হামে সন্দেহভাজন রোগী ২ লাখ ২ হাজার: টিকাদানের ঘাটতি নিয়ে সতর্কতা বিশেষজ্ঞদের
ডব্লিউএইচও বলছে, এ রোগে এ পর্যন্ত ১ হাজার ১৪৭ জনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের ৯৪ শতাংশ পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু
মতামত ডেস্ক · ঢাকা
প্রকাশ:
বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাব সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে বাংলাদেশ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৯ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ২ লাখ ২ হাজার সন্দেহভাজন হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে পরীক্ষাগারে ২২ হাজার রোগীর হাম নিশ্চিত হয়েছে। এ বছর বিশ্বের অন্য যেকোনও দেশের চেয়ে বাংলাদেশে সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা বেশি। দুর্বল তথ্যব্যবস্থা, প্রচারের অভাব এবং টিকাদানে ঘাটতির কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, অত্যন্ত ছোঁয়াচে এই রোগে এ পর্যন্ত ১ হাজার ১৪৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের ৯৪ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদানের হার কমে গেলে প্রাণঘাতী এই রোগের প্রাদুর্ভাব কতটা ভয়াবহ হতে পারে, বাংলাদেশের পরিস্থিতি তারই সতর্কবার্তা।
ডব্লিউএইচওর মতে, প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে টিকাদানের হার ৯৫ শতাংশের ওপরে থাকা দরকার। কিন্তু ২০২৫ সালে বাংলাদেশের রুটিন টিকাদান কর্মসূচি হোঁচট খাওয়ায় কভারেজ ওই স্তরের নিচে নেমে যায়। সংস্থাটির নথি পর্যালোচনা এবং এক ডজনেরও বেশি বিজ্ঞানী, স্বাস্থ্যকর্মী ও কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জরুরি পরিস্থিতিতে সঠিক তথ্যের অভাবে লক্ষাধিক শিশু টিকার বাইরে থেকে যায়। প্রস্তুতিতে ঘাটতি এবং বাবা-মায়ের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য পৌঁছাতে না পারাও জরুরি কার্যক্রমে বাধা তৈরি করে।
নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির গ্লোবাল পাবলিক হেলথের অধ্যাপক ও ডব্লিউএইচওর ভ্যাকসিনবিষয়ক উপদেষ্টা মার্ক জিট বলেছেন, ‘এটি প্রতিটি দেশের জন্য একটি বাস্তব সতর্কতা’। তাঁর বক্তব্য, জরুরি পরিস্থিতিতে সাড়া দেওয়ার চেয়ে টিকার মাধ্যমে প্রাদুর্ভাব প্রতিরোধ করা অনেক সহজ, সস্তা ও নিরাপদ।
১৭ কোটি ৮০ লাখ জনসংখ্যার এই দেশের অন্যতম ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেট। সেখানে গত জুলাইয়ে টিকা না পাওয়া দুই বছরের শিশু আরমান হোসেন হাসপাতালে ভর্তির ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মারা যায়। চিকিৎসার খরচ জোগাতে পরিবারটিকে একমাত্র সম্বল অটোরিকশা বিক্রি করতে হয়েছিল। টিকা না পাওয়া তার চার বছরের বোন অবশ্য বেঁচে গেছে। শিশুটির বাবা আমিন মিয়া জানান, সময়মতো টিকা দিতে তাঁদের গ্রামে কোনও স্বাস্থ্যকর্মী আসেননি। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলেকে দাফন করার পরই কেবল তারা এসেছে’।
বিজ্ঞাপন
সিলেটের ছাতক শহরের ৩০ বছর বয়সী কাঠমিস্ত্রি হুমায়ুন রশিদের নয় মাস বয়সী মেয়ে লাবিবা আকতারও গত জুনে টিকা ছাড়াই মারা যায়। এপ্রিলে জরুরি টিকাদান কর্মসূচিতে টিকার বয়স ৯ মাস থেকে কমিয়ে ৬ মাস করা হয়েছিল। ফলে লাবিবাও টিকা পেতে পারত। তার বাবা আক্ষেপ করে বলেন, ‘কোনও স্বাস্থ্যকর্মী আমাদের তা জানাতে আসেনি’। ডব্লিউএইচওর তথ্যমতে, হাম সাধারণত প্রতি ১ হাজার আক্রান্তে দুই থেকে তিন জনের প্রাণ কেড়ে নেয়। পুষ্টিহীনতার মতো নানা কারণে দরিদ্র দেশগুলোতে রোগটি আরও মারাত্মক হয়।
