ফ্যামিলি কার্ড: ভাতা পাওয়ার শর্ত, অযোগ্যতার কারণ ও অভিযোগ নিষ্পত্তির নিয়ম
১২ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া তথ্য সংগ্রহ শেষ হবে ৩০ নভেম্বরের মধ্যে, প্রায় ৪০ লাখ নারী পরিবারপ্রধান পাবেন মাসিক আড়াই হাজার টাকা
মতামত ডেস্ক · ঢাকা
প্রকাশ:
ফ্যামিলি কার্ডের জন্য কাউকে আবেদন করতে হবে না, যেতে হবে না কোনও সরকারি দপ্তরেও। সরকারের নিয়োগ করা তথ্য সংগ্রহকারীরাই প্রতিটি পরিবারের দরজায় পৌঁছে যাবেন। তবে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহের পর কে ভাতা পাবেন আর কে বাদ পড়বেন, সেই সিদ্ধান্ত স্থানীয় জনপ্রতিনিধি কিংবা তথ্য সংগ্রহকারীরাও নেবেন না। পরিবারের আয়, সম্পদ ও জীবনযাত্রার মানসহ নানা তথ্য বিশ্লেষণ করে সফটওয়্যারের মাধ্যমে ভাতা পাওয়ার যোগ্যতা নির্ধারিত হবে। ভুল তথ্যের কারণে কোনও দরিদ্র পরিবার বাদ পড়লে অভিযোগ, গণশুনানি ও আপিলের সুযোগ থাকবে। সরকারের দাবি, এতে রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের সুযোগ কমবে।
বিজ্ঞাপন
সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, দেশের কোটি কোটি পরিবারের আর্থসামাজিক তথ্য একটি ডেটাবেজে আনার এই বড় কর্মসূচিতে প্রধান পরীক্ষা হবে প্রকৃত দরিদ্র পরিবার শনাক্ত করা, মাঠপর্যায়ে তথ্যের নির্ভুলতা নিশ্চিত করা এবং অভিযোগের কার্যকর নিষ্পত্তি। কারণ একটি পরিবারের তথ্য সংগ্রহে সামান্য ভুলও ভাতা পাওয়ার যোগ্যতাকে প্রভাবিত করতে পারে। আবার শুধু প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা চালু করলেই অনিয়ম বন্ধ হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। ফলে কর্মসূচির সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে স্বচ্ছতা, কার্যকর তদারকি ও জবাবদিহির ওপর।
গত ১২ অক্টোবর থেকে সারা দেশে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছে সরকার। পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ শেষ করে ডিসেম্বরের মধ্যে প্রায় ৪ কোটি ৪৫ লাখ পরিবারের তথ্য কেন্দ্রীয় ডেটাবেইজে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে নতুন করে প্রায় ৪০ লাখ নারী পরিবারপ্রধানকে মাসিক আড়াই হাজার টাকা করে ভাতা দেওয়ার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত ‘ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন নীতিমালা, ২০২৬’, সরকারি গেজেট এবং গত সোমবার (১২ অক্টোবর) সচিবালয়ে সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন ও প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীনের বক্তব্য থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
কর্মসূচির আওতায় দেশের সব পরিবারের আর্থসামাজিক তথ্য নেওয়ার পর পরিবারগুলোকে পাঁচ শ্রেণিতে ভাগ করা হবে: অতি দরিদ্র, দরিদ্র, ঝুঁকিপূর্ণ নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত। সরকারের পরিকল্পনায় প্রতিটি পরিবারের নারীপ্রধানকে কার্ডের আওতায় আনা হলেও নগদ ভাতা পাবেন প্রথম তিন শ্রেণির যোগ্য নারীপ্রধানেরা।
গত ২০ আগস্ট প্রকাশিত সরকারি গেজেটে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রক্সি মিন্স টেস্ট বা পিএমটি পদ্ধতিতে পরিবারের আর্থসামাজিক অবস্থান নির্ধারণ করা হবে। প্রাথমিকভাবে ৮৬০ বা তার কম স্কোর পাওয়া পরিবার নগদ সহায়তার উপযুক্ত বিবেচিত হবে। অঞ্চলভেদে ঝুঁকি ও জীবনযাত্রার পার্থক্য বিবেচনার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। স্কোর নির্ধারণে পরিবারের আয়, সম্পদ, সদস্যদের পেশা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, বসতবাড়ির অবস্থা, জমি ও অন্যান্য সূচক বিবেচনায় নেওয়া হবে। মাঠের তথ্য সংগ্রহকারী এসব তথ্য ডিজিটাল ব্যবস্থায় তুলবেন, তবে কোন প্রশ্নের উত্তরের জন্য কত নম্বর, তা তিনি জানতে পারবেন না।
বিজ্ঞাপন
সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, ‘তথ্য সংগ্রহকারীর দায়িত্ব শুধু নির্ভুল তথ্য সংগ্রহ করা। কে ভাতা পাবেন, তা তিনি নির্ধারণ করবেন না। সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে সফটওয়্যার স্বয়ংক্রিয়ভাবে উপকারভোগীর যোগ্যতা নির্ধারণ করবে।’ মন্ত্রী জানান, রাজনৈতিক কিংবা ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে সুবিধা দেওয়া বা বঞ্চিত করার সুযোগ রাখা হয়নি।
চূড়ান্ত নীতিমালায় শুধু পিএমটি স্কোরের ভিত্তিতে উপকারভোগী বাছাইয়ের কথা বলা হয়নি; কিছু ক্ষেত্রে অযোগ্যতার সুনির্দিষ্ট শর্তও আছে। সরকারি গেজেট অনুযায়ী, পরিবারের নারীপ্রধান নিয়মিত সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে কাজ করে বেতন-ভাতা পেলে কিংবা নির্দিষ্ট ধরনের সরকারি পেনশন নিলে নগদ ভাতার জন্য অযোগ্য বিবেচিত হতে পারেন। পরিবারের কোনও সদস্যের নামে পাঁচ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয় বা নির্দিষ্ট ধরনের বিনিয়োগ, বিআরটিএতে নিবন্ধিত নির্ধারিত মোটরযান, বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মালিকানা অথবা নির্ধারিত সীমার বেশি জমি ও সম্পদ থাকলেও অযোগ্যতার বিধান আছে। ফলে পিএমটি স্কোরে দরিদ্র চিহ্নিত হলেও অন্য শর্ত প্রযোজ্য হলে কোনও পরিবার ভাতা থেকে বাদ পড়তে পারে।
অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা কর্মসূচির কাঠামোর অন্যতম অংশ। কোনও পরিবার তথ্য সংগ্রহের বাইরে থাকলে, যোগ্য হয়েও ভাতা না পেলে কিংবা অযোগ্য কাউকে তালিকায় রাখার অভিযোগ থাকলে প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ আছে। সমাজকল্যাণমন্ত্রী জানিয়েছেন, ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে সমাজকল্যাণের জন্য নির্ধারিত কক্ষগুলো ‘সেবাকেন্দ্র’ হিসেবে ব্যবহার করা হবে। সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত ইউনিয়ন সমাজকর্মীর সহায়তায় নাগরিকেরা সরাসরি অভিযোগ জানাতে পারবেন। অনলাইনেও অভিযোগ জমা দেওয়া যাবে। মন্ত্রী বলেন, ‘আপিলের সিস্টেম আছে। একটা অফলাইন, একটা অনলাইন।’
মন্ত্রীর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কোনও নাগরিক সেবাকেন্দ্রে লিখিত অভিযোগ করলেও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মী তা অনলাইন ব্যবস্থায় তুলতে পারবেন। ফলে স্থানীয় পর্যায়ের অভিযোগ কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকেও দেখা সম্ভব হবে। চূড়ান্ত নীতিমালায় প্রাপ্ত অভিযোগ সংশ্লিষ্ট উপজেলা বা শহর বাস্তবায়ন কমিটির মাধ্যমে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে নিষ্পত্তির বিধান রাখা হয়েছে। সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট হলে পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে জেলা পর্যায়ে আপিল করা যাবে এবং আপিল কর্তৃপক্ষকেও সিদ্ধান্ত দিতে হবে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে।
বিজ্ঞাপন
অভিযোগ নিষ্পত্তির পাশাপাশি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে গণশুনানির ব্যবস্থাও আছে। প্রাথমিক উপকারভোগী তালিকা প্রকাশের পর স্থানীয় বাসিন্দারা সেখানে বাদ পড়া পরিবার কিংবা অযোগ্য ব্যক্তির অন্তর্ভুক্তি নিয়ে আপত্তি জানাতে পারবেন। মন্ত্রী বলেন, ‘এই ব্যবস্থা রাখার উদ্দেশ্য হচ্ছে, যাদের ভাতা পাওয়ার কথা তারা যেন বাদ না পড়েন, আবার অযোগ্য কেউ যেন তালিকায় ঢুকে যেতে না পারেন।’
সারা দেশে তথ্য সংগ্রহে নিয়োজিত আছেন ৬৬ হাজার ৮১৫ জন তথ্য সংগ্রহকারী ও ৬ হাজার ৬৮১ জন সুপারভাইজার। প্রতিটি বাড়িতে গিয়ে বিশেষায়িত ট্যাবলেটের মাধ্যমে তথ্য নেওয়ার নির্দেশনা আছে। প্রত্যেক তথ্য সংগ্রহকারীকে একটি পরিবারের প্রায় ৫০ থেকে ৫১টি প্রশ্নের উত্তর সংগ্রহ করতে হবে। সরকারি নীতিমালায় দুর্গম পাহাড়ি, চর ও ইন্টারনেট সংযোগহীন এলাকায় অফলাইন পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করে পরে কেন্দ্রীয় সার্ভারে যুক্ত করার ব্যবস্থা রয়েছে।