নামাজের নিয়ম ও দোয়া: নিয়ত থেকে সালাম পর্যন্ত ধাপে ধাপে সঠিক পদ্ধতি
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
নামাজ শুরু হয় তাকবিরে তাহরিমা দিয়ে, শেষ হয় সালাম ফিরিয়ে। এর মাঝখানে দাঁড়ানো, রুকু, সিজদা ও বসা—এই কয়েকটি অবস্থা প্রতি রাকাতে ঘুরেফিরে আসে। কোন অবস্থায় কী পড়তে হয় আর শরীর কীভাবে রাখতে হয়, সেটুকু ঠিকঠাক জানা থাকলে যেকোনো ওয়াক্তের নামাজ নির্ভুলভাবে আদায় করা যায়।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশের অধিকাংশ মুসলমান হানাফি মাজহাব অনুসরণ করেন। এখানে সেই অনুযায়ী দুই রাকাত ও চার রাকাত নামাজের পুরো পদ্ধতি ধাপে ধাপে দেওয়া হলো, সঙ্গে প্রতিটি ধাপের দোয়ার বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ। যিনি সবে নামাজ শিখছেন, কিংবা অনেক দিন পর আবার শুরু করছেন, দুজনের জন্যই এটি কাজে লাগবে।
একটি কথা শুরুতেই মনে রাখা ভালো: আরবি উচ্চারণ বাংলা হরফে পুরোপুরি ধরা যায় না। তাই এখানকার উচ্চারণ দেখে শুরু করুন, কিন্তু সূরা ও দোয়াগুলো কোনো অভিজ্ঞ কারি বা মসজিদের ইমামের কাছে একবার শুনে শুদ্ধ করে নিন।
নামাজে দাঁড়ানোর আগে যা নিশ্চিত করবেন
নামাজ শুরুর আগেই কয়েকটি শর্ত পূরণ হওয়া চাই, যেগুলোকে নামাজের বাইরের ফরজ বলা হয়। শরীর পবিত্র থাকা, অর্থাৎ অজু বা প্রয়োজনে ফরজ গোসল করা; পরনের কাপড় পাক থাকা; নামাজের জায়গা পাক থাকা; সতর ঢাকা; কিবলামুখী হওয়া; ওয়াক্ত হওয়া; এবং নিয়ত করা। পুরুষের সতর নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত, আর নারীর মুখমণ্ডল, দুই হাতের কবজি পর্যন্ত ও পায়ের পাতা ছাড়া পুরো শরীর।
বিজ্ঞাপন
নিয়ত মানে মনে মনে ঠিক করা, আমি কোন ওয়াক্তের কোন নামাজ পড়ছি। যেমন, আমি আল্লাহর জন্য জোহরের চার রাকাত ফরজ নামাজ পড়ছি। এ কথাটি মুখে বলা জরুরি নয়, অন্তরের সংকল্পই আসল। তবে কেউ মনোযোগ ধরে রাখতে বাংলায় বা আরবিতে মুখে বললে আলেমরা তা জায়েজ বলেছেন।
প্রথম রাকাত: তাকবির থেকে সিজদা
১. তাকবিরে তাহরিমা: কিবলামুখী হয়ে সোজা দাঁড়ান। দুই পায়ের মাঝে চার আঙুলের মতো ফাঁক রাখুন, দৃষ্টি থাকবে সিজদার জায়গায়। পুরুষ দুই হাত কান পর্যন্ত তুলবেন, বৃদ্ধাঙ্গুল কানের লতি ছোঁবে; নারী তুলবেন কাঁধ পর্যন্ত। এরপর আল্লাহু আকবার বলে হাত বাঁধুন।
২. হাত বাঁধা: হানাফি মাজহাবে পুরুষ ডান হাত বাঁ হাতের ওপর রেখে নাভির নিচে বাঁধেন, ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুল ও কনিষ্ঠা দিয়ে বাঁ হাতের কবজি ধরে রাখেন। নারী বুকের ওপর হাত রাখেন।
বিজ্ঞাপন