সরকারি দাবি ও বাস্তব সংখ্যার মধ্যে ফারাকও চোখে পড়ছে। গত মে মাসে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন দাবি করেছিলেন, জরুরি অভিযানের ফলে হটস্পটগুলোতে হামের সংক্রমণ ‘প্রায় শূন্যের কোঠায়’ নেমেছে এবং প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে আছে। অথচ গত সেপ্টেম্বরে দৈনিক গড়ে ১ হাজার ১৯৮ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়, যা মে মাসের পর সর্বোচ্চ। উচ্চ জ্বর, কাশি ও সারা শরীরে লালচে ফুসকুড়ি এই রোগের লক্ষণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে টিকা নিয়ে দ্বিধার চেয়ে টিকা পাওয়ার সুযোগ ও সচেতনতার অভাবই বড় বাধা। ধনী দেশগুলোতে অবশ্য টিকা নিয়ে অনীহা বাড়ছে, যাকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যমন্ত্রী রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়রের মতো ব্যক্তিদের সংশয়বাদী অবস্থানও প্রভাবিত করছে।
একসময় টিকাদানে সফল দেশ হিসেবে পরিচিত ছিল বাংলাদেশ। ডব্লিউএইচও ও ইউনিসেফের হিসাবে, ২০২৪ সালে হামের টিকার প্রথম ডোজের হার ছিল ৯৬ শতাংশ আর দ্বিতীয় ডোজের হার ৯৩ শতাংশ। প্রথম ডোজের পর অল্পসংখ্যক শিশুর শরীরে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি না হওয়ায় দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়। চলতি বছরের জুলাইয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালে প্রথম ডোজের হার কমে ৯০ শতাংশে এবং দ্বিতীয় ডোজের হার ৮৬ শতাংশে নেমেছে। দুটি হারই প্রয়োজনীয় ৯৫ শতাংশের চেয়ে বেশ কম।
বিজ্ঞাপন
প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর বাংলাদেশ দ্রুত পদক্ষেপ নেয়। এপ্রিলে প্রায় ২ কোটি শিশুকে টিকা দেওয়ায় শুরুতে সংক্রমণ কিছুটা কমে। সরকার দাবি করেছিল, ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী লক্ষ্যমাত্রার সব শিশু টিকার আওতায় এসেছে। কিন্তু ডব্লিউএইচও ও সরকারের মধ্যে এপ্রিল ও আগস্টের নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, সময়ের অভাবে সাধারণত চার ধাপের জায়গায় মাত্র এক ধাপ প্রস্তুতি যাচাই করেই কর্মসূচি শুরু হয়েছিল। পরীক্ষাগারে হাম নিশ্চিত হওয়া শিশুদের মধ্যে টিকা না নেওয়ার হার কর্মসূচির আগে ছিল ৮২ শতাংশ, পরে ৮৫ শতাংশ। অর্থাৎ কর্মসূচির পরও টিকাদানের ঘাটতি কার্যত কাটেনি।
হাম ও রুবেলা নির্মূলে বাংলাদেশের ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কমিটির সভাপতি ও মহামারি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, যথাযথ প্রস্তুতি যাচাই না হলে প্রায়ই সবচেয়ে দরিদ্র ও দুর্গম অঞ্চলের শিশুরা টিকার বাইরে থেকে যায় এবং এর চড়া মূল্য দিতে হয়। ডব্লিউএইচওর বাংলাদেশ প্রতিনিধি ডা. রাজেশ নারওয়াল জানান, ঝুঁকিতে থাকা প্রতিটি শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য অর্জনে তাঁরা সরকারকে সহযোগিতা করতে বদ্ধপরিকর।
সিলেটে সরকারি হিসাবে ১৮০ শিশুর মৃত্যুর তথ্য আছে। সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের সাক্ষাৎকার নেওয়া ১৬টি পরিবারের ৮টিই জানায়, তারা কোনও স্বাস্থ্যকর্মীকে টিকা দিতে দেখেনি। অন্তত ছয়টি পরিবার বলেছে, তাদের কমিউনিটিতে হামে শিশুর মৃত্যুর পরই কেবল স্বাস্থ্যকর্মীরা গেছেন।
পরিস্থিতি সামাল দিতে সেপ্টেম্বরের শেষে বাদ পড়া ৩৪ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনতে নতুন কর্মসূচি শুরু করেছে সরকার। স্বাস্থ্যমন্ত্রী এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, কোনও শিশু যেন বাদ না পড়ে, সে জন্য গ্রাম পর্যায়ে লোকজনকে যুক্ত করা হবে। তবে প্রতিটি শিশুর কাছে পৌঁছানো এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, প্রায় ৪০ শতাংশ শিশুর জন্ম নিবন্ধন হয় না, আর সরকারি ডেটা অনুযায়ী স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রায় এক তৃতীয়াংশ পদ খালি।
বিজ্ঞাপন
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা পাঁচ বছরের বেশি বয়সীদেরও টিকার আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়ে আসছেন। ডব্লিউএইচওর তথ্যে, এই বয়সী শিশুরা মোট হাম আক্রান্তের এক তৃতীয়াংশ। ছয় মাস বা তার কম বয়সী শিশুর শরীরে কেন প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুত অ্যান্টিবডি কমে যাচ্ছে, তা নিয়ে দেশের বিজ্ঞানীরা গবেষণা করছেন। ডব্লিউএইচও সতর্ক করেছে, ডেঙ্গু মহামারির সঙ্গে লড়াইয়ের পাশাপাশি হামের রোগীদের দ্রুত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাও সমান জরুরি।