ব্যস্ততার মাঝেও কোরআনচর্চা যেভাবে করা যায়
যাতায়াতের পথ, খাবার টেবিল, ঘুমের আগের দশ মিনিট কিংবা কর্মস্থলের অবসরেও কোরআনের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ আছে
ধর্ম ডেস্ক · ঢাকা
প্রকাশ:
আধুনিক জীবনে মানুষ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি ব্যস্ত। ব্যক্তিগত, সামাজিক ও আত্মিক নানা জটিলতা থেকে মুক্তির পথ খুঁজতে আমরা কত উপায়েরই-না আশ্রয় নিই। অথচ এই খোঁজার ভিড়ে মহাগ্রন্থ আল-কোরআনের কথা অনেক সময় আমাদের মনেই থাকে না।
বিজ্ঞাপন
প্রতিদিন ভোরে নামাজ শেষে কোরআনের সান্নিধ্যে সময় কাটানো এবং তার আলোয় পুরো দিনের কর্মপরিকল্পনা সাজানোর সুন্দর অভ্যাসটি আমরা ক্রমেই হারিয়ে ফেলছি। মানুষের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক জীবনের জন্য যে গ্রন্থ শাশ্বত ও পূর্ণাঙ্গ দিকনির্দেশনা দেয়, আমাদের দৈনন্দিন জীবনে তার অবস্থান ঠিক কতটুকু—সেটি আজ গভীরভাবে ভাববার বিষয়।
ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে আমাদের চেষ্টার কমতি নেই। অথচ এই গ্রন্থেই মহান রব স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, ‘আর নিশ্চয়ই তা (কোরআন) মুমিনদের জন্য হিদায়াত ও রহমত।’ (সুরা নামল: ৭৭)
সুফি সাহিত্য ও ইসলামি ভাবধারায় কোরআনকে মানব চরিত্রের ‘পরশপাথর’ বা ‘কিমিয়া’ বলা হয়। হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজালি (রহ.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থের নাম রেখেছিলেন ‘কিমিয়ায়ে সাআদাত’ বা ‘সৌভাগ্যের পরশপাথর’। কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে মানুষের জীবনকে আলোকিত করার নির্দেশিকাই এই গ্রন্থের মূল বিষয়।
ব্যস্ততার মধ্যেও যেভাবে কোরআনচর্চা করা যায়, তা নিচে তুলে ধরা হলো।
বিজ্ঞাপন
১. চলতি কোরআন পাঠ : কর্মক্ষেত্রে যাওয়া-আসার পথে আমাদের প্রচুর সময় নষ্ট হয়। বিশেষ করে শহরের যানজটে দীর্ঘ সময় বসে থাকতে হয়। এই সময় ফেসবুক বা অন্য কোনো সামাজিক মাধ্যমে না কাটিয়ে কোরআন, কোরআনের অর্থ ও ব্যাখ্যা পড়া যায়। আধুনিক মোবাইল ফোনে ব্যবহার করার মতো কোরআনভিত্তিক অসংখ্য আলোচনা গুগল প্লে স্টোর ও অ্যাপল স্টোরে পাওয়া যায়।
২. চলতি পথে কোরআন শ্রবণ : দেখে দেখে কোরআন পড়তে ইচ্ছা না করলে চলার পথে তিলাওয়াত শোনাও যেতে পারে। শায়খ হুজায়ফি, শায়খ সুদাইসি ও শায়খ মিশয়ারির মতো আরব বিশ্বের খ্যাতিমান কারিদের তিলাওয়াত অনলাইনে পাওয়া যায়। বাংলাদেশি অনেক কারির তিলাওয়াতও সেখানে আছে। বিশেষত আরবের বিখ্যাত কারিদের তিলাওয়াতের অ্যাপস গুগল প্লে স্টোর ও অ্যাপল স্টোরে মেলে।