৩. সানা পড়া: নিচু স্বরে পড়ুন, সুবহানাকাল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা ওয়া তাবারাকাসমুকা ওয়া তাআলা জাদ্দুকা ওয়া লা ইলাহা গাইরুক। অর্থ: হে আল্লাহ, আপনি পবিত্র, সব প্রশংসা আপনার, আপনার নাম বরকতময়, আপনার মর্যাদা সুউচ্চ, আপনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই।
৪. আউজুবিল্লাহ ও বিসমিল্লাহ: এরপর চুপিচুপি পড়ুন আউজু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম, তারপর বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
৫. সূরা ফাতিহা ও অন্য সূরা: সূরা ফাতিহা পড়ে শেষে নিচু স্বরে আমিন বলুন। তারপর অন্তত তিনটি ছোট আয়াত বা সমপরিমাণ একটি বড় আয়াত পড়ুন, যেমন সূরা ইখলাস, কাওসার, আসর, ফালাক বা নাস। জামাতে নামাজ পড়লে মুক্তাদি সানার পর আর কিছু পড়বেন না, চুপ করে ইমামের কেরাত শুনবেন; এটিই হানাফি মত।
৬. রুকু: আল্লাহু আকবার বলে সামনে ঝুঁকুন। পিঠ ও মাথা এক সমান্তরালে থাকবে, পুরুষ আঙুল ফাঁক করে দুই হাঁটু শক্ত করে ধরবেন। কমপক্ষে তিনবার পড়ুন সুবহানা রাব্বিয়াল আজিম, অর্থাৎ আমার মহান প্রতিপালক পবিত্র।
বিজ্ঞাপন
৭. কওমা বা রুকু থেকে ওঠা: সামিআল্লাহু লিমান হামিদাহ বলতে বলতে সোজা হয়ে দাঁড়ান, তারপর বলুন রাব্বানা লাকাল হামদ। প্রথমটির অর্থ, যে আল্লাহর প্রশংসা করে আল্লাহ তা শোনেন; দ্বিতীয়টির অর্থ, হে আমাদের রব, সব প্রশংসা আপনার। জামাতে ইমাম প্রথমটি আর মুক্তাদি দ্বিতীয়টি বলেন; একা পড়লে দুটিই বলবেন। এখানে এক মুহূর্ত পুরোপুরি স্থির হয়ে দাঁড়ানো জরুরি।
৮. প্রথম সিজদা: আল্লাহু আকবার বলে প্রথমে হাঁটু, তারপর হাত, এরপর নাক ও কপাল মাটিতে রাখুন। দুই হাতের মাঝখানে মুখ থাকবে, পায়ের আঙুলগুলো যথাসম্ভব কিবলার দিকে ফেরানো থাকবে। কমপক্ষে তিনবার পড়ুন সুবহানা রাব্বিয়াল আলা, অর্থাৎ আমার সর্বোচ্চ প্রতিপালক পবিত্র।
৯. জলসা ও দ্বিতীয় সিজদা: তাকবির বলে সোজা হয়ে বসুন, একটু স্থির থাকুন। চাইলে এ সময় আল্লাহুম্মাগফিরলি পড়তে পারেন, যার অর্থ হে আল্লাহ, আমাকে ক্ষমা করুন। আবার তাকবির বলে আগের মতো দ্বিতীয় সিজদা দিন। এরপর তাকবির বলে সরাসরি দাঁড়িয়ে যান। এখানেই প্রথম রাকাত শেষ।
দ্বিতীয় রাকাত ও প্রথম বৈঠক
বিজ্ঞাপন
দ্বিতীয় রাকাতে সানা পড়তে হয় না। বিসমিল্লাহ বলে সূরা ফাতিহা, তারপর অন্য একটি সূরা পড়ে আগের মতোই রুকু, কওমা ও দুই সিজদা করুন। প্রথম রাকাতে যে সূরা পড়েছেন, দ্বিতীয় রাকাতে কোরআনের ক্রম অনুযায়ী তার পরের কোনো সূরা পড়া উত্তম। যেমন প্রথম রাকাতে সূরা ফালাক পড়লে দ্বিতীয় রাকাতে সূরা নাস।
দ্বিতীয় সিজদার পর বসে পড়ুন। পুরুষ বাঁ পা বিছিয়ে তার ওপর বসবেন, ডান পা খাড়া রাখবেন, আঙুল থাকবে কিবলামুখী। নারী দুই পা ডান দিকে বের করে বাঁ নিতম্বের ওপর বসবেন। দুই হাত থাকবে উরুর ওপর, হাঁটুর কাছাকাছি।
