনার পর জানা গেছে পরিবেশ অধিদপ্তর, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক) এবং ফায়ার সার্ভিস—এই তিনটি সংস্থাই রিসোর্টটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে সতর্ক করেছিল। তবু সব নিয়মকানুন উপেক্ষা করেই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছিল তারা। তদারকির চরম ঘাটতি এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর নীরবতার মূল্য দিতে হলো ১০টি তাজা প্রাণ দিয়ে।
শুধু টুপটুপ রিসোর্টই নয়, কক্সবাজারে পর্যটন খাতে নিয়মকানুনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ব্যবসা চলছে। জেলায় অগ্নিনিরাপত্তা সনদ রয়েছে মাত্র ১১৫টি প্রতিষ্ঠানের এবং পরিবেশগত ছাড়পত্র আছে মাত্র ৪৪টির। এর বাইরে ঠিক কত প্রতিষ্ঠান এসব ছাড়া চলছে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট তালিকা সরকারি কোনো দপ্তরের কাছে নেই। মেরিন ড্রাইভের দুই পাশে প্রায় ২৫০টি হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ গড়ে উঠলেও তারকা মানের কয়েকটি ছাড়া অন্যগুলোর বৈধ অনুমোদন নেই।
পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) হিসেবে ঘোষিত হলেও সেখানে জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বিশেষ বিধিনিষেধ খুব কমই মানা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে নির্মাণের অনুমোদন নেওয়ার বদলে ভবন তৈরির পর দপ্তরে যোগাযোগ করা হচ্ছে। পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো জরিমানা, নোটিশ ও মামলা দিয়েই যেন তাদের দায়িত্ব শেষ করে দিয়েছে। নিয়মিত তদারকির অভাবে এই ধরনের আইনি পদক্ষেপ কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকছে।
অবৈধ স্থাপনার বিস্তার ও প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা টুপটুপ রিসোর্টের ট্র্যাজেডিতে আবারও স্পষ্ট হলো। বারবার দেখা যায়, কোনো দুর্ঘটনা ঘটার পরেই কেবল তার অনুমোদনহীনতা ও তদারকিশূন্যতার বিষয়টি সামনে আসে। এত প্রাণহানির পরও দায়িত্বশীলদের সচেতনতার অভাব দেখা যাচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
আসন্ন শীত মৌসুমে পর্যটনের ঢল নামার আগেই অগ্নিনিরাপত্তা ও পরিবেশগত ছাড়পত্রহীন ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর হালনাগাদ তালিকা তৈরি করে অবিলম্বে সিলগালা করতে হবে। পাশাপাশি ইসিএভুক্ত এলাকার অবৈধ স্থাপনাগুলো আইন অনুযায়ী কঠোরভাবে উচ্ছেদ করতে হবে। কেবল মামলা ও নামমাত্র জরিমানা দিয়ে যে এগুলোর সমাধান সম্ভব নয়, তা প্রমাণিত।
প্রশাসনের কাছে কঠোর আইনি হস্তক্ষেপ প্রত্যাশা করা হচ্ছে, কারণ এর সঙ্গে নাগরিকের জীবন-মরণের সম্পর্ক জড়িয়ে আছে। এসবের সঙ্গে যদি কোনো রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের সম্পৃক্ততা থাকে, তবে তা কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। কক্সবাজার দেশের প্রধান পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে স্থানীয় ও জাতীয় অর্থনীতি এবং দেশের ভাবমূর্তির সঙ্গে জড়িত। আজ যদি কঠোর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে আগামী দিনে আবারও এমন ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি ঘটবে।