মক্কা-মদিনার জুমার খুতবায় তওবা, আত্মশুদ্ধি ও অল্পেতুষ্টির আহ্বান
মসজিদুল হারামের খতিব ভুল থেকে ফিরে আসার তাগিদ দিয়েছেন, মসজিদে নববীর খতিব আল্লাহর বণ্টনে সন্তুষ্ট থাকার কথা বলেছেন
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ:
গত জুমার খুতবায় মসজিদুল হারাম ও মসজিদে নববীর খতিবরা তওবা, অতীতের ভুল সংশোধন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির ওপর জোর দিয়েছেন। আত্মিক পরিশুদ্ধি ও জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার আহ্বান এসেছে পবিত্র মক্কা ও মদিনার মিম্বর থেকে। যান্ত্রিক ও বস্তুবাদী এই দুনিয়ায় ঈমানদারের অন্তরে প্রশান্তি আনতে এই বাণীগুলো পথ দেখাতে পারে।
বিজ্ঞাপন
মসজিদুল হারামের ইমাম ও খতিব শায়খ ড. ফয়সাল বিন জামিল গাজাভি জুমার খুতবায় বান্দার স্বভাবগত দুর্বলতা এবং তওবার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, মানুষ মূলত মাটি থেকে সৃষ্টি এবং জন্মগতভাবেই সে ভুলপ্রবণ। তাই ভুল বা পদস্খলন হয়ে গেলে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। আসল বিপদ হলো ভুলের ওপর অটল থাকা এবং তওবা থেকে দূরে সরে থাকা। প্রকৃত মুমিন সেই ব্যক্তি, যিনি ভুল করার সঙ্গে সঙ্গে অনুতপ্ত হয়ে দৃঢ় সংকল্প নিয়ে আবার সঠিক পথে ফিরে আসেন।
ইতিহাসের শিক্ষা প্রসঙ্গে খতিব পবিত্র কুরআনে বর্ণিত আসহাবে ফিলের ঐতিহাসিক ঘটনার উল্লেখ করেন। কাবা শরিফ ধ্বংসের উদ্দেশ্যে আসা সেই দলের ষড়যন্ত্র কীভাবে মুহূর্তেই ব্যর্থ হয়েছিল, তা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, অতীতের ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতিগুলোর পরিণতি থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত। না হলে আমাদের নিজেদেরই অন্যদের জন্য একটি শিক্ষার উদাহরণ হয়ে দাঁড়াতে হবে।
খুতবার দ্বিতীয় অংশে নৈতিক পরিশুদ্ধি ও আত্মমূল্যায়নের প্রসঙ্গ আসে। সমাজে ছড়িয়ে পড়া নানা অনৈতিকতা ও আত্মিক ব্যাধির বিরুদ্ধে সেখানে জোরালো সতর্কবার্তা দেওয়া হয়। শিরক, দ্বীনের বিষয়ে বাড়াবাড়ি, বিদআত, নামাজ ত্যাগ করা, মা-বাবার অবাধ্যতা, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা, গুজব রটানো এবং সৎ উপদেশ প্রত্যাখ্যান করার মতো মারাত্মক গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার আহ্বান জানান তিনি।
আত্মশুদ্ধির চাবিকাঠি সম্পর্কে খতিব বলেন, না জানলে অভিজ্ঞদের কাছ থেকে জেনে নিতে হবে, পদস্খলন ঘটলে সঙ্গে সঙ্গে ফিরে আসতে হবে এবং গুনাহ হয়ে গেলে খাঁটি মনে তওবা করে তা থেকে চিরতরে বিরত থাকতে হবে। তওবা ও ক্ষমার আহ্বান জানিয়ে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন-
বিজ্ঞাপন
وَتُوبُوٱ إِلَى ٱللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهٱ ٱلْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
‘হে মুমিনগণ, তোমরা সকলে আল্লাহর দিকে তওবা কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।’ (সুরা আন-নুর: আয়াত ৩১)
অন্যদিকে মসজিদে নববীর ইমাম ও খতিব শায়খ আবদুল্লাহ বিন আবদুর রহমান আল-বুজাইয়ান তাঁর খুতবায় কানাআত বা অল্পেতুষ্টিকে প্রকৃত সম্পদ হিসেবে তুলে ধরেন। মানুষের রিজিক, জীবন ও ভাগ্যের পার্থক্যের নেপথ্যের দর্শন তিনি সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, মহান আল্লাহ বান্দাদের মধ্যে রিজিক বণ্টন করে দিয়েছেন এবং তাদের বয়স ও পরিস্থিতিতে বৈচিত্র্য রেখেছেন। আল্লাহর এই সুষম বণ্টনে সন্তুষ্ট থাকলেই কেবল মানুষের অন্তরে প্রকৃত প্রশান্তি ও আত্মায় স্বস্তি নেমে আসে।
লোভ ও হিংসার কুফল সম্পর্কে সতর্ক করে তিনি বলেন, অন্যের সম্পদের দিকে তাকিয়ে থাকা মানুষ বাহ্যত ধনী মনে হলেও অন্তরের দিক থেকে চরম দরিদ্র হয়ে পড়ে। তবে তিনি স্পষ্ট করে দেন, কানাআত বা অল্পেতুষ্টির অর্থ অলস হয়ে বসে থাকা, রিজিকের সন্ধান ছেড়ে দেওয়া কিংবা জীবনের লক্ষ্য থেকে পিছিয়ে যাওয়া নয়। বরং বৈধ পন্থায় সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে ফলাফলের জন্য একমাত্র আল্লাহর ওপর ভরসা করাই প্রকৃত কানাআত।
বিজ্ঞাপন
খুতবার শেষ পর্যায়ে খতিব জীবনের পরীক্ষা এবং নিয়ামতের সঠিক ব্যবহারের দিকনির্দেশনা দেন। আল্লাহ তাআলা বান্দাকে অভাব ও প্রাচুর্য, উভয় মাধ্যমেই পরীক্ষা করেন, এ কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি অসহায় ও প্রয়োজনগ্রস্ত মানুষের প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে নিজের নিয়ামতের ধুমধাম প্রদর্শন এবং ছবি প্রকাশের ব্যাপারে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করে তিনি বলেন, এর ফলে অন্য কোনো বঞ্চিত মানুষের মনে গভীর কষ্ট বা হাহুতা তৈরি হতে পারে। তাই কিছু নিয়ামত ও নেক আমল গোপন রাখাও শুকরিয়া আদায়ের একটি অংশ।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন-
ٱرْضَ بِمَا قَسَمَ ٱللَّهُ لَكَ تَكُنْ أَغْنَى ٱلنَّاسِ
‘আল্লাহ তোমার জন্য যা ভাগ করে দিয়েছেন, তাতেই সন্তুষ্ট থাকো; তবে তুমি মানুষের মধ্যে সবচেয়ে ধনী হয়ে যাবে।’ (তিরমিজি ২৩০৫)