কবি আরিফ মঈনুদ্দীনের ‘ক্ষমা চাই—ক্ষমা’ কবিতায় অনুতাপ ও ক্ষমার আকাঙ্ক্ষা
মহান আল্লাহকে নিয়ে লেখা দুই খণ্ডের কাব্যগ্রন্থ ‘দ্য গ্রেট’-এর অন্তর্ভুক্ত কবিতাটিতে আত্মসমালোচনা ও তওবার সুর ফুটে উঠেছে
ধর্ম ডেস্ক · ঢাকা
প্রকাশ:
ভুল থেকে সারাক্ষণ নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। অজান্তেই কথায়, কাজে ও চলাফেরায় অনেক ভুল ঘটে যায়। এমন সময় তার সামনে খোলা থাকে একটিই রাস্তা: নিজের ভুল মেনে নিয়ে মহান আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা। কবি আরিফ মঈনুদ্দীনের ‘ক্ষমা চাই—ক্ষমা’ কবিতায় এই অনুভূতির গভীর প্রকাশ দেখা যায়।
বিজ্ঞাপন
স্রষ্টা মহান আল্লাহকে বিষয় করে কবি ‘দ্য গ্রেট’ নামে দুই খণ্ডের কাব্যগ্রন্থ রচনা করেছেন। আলোচ্য কবিতাটি ওই গ্রন্থেরই অংশ।
নিজের ইবাদত ও জীবনের নানা ভুলের দিকে তাকিয়ে কবি তৃপ্ত হতে পারেননি। অসহায়ত্ব উপলব্ধি করে তিনি বরং স্রষ্টার কাছে মার্জনা চেয়েছেন। কবিতার প্রতিটি পঙ্ক্তিতেই অনুতাপ, আত্মসমালোচনা ও ক্ষমার আকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কবিতাটি নিচে দেওয়া হলো।
আমার প্রার্থনায় জমা হওয়া সব ইবাদত / অসহায় দৃষ্টিতে হতবিহ্বল তাকিয়ে থাকবে অবাক! / অপরিপূর্ণ ইবাদতের ভাষা অনুবাদহীন / জড় পদার্থের মতো বেখবর পড়ে থাকবে পাশে।
তাঁর ক্ষমা ছাড়া আমার পার পাওয়ার / কোনো উপায় নেই—কোনো গত্যন্তর নেই / প্রতিমুহূর্তে ভুল—জমা হয় ভুলের মাশুল, / মাশুল যদি দিতে হয়, ফতুর হয়ে যাবে আমার ভান্ডার / নিরেট দেউলিয়াত্বে অভিষিক্ত আমি সহায়সম্বলহীন নিঃস্ব! / তাঁর ক্ষমা ছাড়া আমার আর কোনো দ্বিতীয় পথ নেই
বিজ্ঞাপন
ক্ষমারযোগ্য হওয়ার আজীবন সাধনায় ব্যাপৃত থেকেও / প্রতি পদে পদে করেছি পাপ / কোনোভাবেই পাপের রাস্তা থেকে পা তুলতে পারি না— / ঘর থেকে বের হই—সমুখে যন্ত্রণা, / অবনত দৃষ্টির দোহাই—ক্ষমা চাই, ক্ষমা / কারও কারও মনোবেদনার কারণ আমি, / মিষ্টভাষী বচনামৃত ধারণকারীর দোহাই—ক্ষমা চাই, ক্ষমা / নতুন পোশাক পরে রাস্তা কাঁপিয়ে হাঁটি / বিনীত পদক্ষেপের দোহাই—ক্ষমা চাই, ক্ষমা
প্রতিমুহূর্তে ভুল হয়—প্রতিমুহূর্তে ক্ষমা চাই / প্রতিমুহূর্তে পাপ হয়—প্রতিমুহূর্তে ক্ষমা চাই / ক্ষমা চাই—ক্ষমা, ক্ষমারযোগ্য হতে চাই / স্রষ্টার অনুগ্রহ এ-ই—এরচেয়ে বড়ো সাফল্য আর কিছু নাই।