৩. পাঁচ ওয়াক্তে ২৫ মিনিট : পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আগে বা পরে পাঁচ মিনিট করে তিলাওয়াত করলে দৈনিক পাঁচ থেকে আট পৃষ্ঠা কোরআন পড়া সম্ভব। এ জন্য মোবাইল ফোনেও তিলাওয়াত করা যেতে পারে। চাইলে তিন ওয়াক্ত নামাজের পর তিলাওয়াত করে বাকি দুই ওয়াক্তের এক ওয়াক্তে ৫ থেকে ১০টি আয়াতের অর্থ এবং অন্য ওয়াক্তে এক থেকে তিনটি আয়াতের ব্যাখ্যা পড়া যায়।
৪. খাবার টেবিলে আলোচনা : দুপুর বা রাতে খাবার টেবিলে কিংবা দস্তরখানে পরিবারের বেশির ভাগ সদস্য একসঙ্গে থাকেন। তখন কোরআনের বিভিন্ন আয়াত, আয়াতের বিধান, আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পরিপ্রেক্ষিত ও আয়াতের শিক্ষা নিয়ে কথা বলা যায়। আলেমরা বলেন, খাওয়ার সময় একেবারে চুপ থাকার চেয়ে দ্বিনি বিষয়ে আলোচনা করা উত্তম। বড়দের আলোচনা ছোটরা শুনতে পারে, আবার ছোটদের আলোচনা বড়রাও শুনতে পারেন।
বিজ্ঞাপন
৫. ঘুমের আগে ১০ মিনিট : অজু করে ঘুমানো মুস্তাহাব। বিশুদ্ধ হাদিসে ঘুমানোর আগে ইখলাস, ফালাক, নাস, মুলক ইত্যাদি সুরা পড়ার কথা এসেছে। যাঁরা সারা দিন তিলাওয়াতের সুযোগ পান না, তাঁরা রাতে ঘুমানোর আগে ওই সুরাগুলোর সঙ্গে ১০ থেকে ১৫ মিনিট অন্য সুরাও তিলাওয়াত করে নিতে পারেন।
৬. নামাজে তিলাওয়াত : যাঁরা কোরআনের হাফেজ, কিন্তু নিয়মিত তিলাওয়াতের সুযোগ পান না, তাঁরা পাঁচ ওয়াক্তের ফরজ ও সুন্নত নামাজে ধারাবাহিকভাবে তিলাওয়াত করতে পারেন। যাঁরা হাফেজ নন, তবে কোরআনের বিভিন্ন অংশ মুখস্থ করেছেন, তাঁরাও তা ধরে রাখতে নামাজে নিয়মিত সেসব অংশ পড়তে পারেন।
৭. কর্মস্থলে কোরআন শরিফ : কর্মস্থলে কখনো কখনো অল্প সময়ের জন্য অবসর মেলে, তখন হাতে ঠিক কোনো কাজ থাকে না। টুকরা টুকরা এসব অবসরেও কোরআনচর্চা করা যেতে পারে। এ জন্য কর্মস্থলেও একটি কোরআন শরিফ বা তার ব্যাখ্যা গ্রন্থ রাখা যায়।
যাঁরা শত ব্যস্ততার মধ্যেও কোরআন আঁকড়ে ধরে রাখবেন এবং তা চর্চা করবেন, আল্লাহ কোরআনের মাধ্যমে তাঁদের আলোর পথ দেখাবেন। আল্লাহ বলেন, ‘যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করতে চায়, এর (কোরআন) দ্বারা তিনি তাদের শান্তির পথে পরিচালিত করেন এবং নিজ অনুমতিক্রমে অন্ধকার থেকে বের করে আলোর দিকে নিয়ে যান এবং তাদের সরল পথে পরিচালিত করেন।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ১৬)
বিজ্ঞাপন
কোরআনচর্চার ফলে মুমিনের ঈমান বাড়ে এবং ধর্মীয় জীবনেরও উন্নতি হয়। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যখনই কোনো সুরা অবতীর্ণ হয়, তখন তাদের কেউ কেউ বলে, এটা তোমাদের মধ্যে কার ঈমান বৃদ্ধি করল? যারা মুমিন এটা তাদেরই ঈমান বৃদ্ধি করে এবং তারাই আনন্দিত হয়।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ১২৪)