ফরজ গোসলের নিয়ম: গোসলের তিন ফরজ ও ধাপে ধাপে সঠিক পদ্ধতি
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
স্বামী-স্ত্রীর মিলন, স্বপ্নদোষ, কিংবা ঋতুস্রাব বা প্রসব-পরবর্তী রক্তস্রাব শেষ হওয়া—এমন অবস্থায় শুধু অজুতে পবিত্রতা আসে না। তখন পুরো শরীর ধুয়ে গোসল করতে হয়, যাকে ফরজ গোসল বলা হয়। এই গোসল ছাড়া নামাজ, কোরআন স্পর্শ বা মসজিদে অবস্থান করা যায় না।
বিজ্ঞাপন
হানাফি মাজহাবে ফরজ গোসলের ফরজ মাত্র তিনটি। এক, ভালো করে কুলি করা, যাতে মুখের ভেতরের সব জায়গায় পানি পৌঁছায়। দুই, নাকের নরম হাড় পর্যন্ত পানি দেওয়া। তিন, পুরো শরীর এমনভাবে ধোয়া যাতে চুলের গোড়া থেকে পায়ের তলা পর্যন্ত কোথাও এক চুল পরিমাণ জায়গাও শুকনো না থাকে।
এই তিনটি ঠিকমতো হলে গোসল শুদ্ধ হয়ে যায়, সাবান-শ্যাম্পু লাগুক বা না লাগুক। তবে নবী (সা.) যে ধারাবাহিক পদ্ধতিতে গোসল করতেন, সেটি অনুসরণ করাই সুন্নত ও উত্তম।
কখন গোসল ফরজ হয়
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী পাঁচটি অবস্থায় গোসল ফরজ হয়। এক, উত্তেজনার সঙ্গে বীর্য বের হওয়া, জাগ্রত অবস্থায় হোক বা ঘুমের মধ্যে। দুই, স্বামী-স্ত্রীর মিলন, বীর্যপাত হোক বা না হোক। তিন, স্বপ্নদোষের পর কাপড়ে বা শরীরে ভেজা চিহ্ন পাওয়া। চার, নারীর হায়েজ বা ঋতুস্রাব শেষ হওয়া। পাঁচ, নিফাস বা প্রসব-পরবর্তী রক্তস্রাব শেষ হওয়া।
বিজ্ঞাপন
স্বপ্ন মনে আছে কিন্তু কোনো ভেজা চিহ্ন নেই, এমন হলে গোসল ফরজ হয় না। আবার স্বপ্ন মনে নেই কিন্তু ঘুম থেকে উঠে ভেজা চিহ্ন দেখা গেলে গোসল করতে হবে। ভারী কিছু তোলার সময় বা অসুস্থতার কারণে উত্তেজনা ছাড়া যে তরল বের হয়, তাতে গোসল ফরজ হয় না, শুধু অজু ভাঙে।
জুমার দিন, দুই ঈদের দিন, ইহরাম বাঁধার আগে গোসল করা সুন্নত। এগুলো ফরজ গোসল নয়, তবে পদ্ধতি একই।
কোরআন ও হাদিসে গোসলের নির্দেশ
সূরা মায়িদার ৬ নম্বর আয়াতে অজুর বিবরণের পর আল্লাহ বলেছেন:
বিজ্ঞাপন
আর যদি তোমরা অপবিত্র অবস্থায় থাকো, তবে বিশেষভাবে পবিত্র হও। (সূরা মায়িদা, আয়াত ৬)
নবী (সা.)-এর গোসলের বিবরণ দিয়েছেন তাঁর স্ত্রী আয়েশা (রা.) ও মায়মুনা (রা.)। বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত সেই হাদিসগুলোতে দেখা যায়, তিনি প্রথমে হাত ধুতেন, তারপর লজ্জাস্থান ধুতেন, এরপর নামাজের অজুর মতো অজু করতেন, চুলের গোড়ায় আঙুল দিয়ে পানি পৌঁছাতেন, মাথায় তিন আঁজলা পানি ঢালতেন এবং শেষে পুরো শরীরে পানি ঢালতেন। মায়মুনা (রা.)-এর বর্ণনায় আছে, তিনি গোসলের জায়গা থেকে সরে গিয়ে শেষে পা ধুয়েছেন।
ধাপে ধাপে ফরজ গোসলের সুন্নত পদ্ধতি
১. নিয়ত করুন: মনে মনে ঠিক করুন যে পবিত্রতা অর্জনের জন্য গোসল করছেন। মুখে বলা জরুরি নয়।
বিজ্ঞাপন
২. বিসমিল্লাহ ও হাত ধোয়া: গোসলখানায় ঢোকার আগে বা কাপড় খোলার আগে বিসমিল্লাহ বলে নিন। তারপর দুই হাত কবজি পর্যন্ত তিনবার ধুয়ে নিন।
৩. লজ্জাস্থান ও নাপাকি ধোয়া: বাঁ হাত দিয়ে লজ্জাস্থান ধুয়ে নিন। শরীরের অন্য কোথাও বীর্য বা রক্তের মতো নাপাকি লেগে থাকলে সেটিও ধুয়ে পরিষ্কার করুন। তারপর হাত ভালো করে ধুয়ে নিন।
৪. অজু করা: নামাজের অজুর মতো পুরো অজু করুন। যদি এমন জায়গায় দাঁড়িয়ে গোসল করেন যেখানে পায়ের নিচে পানি জমে, তবে পা ধোয়াটা শেষে করবেন।
৫. কুলি ও নাকে পানি: অজুর মধ্যেই এ দুটি হয়ে যায়, তবে খেয়াল রাখুন এগুলো এখানে ফরজ। রোজা না থাকলে গড়গড়া করে কুলি করুন, আর নাকের নরম অংশ পর্যন্ত পানি টেনে নিন।
বিজ্ঞাপন