এই বৈঠকে পড়তে হয় তাশাহুদ বা আত্তাহিয়াতু: আত্তাহিয়াতু লিল্লাহি ওয়াস সালাওয়াতু ওয়াত তাইয়িবাতু, আসসালামু আলাইকা আইয়ুহান নাবিয়ু ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু, আসসালামু আলাইনা ওয়া আলা ইবাদিল্লাহিস সালিহিন, আশহাদু আল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুহু।
অর্থ: সব সম্মান, সব ইবাদত ও সব পবিত্র কথা আল্লাহর জন্য। হে নবী, আপনার প্রতি সালাম, আল্লাহর রহমত ও বরকত। আমাদের প্রতি এবং আল্লাহর নেক বান্দাদের প্রতি সালাম। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ (সা.) তাঁর বান্দা ও রাসুল। আশহাদু আল লা ইলাহা বলার সময় ডান হাতের শাহাদাত আঙুল তুলে ইশারা করুন, ইল্লাল্লাহ বলার সময় নামিয়ে ফেলুন।
বিজ্ঞাপন
নামাজ দুই রাকাতের হলে, যেমন ফজরের ফরজ বা সুন্নত, এই বৈঠকই শেষ বৈঠক। তখন তাশাহুদের পর দরুদ ও দোয়া মাসুরা পড়ে সালাম ফেরাবেন। আর তিন বা চার রাকাতের নামাজ হলে তাশাহুদ শেষ করেই আল্লাহু আকবার বলে তৃতীয় রাকাতের জন্য দাঁড়িয়ে যাবেন।
তৃতীয় ও চতুর্থ রাকাত
ফরজ নামাজের তৃতীয় ও চতুর্থ রাকাতে শুধু সূরা ফাতিহা পড়লেই চলে, সঙ্গে অন্য সূরা মেলাতে হয় না। কিন্তু সুন্নত, নফল ও বিতর নামাজের প্রতি রাকাতেই ফাতিহার পর সূরা মেলাতে হয়। বাকি রুকু ও সিজদা আগের নিয়মেই। মাগরিবের তিন রাকাতে তৃতীয় রাকাতের দুই সিজদার পরই শেষ বৈঠকে বসবেন, আর চার রাকাতের নামাজে চতুর্থ রাকাতের পর।
শেষ বৈঠক: দরুদ, দোয়া মাসুরা ও সালাম
বিজ্ঞাপন
শেষ বৈঠকে প্রথমে তাশাহুদ, তারপর দরুদে ইব্রাহিম পড়ুন: আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিও ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদিন, কামা সাল্লাইতা আলা ইব্রাহিমা ওয়া আলা আলি ইব্রাহিমা ইন্নাকা হামিদুম মাজিদ। আল্লাহুম্মা বারিক আলা মুহাম্মাদিও ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদিন, কামা বারাকতা আলা ইব্রাহিমা ওয়া আলা আলি ইব্রাহিমা ইন্নাকা হামিদুম মাজিদ।
অর্থ: হে আল্লাহ, মুহাম্মদ (সা.) ও তাঁর পরিবারবর্গের ওপর রহমত বর্ষণ করুন, যেমন রহমত বর্ষণ করেছেন ইব্রাহিম (আ.) ও তাঁর পরিবারবর্গের ওপর; নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত ও মহিমান্বিত। হে আল্লাহ, মুহাম্মদ (সা.) ও তাঁর পরিবারবর্গের ওপর বরকত দিন, যেমন বরকত দিয়েছেন ইব্রাহিম (আ.) ও তাঁর পরিবারবর্গের ওপর।
