সাজেক থেকে ফেরার পথে পর্যটকদের ওপর হামলা ও গোলাগুলি
নিরাপত্তা বাহিনীর পাহারায় খাগড়াছড়ি ফেরার পথে উজো বাজারে বাধার মুখে পড়েন পর্যটকরা
রাঙ্গামাটি জেলা প্রতিনিধি · বাঘাইছড়ি, রাঙ্গামাটি
প্রকাশ:
‘সারা রাস্তা আতঙ্কের মধ্যে ছিলাম, মনে হচ্ছে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছি। পুরো সময়টা কীভাবে কেটেছে, তা ভাবলে এখনো ভয় লাগে।’ নারায়ণগঞ্জ থেকে সাজেক ভ্রমণে আসা পর্যটক মোহাম্মদ নাঈম এভাবেই বর্ণনা করেন নিরাপত্তা বাহিনীর পাহারায় খাগড়াছড়িতে ফেরার পথে ঘটে যাওয়া গোলাগুলির ঘটনার অভিজ্ঞতা। খাগড়াছড়ির একটি হোটেলে আজ সকালে কথা হয় নাঈমের সঙ্গে। তিনি জানান, নিজের দুই শিশুসন্তান, বৃদ্ধ মা-বাবা, শ্বশুর-শাশুড়িসহ ১৯ জনের পরিবারের সঙ্গে প্রথমবারের মতো পার্বত্য চট্টগ্রামে বেড়াতে এসেছিলেন। সাজেকে অবস্থানকালে অবরোধের খবর পেয়ে তারা উৎকণ্ঠায় ছিলেন, পরে নিরাপত্তা বাহিনীর পাহারায় খাগড়াছড়ি পৌঁছানোর আশ্বাস পান। তবে পথে অবরোধকারীদের বাধার মুখে পড়েন তারা।
বিজ্ঞাপন
গোলাগুলির সময় পরিবারের সদস্যদের নিয়ে গাড়িতে খুবই আতঙ্কের মধ্যে সময় কেটেছে বলে জানান নাঈম। তিনি বলেন, ‘সাজেক থেকে ফেরার পথে সারাক্ষণ ভয়ের মধ্যে ছিলাম। কী হবে তা নিয়ে উৎকণ্ঠা ছিল। অবরোধকারীদের বাধার মুখে পড়ার পর ভয় আরও বেড়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হবে জানলে জীবনেও এখানে আসতাম না।’
সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন নামের দুটি সংগঠনের ডাকে বৃহস্পতিবার থেকে সাজেকে তৃতীয় দফায় অবরোধ শুরু হয়। অবরোধের প্রথম দিনে সাজেকে আটকে থাকা ২ হাজার ৯৩৩ পর্যটককে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাহারায় খাগড়াছড়ি শহরে ফিরিয়ে আনা হয়। ফেরার পথে উজো বাজার এলাকায় অবরোধকারীরা পর্যটকবাহী গাড়ি চলাচলে বাধা দিলে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যরা গুলি চালিয়েছে। তবে ইউপিডিএফ এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাহারায় খাগড়াছড়িতে ফেরা পর্যটক মাইন উদ্দিন বলেন, ‘গাড়ি আটকে দেওয়ার পর আমরা গাড়ির ভেতর বসে ছিলাম। হঠাৎ গুলির শব্দ শুনতে পাই। দেখি, মানুষ দৌড়ে এদিক-সেদিক পালিয়ে যাচ্ছে। এই দৃশ্য দেখে আমাদের সঙ্গে থাকা নারীরা কান্না শুরু করে দেন।’ মাইন উদ্দিন আরও বলেন, ‘দোয়া-দরুদ পড়তে পড়তে দীঘিনালায় পৌঁছেছি। আমরা সেখানে অপেক্ষা করছিলাম আমাদের দলের আরেকটি গাড়ির জন্য। তাঁরা ফেরার পর কিছুটা স্বস্তি পেয়েছি। এর আগে পুরো সময়টাই আতঙ্কে কেটেছে। কী ঘটতে যাচ্ছে, বুঝতে পারছিলাম না।’
ঢাকার উত্তরা থেকে সাজেকে বেড়াতে যাওয়া পর্যটক রাশেদ আহম্মেদ বলেন, ‘আমাদের শুক্রবার সকালে ফেরার কথা ছিল। রুমও সেভাবে বুকিং দিয়েছিলাম। তবে বুধবার সন্ধ্যায় কংলাক পাহাড় থেকে নামার সময় কয়েকজন পর্যটকের কাছে শুনি, সড়ক অবরোধের ডাক দেওয়া হয়েছে। খবর শুনে তাড়াহুড়া করে কটেজে ফিরে আসি। সেখানে জানিয়ে দেওয়া হয়, পরদিন সকাল আটটার মধ্যে রুম ছেড়ে দিতে হবে। নিরাপত্তা বাহিনীর পাহারায় আমাদের খাগড়াছড়ি নিয়ে যাওয়া হবে।’
বিজ্ঞাপন
রাশেদ আহম্মেদ আরও বলেন, ‘সকাল আটটায় গাড়িতে উঠে বসে থাকি। নয়টার দিকে কিছুটা পথ আসার পর অবরোধকারীরা উজো বাজার নামক স্থানে আমাদের গাড়ি আটকে দেন। প্রায় আধা ঘণ্টা আটকে ছিলাম।’ তিনি বলেন, ‘অবরোধকারীদের বাধায় আটকে পড়ে গাড়িতে বসে নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলাম। হঠাৎ গুলির শব্দ শুনতে পাই। আমাদের সঙ্গে থাকা শিশুরা ভয়ে কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। এর মধ্যে আমাদের গাড়ি লক্ষ্য করে একটি ঢিলও ছোড়া হয়েছিল। যদিও কারও গায়ে লাগেনি। আল্লাহকে ডাকতে ডাকতে কোনোমতে সেখান থেকে খাগড়াছড়ি চলে এসেছি। এখনো সেই কথা মনে হলে ভয় লাগে। শহরের আশপাশের পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে যেতেও কেমন জানি ভয় লাগছে।’
গত বুধবার সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন জানায়, বৃহস্পতিবার থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য অবরোধ চলবে। নিরাপত্তার স্বার্থে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন সাজেক পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে। বুধবার সন্ধ্যায় জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী গণবিজ্ঞপ্তিতে জানান, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ভ্যালি পর্যটন কেন্দ্র বন্ধ থাকবে এবং বৃহস্পতিবার বিকেল চারটার মধ্যে সবাইকে নিরাপদে সাজেক ছাড়তে হবে।
জেলা প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী বৃহস্পতিবার সকালে পর্যটকরা সাজেক ছাড়তে শুরু করেন। বাঘাইছড়ির উজো বাজার এলাকায় অবরোধকারীরা তাদের গতিরোধ করেন। অবরোধকারীদের তিন দফা দাবির মধ্যে রয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস—সন্তু লারমা) সশস্ত্র সদস্যদের সাজেক এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া। যদিও জেএসএসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাদের কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী নেই। এদিকে শনিবার রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় আধা বেলা অবরোধ পালনের ঘোষণা দিয়েছে ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ।