রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ: কঠোর কূটনৈতিক ও আইনি পদক্ষেপের তাগিদ
নিহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ ও আটকদের ফিরিয়ে আনার দাবি
নিজস্ব প্রতিবেদক · ঢাকা
প্রকাশ:
বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করতে না পারার কারণে বিভিন্ন সময় নানা বিচিত্র দুর্ঘটনার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। উন্নত জীবনের আশায় চড়া সুদে ঋণ নিয়ে এবং ভিটেমাটি বিক্রি করে একদল বাংলাদেশি তরুণ রাশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন। তবে প্রতিশ্রুত চাকরির বদলে তাঁদের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ময়দানে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের অসংখ্য তরুণ বর্তমানে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সম্মুখসারিতে ‘টোপ’ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছেন। সেখানে গত তিন বছরে ৫৪টি তাজা প্রাণ ঝরেছে এবং অনেকে পঙ্গুত্ব বরণ করে হাসপাতালের বিছানায় কাতরাচ্ছেন।
বিজ্ঞাপন
যুদ্ধের ময়দানে নিহত বাংলাদেশি কর্মীদের লাশ উদ্ধার বা দেশে ফিরিয়ে আনার সুযোগ পাচ্ছে না তাঁদের পরিবার। উপার্জনক্ষম মানুষকে হারিয়ে শত শত পরিবার আজ দিশাহারা। একদিকে স্বজন হারানোর বেদনা, অন্যদিকে ঋণদাতাদের অব্যাহত চাপ তাঁদের জীবনকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
এই পরিস্থিতিকে দুটি বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে দেখা যায়। বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে ইউরোপে প্রবেশের ক্রমবর্ধমান হার বেকারত্বের করুণ পরিস্থিতিকে ফুটিয়ে তোলে। অন্যদিকে, রাষ্ট্রের আইনকানুনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মানব পাচারকারী চক্রের সক্রিয়তাও এর পেছনে দায়ী। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, যেসব রিক্রুটিং এজেন্সি কিংবা দালাল চক্র নিশ্চিত চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের দৃষ্টান্তমূলক আইনি পদক্ষেপ দেখা যায়নি। লাইসেন্সহীন কিংবা অভিযুক্ত এজেন্সিগুলো বারবার নাম ও পথ বদলে হাজার হাজার কর্মীকে অনিশ্চিত গন্তব্যে পাঠিয়ে দিচ্ছে, অথচ আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কেন এদের রুখতে পারছে না, তা বড় প্রশ্ন।
পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, পাচারকারীরা এখন শুধু দালাল সেজে নয়, বরং এআই, ডিপফেক, সোশ্যাল মিডিয়া ও ক্রিপ্টোকারেন্সির মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে মানুষকে ফাঁদে ফেলছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রবাসীকল্যাণ, পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে যৌথভাবে প্রযুক্তিগত ও কূটনৈতিক সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। যেসব ভুয়া ও চিহ্নিত অপরাধী রিক্রুটিং এজেন্সি মানব পাচারের সঙ্গে যুক্ত, তাদের কেবল লাইসেন্স বাতিলের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মানব পাচার প্রতিরোধ আইনে শাস্তি সুনিশ্চিত করতে হবে এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করতে হবে।
রাশিয়াগামী কর্মীদের ক্ষেত্রে ছাড়পত্র প্রদান, চাকরির নিয়োগপত্র সত্যায়ন ও এজেন্সির জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিমানবন্দরে নজরদারি বাড়াতে হবে।
বিজ্ঞাপন
বর্তমানে যাঁরা রাশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে আছেন বা চিকিৎসাধীন, তাঁদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। নিহত বাংলাদেশিদের প্রাপ্য ক্ষতিপূরণ আদায়ে জোরালো কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। সাম্প্রতিক ঘটনা থেকে প্রতীয়মান হচ্ছে, বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের নাগরিকেরা নাজুক অবস্থায় রয়েছেন। সম্প্রতি সৌদি আরবে দুই নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলো, অথচ কূটনৈতিক মিশন তা জানত না। আবার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সামনে দিয়ে নাগরিকদের তুলে দেওয়া হচ্ছে রাশিয়ার সেনাবাহিনীর হাতে, যা রাষ্ট্র হিসেবে চরম দুর্বলতার স্মারক। কোনো নাগরিক যেন আর কোনো দেশের যুদ্ধক্ষেত্রে ‘টোপ’ হিসেবে ব্যবহার না হন, তা নিশ্চিত করা সরকারের প্রশাসনিক ও নৈতিক দায়িত্ব।