এরপর দোয়া মাসুরা: আল্লাহুম্মা ইন্নি জালামতু নাফসি জুলমান কাসিরাও ওয়ালা ইয়াগফিরুজ জুনুবা ইল্লা আনতা, ফাগফিরলি মাগফিরাতাম মিন ইনদিকা ওয়ারহামনি, ইন্নাকা আনতাল গাফুরুর রাহিম। অর্থ: হে আল্লাহ, আমি নিজের ওপর অনেক জুলুম করেছি, আর আপনি ছাড়া কেউ গুনাহ মাফ করতে পারে না। তাই আপনার পক্ষ থেকে আমাকে ক্ষমা করুন, আমার প্রতি দয়া করুন; নিশ্চয়ই আপনি ক্ষমাশীল, দয়ালু। আবু বকর (রা.) নামাজে পড়ার জন্য একটি দোয়া শিখতে চাইলে নবী (সা.) তাঁকে এটি শিখিয়েছিলেন বলে বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত আছে।
সবশেষে মুখ ডান দিকে ফিরিয়ে বলুন আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, তারপর বাঁ দিকে ফিরিয়ে একই কথা বলুন। এর মাধ্যমে নামাজ শেষ হলো। সালামের পর আস্তাগফিরুল্লাহ তিনবার এবং অন্যান্য মাসনুন জিকির পড়া সুন্নত।
বিজ্ঞাপন
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
১. তাড়াহুড়া: রুকু থেকে উঠে পুরোপুরি সোজা না হয়েই সিজদায় চলে যাওয়া, কিংবা দুই সিজদার মাঝে ঠিকমতো না বসা খুব সাধারণ ভুল। প্রতিটি অবস্থায় অন্তত একবার সুবহানাল্লাহ বলার সময় পরিমাণ স্থির থাকা হানাফি মাজহাবে ওয়াজিব।
২. সিজদায় নাক না লাগানো: শুধু কপাল ঠেকিয়ে নাক উঁচু রাখা ঠিক নয়। কপাল ও নাক দুটিই মাটিতে লাগাতে হবে, সঙ্গে দুই হাত, দুই হাঁটু ও দুই পায়ের আঙুল।
৩. অস্পষ্ট উচ্চারণ: সূরা ফাতিহার অক্ষর বিকৃত হলে অনেক সময় অর্থ বদলে যায়। শুদ্ধ উচ্চারণ শেখা তাই নামাজেরই অংশ।
বিজ্ঞাপন
৪. প্রথম বৈঠক ভুলে যাওয়া: চার রাকাতের নামাজে দ্বিতীয় রাকাতের পর না বসে পুরো দাঁড়িয়ে গেলে আর ফিরে বসবেন না; নামাজ চালিয়ে যাবেন এবং শেষে সাহু সিজদা দেবেন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
নামাজের নিয়ত কি আরবিতে মুখে বলতে হয়?
না। নিয়ত মূলত অন্তরের সংকল্প। কোন ওয়াক্তের কোন নামাজ পড়ছেন, তা মনে স্থির থাকলেই নিয়ত হয়ে যায়। মুখে বলা বাধ্যতামূলক নয়, আর বললে যেকোনো ভাষায় বলা যায়।
বিজ্ঞাপন
ফাতিহার পর কোন সূরা পড়তে হবে, তা কি নির্দিষ্ট?
নির্দিষ্ট নয়। কোরআনের যেকোনো জায়গা থেকে অন্তত তিনটি ছোট আয়াত বা সমপরিমাণ একটি বড় আয়াত পড়লেই চলে। নতুনরা সাধারণত কোরআনের শেষ দিকের ছোট সূরাগুলো দিয়ে শুরু করেন।
নামাজে ভুল হয়ে গেলে কী করব?
কোনো ওয়াজিব ভুলে ছুটে গেলে শেষ বৈঠকে তাশাহুদের পর ডান দিকে এক সালাম ফিরিয়ে দুটি সিজদা দিতে হয়, যাকে সাহু সিজদা বলে। কিন্তু রুকু বা সিজদার মতো কোনো ফরজ একেবারে ছুটে গেলে নামাজ আবার পড়তে হয়।
বিজ্ঞাপন
মহিলাদের নামাজ কি পুরুষের মতোই?
মূল কাঠামো একই। হানাফি মাজহাবে কিছু পার্থক্য আছে: নারীরা কাঁধ পর্যন্ত হাত তোলেন, বুকে হাত বাঁধেন, রুকুতে তুলনামূলক কম ঝোঁকেন, সিজদায় শরীর গুটিয়ে রাখেন এবং বৈঠকে দুই পা ডান দিকে বের করে বসেন।