৬. মাথায় পানি ঢালা: মাথায় তিনবার পানি ঢালুন, আঙুল দিয়ে চুলের গোড়া পর্যন্ত পানি পৌঁছে দিন।
৭. পুরো শরীর ধোয়া: প্রথমে ডান কাঁধে তিনবার, তারপর বাঁ কাঁধে তিনবার পানি ঢালুন। এরপর পুরো শরীরে পানি ঢেলে হাত দিয়ে ঘষে নিন।
৮. শেষে পা ধোয়া: পানি জমে এমন জায়গা থেকে একটু সরে দাঁড়িয়ে দুই পা ধুয়ে নিন।
যে জায়গাগুলো প্রায়ই শুকনো থেকে যায়
বিজ্ঞাপন
তিন ফরজের তৃতীয়টিতেই বেশির ভাগ ভুল হয়। ঝরনার নিচে দাঁড়ালেই পুরো শরীর ভিজে যায় বলে আমরা ধরে নিই, কিন্তু কয়েকটি জায়গায় আলাদা খেয়াল দরকার। নাভির ভেতর, কানের ছিদ্রের বাইরের অংশ ও কানের পেছন, বগল, হাঁটুর পেছনের ভাঁজ, পায়ের আঙুলের ফাঁক, শরীরের ভাঁজ পড়া অংশ এবং ঘন দাড়ির গোড়া।
আংটি, চুড়ি, নাকফুল বা কানের দুল টাইট থাকলে নাড়িয়ে ভেতরে পানি পৌঁছাতে হবে। নখে নেইলপলিশ বা শরীরে আঠালো কোনো প্রলেপ থাকলে তা পানি আটকে দেয়; গোসলের আগে তুলে ফেলতে হবে। দাঁতে খাবার আটকে থাকলে বের করে নেওয়া ভালো। দাঁতে বাঁধানো ক্যাপ বা স্থায়ী ফিলিং থাকলে তার নিচে পানি পৌঁছানোর দরকার নেই।
মেয়েদের ফরজ গোসলের নিয়ম
নারীদের গোসলের পদ্ধতি পুরুষের মতোই, তবে চুল নিয়ে একটি বিশেষ সুবিধা আছে। মুসলিম শরিফে উম্মে সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, আমি মাথার চুল শক্ত করে বেণি করি, ফরজ গোসলের জন্য কি তা খুলতে হবে? নবী (সা.) বললেন, না, মাথায় তিন আঁজলা পানি ঢেলে দেওয়াই যথেষ্ট।
বিজ্ঞাপন
হানাফি ফকিহরা এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, চুল বেণি করা থাকলে খোলার দরকার নেই, তবে চুলের গোড়ায় অবশ্যই পানি পৌঁছাতে হবে। আর চুল খোলা থাকলে পুরো চুল ভেজাতে হবে।
ঋতুস্রাব বা নিফাস শেষে গোসলের পদ্ধতিও একই। আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনায় আছে, এ ধরনের গোসলের পর রক্তের চিহ্ন দূর করতে সুগন্ধিযুক্ত কাপড় ব্যবহারের কথা নবী (সা.) বলেছিলেন (বুখারি, মুসলিম)। এখন সাবান বা সুগন্ধি ব্যবহার করলেই সে উদ্দেশ্য পূরণ হয়।
গোসল ফরজ অবস্থায় কী করা যায়, কী যায় না
গোসল ফরজ থাকা অবস্থায় নামাজ পড়া, কোরআন শরিফ স্পর্শ করা, তেলাওয়াতের উদ্দেশ্যে কোরআন পড়া, মসজিদে প্রবেশ ও অবস্থান এবং কাবাঘরের তাওয়াফ নিষেধ। তবে জিকির, দরুদ, দোয়া, খাওয়া-দাওয়া, ঘরের কাজ সবই করা যায়।
বিজ্ঞাপন
গোসল কিছুক্ষণ দেরিতে করা গুনাহ নয়। কিন্তু দেরির কারণে কোনো নামাজের ওয়াক্ত চলে গেলে গুনাহ হবে। রাতে মিলনের পর গোসল না করে ঘুমাতে চাইলে অজু করে নেওয়া সুন্নত। উমর (রা.) এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে নবী (সা.) অজু করে ঘুমানোর অনুমতি দেন (বুখারি, মুসলিম)।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
গোসলের পর নামাজের জন্য আলাদা অজু লাগবে কি?
না। ফরজ গোসলের মধ্যেই অজুর সব অঙ্গ ধোয়া হয়ে যায়। গোসলের পর অজু ভাঙার মতো কিছু না ঘটলে সেই অবস্থায় নামাজ পড়া যায়।
বিজ্ঞাপন
শুধু ঝরনার নিচে দাঁড়ালে কি ফরজ গোসল হবে?
যদি ভালো করে কুলি করা হয়, নাকে পানি দেওয়া হয় এবং শরীরের প্রতিটি অংশে পানি পৌঁছায়, তবে গোসল হয়ে যাবে। তবে সুন্নত পদ্ধতিতে করাই উত্তম।
ফরজ গোসল না করে কি খাওয়া যায়?
যায়। খাওয়ার আগে হাত ধুয়ে কুলি করে নেওয়া ভালো, কিন্তু খাওয়া নিষেধ নয়।
বিজ্ঞাপন
রোজা অবস্থায় ফরজ গোসল করলে কুলি কীভাবে করব?
রোজা অবস্থায় গড়গড়া করবেন না এবং নাকে পানি বেশি ভেতরে টানবেন না। মুখ ও নাকের সামনের অংশে পানি পৌঁছালেই ফরজ আদায় হয়ে যায়।