রোজা ভঙ্গের কারণ: কোন কাজে রোজা ভাঙে আর কোন কাজে ভাঙে না
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
ভুল করে পেট ভরে খেয়ে ফেললেও রোজা ভাঙে না, অথচ রোজার কথা মনে থাকা অবস্থায় ইচ্ছা করে এক ঢোক পানি গিলে ফেললে ভেঙে যায়। রোজা ভাঙা বা না ভাঙার মূল সূত্র এখানেই: রোজার কথা মনে আছে কি না, কাজটি ইচ্ছাকৃত কি না, আর কোনো কিছু পেট বা মস্তিষ্ক পর্যন্ত পৌঁছেছে কি না।
বিজ্ঞাপন
হানাফি ফিকহে রোজা ভাঙার কারণগুলো দুই ভাগে পড়ে। কিছু কারণে শুধু কাজা করতে হয়, অর্থাৎ পরে একটি রোজা রেখে দিতে হয়। আর কিছু কারণে কাজার সঙ্গে কাফফারাও দিতে হয়, যা অনেক ভারী শাস্তি। এর বাইরে এমন অনেক কাজ আছে, যেগুলো নিয়ে মানুষ দুশ্চিন্তায় থাকে, অথচ সেগুলোতে রোজা ভাঙে না।
ফিকহের বইয়ে এসব কারণ নানা ভাবে গোনা হয়েছে, তাই রোজা ভঙ্গের কারণ কয়টি, এই সংখ্যার চেয়ে কারণগুলোর ধরন বোঝা বেশি কাজের। নিচে সেভাবেই সাজানো হলো।
রোজার সময়সীমা কোরআনেই বেঁধে দেওয়া হয়েছে, সূরা বাকারার ১৮৭ নম্বর আয়াতে:
আর তোমরা পানাহার করো যতক্ষণ না রাতের কালো রেখা থেকে ভোরের সাদা রেখা তোমাদের কাছে স্পষ্ট হয়। এরপর রাত পর্যন্ত রোজা পূর্ণ করো। (সূরা বাকারা, আয়াত ১৮৭)
বিজ্ঞাপন
অর্থাৎ সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও স্ত্রী সহবাস থেকে বিরত থাকাই রোজা। এই সময়ের মধ্যে এগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে করলে রোজা ভেঙে যায়।
যে কারণে কাজা ও কাফফারা দুটিই লাগে
রমজানের রোজা রেখে কোনো শরিয়তসম্মত কারণ ছাড়া ইচ্ছাকৃতভাবে নিচের কাজগুলো করলে কাজা ও কাফফারা দুটিই ওয়াজিব হয়:
১. ইচ্ছাকৃত খাওয়া বা পান করা: রোজার কথা মনে থাকা অবস্থায় খাবার, পানি বা ওষুধ খাওয়া।
বিজ্ঞাপন
২. স্ত্রী সহবাস: রোজা অবস্থায় দিনের বেলা সহবাস করলে স্বামী-স্ত্রী দুজনেরই কাজা ও কাফফারা লাগবে, যদি দুজনেই স্বেচ্ছায় করে থাকেন।
৩. ধূমপান: ইচ্ছাকৃত ধূমপানে রোজা ভেঙে যায়। অনেক হানাফি ফকিহ একে ইচ্ছাকৃত পানাহারের মতো গণ্য করে কাফফারাও আবশ্যক বলেছেন।
কাফফারা হলো একটানা ষাটটি রোজা রাখা। মাঝে একটি ভাঙলে আবার শুরু থেকে গুনতে হয়। অসুস্থতা বা বার্ধক্যের কারণে তা সম্ভব না হলে ষাটজন দরিদ্রকে দুই বেলা পেট ভরে খাওয়াতে হয়। এই বিধান এসেছে এক সাহাবির ঘটনা থেকে, যিনি রমজানের দিনে স্ত্রীর সঙ্গে মিলিত হয়ে নবী (সা.)-এর কাছে এসেছিলেন (বুখারি, মুসলিম)।
যে কারণে শুধু কাজা লাগে
বিজ্ঞাপন
এসব ক্ষেত্রে রোজা ভেঙে যায়, তবে কাফফারা লাগে না; পরে শুধু একটি রোজা কাজা করতে হয়:
১. ইচ্ছা করে মুখভরে বমি করা: আবু দাউদ ও তিরমিজির হাদিসে আছে, যার অনিচ্ছায় বমি হয় তার কাজা নেই, আর যে ইচ্ছা করে বমি করে সে কাজা করবে।
২. কুলি করার সময় গলায় পানি চলে যাওয়া: রোজার কথা মনে থাকা অবস্থায় অসাবধানে পানি গলায় চলে গেলে রোজা ভেঙে যায়।
৩. সময়ের ভুল ধারণা: সুবহে সাদিক হয়নি ভেবে সেহরি খাওয়া অথচ তখন সময় পেরিয়ে গিয়েছিল, কিংবা সূর্য ডুবে গেছে ভেবে ইফতার করা অথচ তখনো ডোবেনি।
বিজ্ঞাপন
৪. খাদ্য নয় এমন কিছু গিলে ফেলা: পাথর, কাগজ, কয়েন বা এ জাতীয় কিছু ইচ্ছা করে গিলে ফেলা।
৫. নাকে ওষুধ বা পায়ুপথে ওষুধ: নাকে ড্রপ বা স্প্রে দিলে তা গলায় পৌঁছায়, তাই রোজা ভাঙে। পায়ুপথে সাপোজিটরি বা এনিমা নিলেও হানাফি মতে রোজা ভেঙে যায়।