শুরুতেই কবি ফিরে তাকান নিজের ইবাদতের দিকে। সেখানে তৃপ্তির কোনো জায়গা নেই; আছে ভয় আর অপূর্ণতাবোধ। যত ইবাদতই করা হোক, নিজের ভুলত্রুটি ও সীমাবদ্ধতার কারণে সেই আমল কতটা কবুল হবে, এই প্রশ্ন কবিকে তাড়া করে ফেরে।
আত্মজিজ্ঞাসাই কবিতাটির সবচেয়ে জোরালো দিক। ‘আমার প্রার্থনায় জমা হওয়া সব ইবাদত/ মুখ থুবড়ে পড়ে থাকবে’, এই বক্তব্যে কবি নিজের ইবাদতকে এমন এক চিত্রে ধরেছেন, যেন স্রষ্টার সামনে হাজির করার পর নিজের অপূর্ণতার কারণেই তা অসহায় পড়ে আছে। ‘বিকলাঙ্গ শিশুর মতোন’ এবং ‘অপরিপূর্ণ ইবাদতের ভাষা অনুবাদহীন’ কথাগুলো মনে করিয়ে দেয়, ইবাদতের বাইরের পরিমাণের চেয়ে ভেতরের মান ও গ্রহণযোগ্যতাই আসল প্রশ্ন। এখানে আছে বিনয়, আত্মপ্রবঞ্চনা নেই।
বিজ্ঞাপন
তারপর কবিতা আরও গভীর আত্মসমালোচনায় পৌঁছায়। ‘প্রতিমুহূর্তে ভুল’ আর ‘প্রতিমুহূর্তে পাপ’ উচ্চারণে উঠে আসে মানুষের প্রতিদিনের বাস্তবতা। চাইলেও কেউ সবসময় নিজেকে ভুলমুক্ত রাখতে পারে না। সমাজে চলতে গিয়ে নানা পরিস্থিতিতে পাপের সম্ভাবনার সামনে পড়ার কথা কবিতায় সরল ভঙ্গিতে বলা হয়েছে।
কবিতার মূল বক্তব্য ধরা পড়ে ‘তাঁর ক্ষমা ছাড়া আমার আর কোনো দ্বিতীয় পথ নেই’ পঙ্ক্তিতে। এখানে ‘তাঁর’ বলতে বোঝানো হয়েছে স্রষ্টাকে। কবির দৃষ্টিতে মানুষের সব প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত আল্লাহর ক্ষমা ও অনুগ্রহের ওপরই নির্ভর করে। এই বোধেই কবিতার আধ্যাত্মিক সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে। তবে পাপকে কবি স্বাভাবিক বা গ্রহণযোগ্য বলে প্রতিষ্ঠা করছেন না। তাঁর আসল অভিপ্রায় পাপ থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা এবং ক্ষমার যোগ্য হওয়ার সাধনা।
ভাষার দিক থেকে কবিতাটি সহজ। সোজাসুজি বাক্যে অনুভূতিকে হাজির করা হয়েছে। ‘ক্ষমা চাই—ক্ষমা’ বাক্যে ‘ক্ষমা’ শব্দটির বারবার ফিরে আসাই কবিতার প্রধান শিল্পকৌশল। একসঙ্গে এটি অনুতাপের প্রকাশ, প্রার্থনার ভাষা এবং কবিতার ভেতরের সুর। পুনরাবৃত্ত এই উচ্চারণ পাঠকের মনে আত্মসমর্পণের এক আবহ গড়ে তোলে।
কবিতার শেষ পঙ্ক্তি ‘ক্ষমা চাই—ক্ষমা, ক্ষমার যোগ্য হতে চাই’ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি বহন করে। শুধু ক্ষমা চাইলেই চলে না, মানুষকে ক্ষমার যোগ্য হওয়ার চেষ্টাও করতে হয়। আর স্রষ্টার অনুগ্রহকেই কবি জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য বলে দেখেছেন। এতে মিশে আছে বদলে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, তওবার আকাঙ্ক্ষা এবং স্রষ্টার রহমতের প্রতি গভীর প্রত্যাশা।