অজুর নিয়ম: অজুর ফরজ, সুন্নত ও অজু করার সঠিক পদ্ধতি
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
হানাফি মাজহাব অনুযায়ী অজুর ফরজ চারটি: পুরো মুখমণ্ডল একবার ধোয়া, দুই হাত কনুইসহ ধোয়া, মাথার অন্তত এক-চতুর্থাংশ মাসেহ করা এবং দুই পা টাখনুসহ ধোয়া। এর কোনো একটি বাদ পড়লে অজু হয় না, আর অজু না হলে নামাজও হয় না।
বিজ্ঞাপন
এই চারটি ফরজ সরাসরি কোরআন থেকে এসেছে। সূরা মায়িদার ৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন:
হে মুমিনগণ, যখন তোমরা নামাজের জন্য প্রস্তুত হও, তখন তোমাদের মুখমণ্ডল ও কনুই পর্যন্ত হাত ধৌত করো, মাথা মাসেহ করো এবং টাখনু পর্যন্ত পা ধৌত করো। (সূরা মায়িদা, আয়াত ৬)
ফরজের বাইরে কুলি করা, নাকে পানি দেওয়া, কান মাসেহ করা, প্রতিটি অঙ্গ তিনবার ধোয়া—এসব সুন্নত। নবী (সা.) এভাবেই অজু করতেন। সুন্নত বাদ পড়লে অজু হয়ে যায় ঠিকই, কিন্তু অভ্যাস করে বাদ দেওয়া উচিত নয়।
অজুর চার ফরজ ভালো করে বুঝে নিন
বিজ্ঞাপন
১. মুখমণ্ডল ধোয়া: কপালের যেখান থেকে চুল গজায় সেখান থেকে থুতনির নিচ পর্যন্ত লম্বায়, আর এক কানের লতি থেকে অন্য কানের লতি পর্যন্ত চওড়ায় পুরো অংশে পানি পৌঁছাতে হবে। ভ্রু, চোখের কোণ ও ঠোঁটের কিনারা যেন শুকনো না থাকে।
২. দুই হাত কনুইসহ ধোয়া: আঙুলের মাথা থেকে কনুই পর্যন্ত, কনুইসহ। আংটি বা চুড়ি টাইট হলে নাড়িয়ে নিচে পানি পৌঁছান। নখে নেইলপলিশ থাকলে তা পানি আটকে দেয়, তাই অজুর আগে তুলে ফেলতে হবে। মেহেদির রং অবশ্য পানি আটকায় না।
৩. মাথার এক-চতুর্থাংশ মাসেহ: ভেজা হাতে মাথার অন্তত চার ভাগের এক ভাগ মুছে নেওয়া ফরজ। পুরো মাথা মাসেহ করা সুন্নত।
৪. দুই পা টাখনুসহ ধোয়া: পায়ের গোড়ালির দুই পাশের উঁচু হাড় টাখনু। এটিসহ পুরো পা ধুতে হবে। গোড়ালির পেছন ও আঙুলের ফাঁক প্রায়ই শুকনো থেকে যায়; নবী (সা.) শুকনো গোড়ালির ব্যাপারে সতর্ক করেছেন বলে বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত হাদিস আছে।
বিজ্ঞাপন
ধাপে ধাপে অজু করার পদ্ধতি
পবিত্র পানি নিয়ে, সম্ভব হলে উঁচু জায়গায় কিবলামুখী হয়ে বসুন। মনে মনে নিয়ত করুন যে নামাজের জন্য পবিত্রতা অর্জন করছেন। এরপর:
১. বিসমিল্লাহ বলুন: বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম বলে শুরু করুন।
২. কবজি পর্যন্ত হাত ধোয়া: দুই হাত কবজি পর্যন্ত তিনবার ধুয়ে নিন, আঙুলের ফাঁকেও পানি দিন।
বিজ্ঞাপন
৩. মিসওয়াক ও কুলি: মিসওয়াক বা ব্রাশ থাকলে দাঁত পরিষ্কার করুন, না থাকলে আঙুল দিয়ে ঘষে নিন। এরপর তিনবার কুলি করুন। রোজা না থাকলে গড়গড়া করা উত্তম।
৪. নাকে পানি দেওয়া: ডান হাতে পানি নিয়ে নাকের নরম অংশ পর্যন্ত তিনবার পানি দিন, বাঁ হাতের কনিষ্ঠা আঙুল দিয়ে পরিষ্কার করুন। রোজা অবস্থায় বেশি ভেতরে টানবেন না।
৫. মুখ ধোয়া: পুরো মুখমণ্ডল তিনবার ধুয়ে নিন। দাড়ি ঘন হলে ভেজা আঙুল দিয়ে নিচ থেকে খিলাল করুন।
৬. হাত ধোয়া: প্রথমে ডান হাত, তারপর বাঁ হাত কনুইসহ তিনবার করে ধুয়ে নিন। এক হাতের আঙুল অন্য হাতের আঙুলের ফাঁকে ঢুকিয়ে খিলাল করুন।
বিজ্ঞাপন
৭. মাথা ও কান মাসেহ: দুই হাত নতুন পানিতে ভিজিয়ে কপালের দিক থেকে পেছনে, আবার পেছন থেকে সামনে টেনে পুরো মাথা একবার মাসেহ করুন। এরপর শাহাদাত আঙুল দিয়ে কানের ভেতর আর বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে কানের পেছন মুছে নিন।
৮. পা ধোয়া: প্রথমে ডান পা, তারপর বাঁ পা টাখনুসহ তিনবার করে ধুয়ে নিন। বাঁ হাতের কনিষ্ঠা আঙুল দিয়ে পায়ের আঙুলের ফাঁক খিলাল করুন, ডান পায়ের কনিষ্ঠা আঙুল থেকে শুরু করে।
ঘাড় মাসেহ নিয়ে একটু বলা দরকার। হানাফি অনেক ফকিহ মাথা মাসেহের পর হাতের পিঠ দিয়ে ঘাড় মাসেহ করাকে মুস্তাহাব বলেছেন, আবার অনেক আলেমের মতে এর পক্ষে শক্ত দলিল নেই। দুই মতই আছে; যিনি যে আলেমের অনুসরণ করেন, সেভাবে আমল করতে পারেন।
অজুর সুন্নত ও আদব একনজরে
বিজ্ঞাপন
সুন্নতগুলো আলাদা করে মনে রাখতে চাইলে: নিয়ত করা, বিসমিল্লাহ বলা, শুরুতে কবজি পর্যন্ত হাত ধোয়া, মিসওয়াক করা, কুলি করা, নাকে পানি দেওয়া, দাড়ি ও আঙুল খিলাল করা, প্রতিটি অঙ্গ তিনবার ধোয়া, পুরো মাথা মাসেহ করা, কান মাসেহ করা, ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং এক অঙ্গ শুকানোর আগেই পরের অঙ্গ ধোয়া।
আদবের মধ্যে আছে ডান দিক থেকে শুরু করা, অজুর সময় দুনিয়াবি কথা না বলা, পানি অপচয় না করা এবং মুখে জোরে পানির ঝাপটা না মারা। কলের পানিতে অজু করলে ট্যাপ পুরো খুলে রাখার অভ্যাসটি বদলানো দরকার। তিনবারের বেশি ধোয়া প্রয়োজন ছাড়া মাকরুহ।
অজুর ফজিলত ও শেষের দোয়া
অজু শুধু শরীর ধোয়ার কাজ নয়। মুসলিম শরিফে উসমান (রা.) থেকে বর্ণিত, যে ব্যক্তি সুন্দরভাবে অজু করে, তার শরীর থেকে গুনাহ বের হয়ে যায়, এমনকি নখের নিচ থেকেও। আরেক হাদিসে এসেছে, পবিত্রতা ছাড়া নামাজ কবুল হয় না (মুসলিম)।
বিজ্ঞাপন
অজু শেষে আকাশের দিকে তাকিয়ে এই সাক্ষ্য পড়া সুন্নত:
أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَٰهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ
উচ্চারণ: আশহাদু আল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুহু। অর্থ: আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তিনি এক, তাঁর কোনো শরিক নেই; আর আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, মুহাম্মদ (সা.) তাঁর বান্দা ও রাসুল। মুসলিমের বর্ণনায় আছে, এভাবে পূর্ণাঙ্গ অজু করে এ সাক্ষ্য দিলে তার জন্য জান্নাতের আটটি দরজা খুলে দেওয়া হয়।
তিরমিজির বর্ণনায় এর সঙ্গে আছে: আল্লাহুম্মাজআলনি মিনাত তাওয়াবিনা ওয়াজআলনি মিনাল মুতাতাহহিরিন। অর্থ: হে আল্লাহ, আমাকে তওবাকারী ও পবিত্রতা অর্জনকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন।
বিজ্ঞাপন
কখন অজু জরুরি, কখন উত্তম
নামাজ, জানাজা, তেলাওয়াতের সিজদা এবং কাবাঘরের তাওয়াফের জন্য অজু থাকা জরুরি। কোরআন শরিফ হাতে স্পর্শ করার জন্যও অজু লাগে। মুখস্থ তেলাওয়াত, জিকির, দরুদ বা দোয়ার জন্য অজু শর্ত নয়, তবে অজু অবস্থায় করা উত্তম। ঘুমানোর আগে অজু করা সুন্নত, আর রাগ উঠলে অজু করার পরামর্শও আলেমরা দিয়ে থাকেন। যিনি সব সময় অজু অবস্থায় থাকার চেষ্টা করেন, তাঁর দিন এমনিতেই নামাজমুখী হয়ে ওঠে।
যেসব ভুলে অজু অসম্পূর্ণ থাকে
সবচেয়ে বেশি যা ঘটে তা হলো তাড়াহুড়া। কনুইয়ের ওপরের অংশে পানি না পৌঁছানো, গোড়ালির পেছন শুকনো থাকা, কানের পাশে মুখের অংশ বাদ পড়া—এগুলো অজু অসম্পূর্ণ রেখে দেয়। শীতকালে হাত-পায়ে লোশন বা তেল জমে থাকলে পানি গড়িয়ে যায়; তখন একটু ঘষে ধুলে ভালো। প্লাস্টার বা ব্যান্ডেজ থাকলে ক্ষতস্থানের ওপর দিয়ে ভেজা হাত বুলিয়ে নেওয়া যায়, বাকি অংশ ধুতে হবে।
বিজ্ঞাপন
সাধারণ জিজ্ঞাসা
মোজার ওপর মাসেহ করা যায় কি?
চামড়ার মোজা বা তার মতো মোটা ও মজবুত মোজা টাখনুসহ ঢেকে রাখলে এবং অজু অবস্থায় পরলে মাসেহ করা যায়। সাধারণ সুতি বা নাইলনের পাতলা মোজার ওপর হানাফি মাজহাবে মাসেহ জায়েজ নয়।
অজুর সময় কথা বললে কি অজু ভেঙে যায়?
বিজ্ঞাপন
না, অজু ভাঙে না। তবে প্রয়োজন ছাড়া দুনিয়াবি কথা না বলাই আদব।
নেইলপলিশ লাগানো অবস্থায় অজু হবে কি?
না। নেইলপলিশ নখে পানি পৌঁছাতে দেয় না, তাই অজু ও ফরজ গোসল কোনোটিই শুদ্ধ হয় না। আগে তুলে ফেলতে হবে।
এক অজু দিয়ে কয় ওয়াক্ত নামাজ পড়া যায়?
বিজ্ঞাপন
অজু না ভাঙা পর্যন্ত যত ওয়াক্ত ইচ্ছা পড়া যায়। তবে প্রতি ওয়াক্তে নতুন অজু করা উত্তম ও সওয়াবের কাজ।