৬. দাঁতের ফাঁক থেকে বড় খাদ্যকণা গিলে ফেলা: ছোলা পরিমাণ বা তার চেয়ে বড় কিছু হলে রোজা ভাঙে। এর চেয়ে ছোট হলে ভাঙে না।
৭. জোর করে খাওয়ানো বা ঘুমের মধ্যে মুখে পানি দেওয়া: নিজে ইচ্ছা না করলেও পেটে কিছু গেলে রোজা ভেঙে যায়, তবে কাফফারা লাগে না।
বিজ্ঞাপন
এ ছাড়া ঋতুস্রাব বা প্রসব-পরবর্তী রক্তস্রাব শুরু হলে সেদিনের রোজা আর থাকে না, পরে কাজা করতে হয়। এটি কোনো গুনাহ নয়।
যেসব কাজে রোজা ভাঙে না
ভুলে খাওয়া বা পান করা সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ। বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত হাদিসে নবী (সা.) বলেছেন:
যে রোজাদার ভুলে খেয়ে ফেলল বা পান করল, সে যেন তার রোজা পূর্ণ করে। কেননা আল্লাহই তাকে খাইয়েছেন ও পান করিয়েছেন। (বুখারি, মুসলিম)
বিজ্ঞাপন
এ ছাড়া অনিচ্ছায় বমি হওয়া, স্বপ্নদোষ হওয়া, নিজের মুখের থুতু গিলে ফেলা, মিসওয়াক করা, গোসল করা, মাথায় তেল দেওয়া, চোখে সুরমা বা চোখের ড্রপ দেওয়া, অনিচ্ছায় ধুলাবালি বা ধোঁয়া গলায় যাওয়া, শরীর থেকে রক্ত বের হওয়া বা রক্ত পরীক্ষার জন্য রক্ত দেওয়া, এবং ফরজ গোসল না করে সকাল পর্যন্ত থাকা—এসবের কোনোটিতে রোজা ভাঙে না।
ওষুধ, ইনজেকশন ও ইনহেলার: আলেমরা যা বলেন
আধুনিক চিকিৎসা নিয়ে প্রশ্ন সবচেয়ে বেশি। মাংসপেশি বা শিরায় দেওয়া সাধারণ ইনজেকশনে রোজা ভাঙে না বলে অধিকাংশ সমকালীন আলেমের মত। তবে শুধু পুষ্টি জোগানোর জন্য দেওয়া স্যালাইন নিয়ে মতভেদ আছে।
হাঁপানির ইনহেলারের ব্যাপারে বাংলাদেশের অনেক মুফতির মত হলো, এতে ওষুধের কণা গলা দিয়ে ভেতরে যায় বলে রোজা ভেঙে যায়। কিছু সমকালীন আলেম ভিন্নমত দিয়েছেন। কানের ড্রপ নিয়েও মতভেদ আছে। যাঁদের নিয়মিত এসব নিতে হয়, তাঁরা চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে একজন নির্ভরযোগ্য আলেমের কাছে নিজের অবস্থা জানিয়ে সিদ্ধান্ত নিন। গুরুতর অসুস্থ ব্যক্তির জন্য রোজা না রেখে পরে কাজা করার সুযোগ কোরআনেই দেওয়া আছে।
বিজ্ঞাপন
যাঁদের জন্য রোজা না রাখার অনুমতি আছে
রোজা ভাঙার কারণ জানার পাশাপাশি জানা দরকার, কারা রোজা না রেখেও গুনাহগার হন না। সূরা বাকারার ১৮৪ নম্বর আয়াতে অসুস্থ ও মুসাফিরকে পরে কাজা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। হানাফি ফিকহে এ তালিকায় আছেন: এমন অসুস্থ ব্যক্তি যাঁর রোগ বেড়ে যাওয়ার বা সুস্থ হতে দেরি হওয়ার আশঙ্কা আছে; শরিয়তসম্মত দূরত্বের সফরে থাকা মুসাফির; নিজের বা সন্তানের ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী মা; এবং এমন বৃদ্ধ, যাঁর পক্ষে রোজা রাখা আর সম্ভব নয়।
প্রথম তিন শ্রেণির মানুষ পরে সুবিধামতো সময়ে কাজা করবেন। আর যে বৃদ্ধ বা স্থায়ী রোগীর সুস্থ হওয়ার আশা নেই, তিনি প্রতিটি রোজার বদলে ফিদইয়া দেবেন, যার পরিমাণ একটি সদকাতুল ফিতরের সমান। রোগের মাত্রা বোঝার জন্য একজন অভিজ্ঞ ও দ্বীনদার চিকিৎসকের মতামত নেওয়া ভালো।
যা মাকরুহ, যদিও রোজা ভাঙে না
বিজ্ঞাপন
প্রয়োজন ছাড়া কোনো খাবারের স্বাদ জিভে নেওয়া, টুথপেস্ট বা মাজন দিয়ে দাঁত মাজা, মুখে থুতু জমিয়ে গেলা, গিবত করা, ঝগড়া ও মিথ্যা বলা রোজার সওয়াব নষ্ট করে। চুইংগাম চিবানোর সময় চিনি বা স্বাদ গলায় চলে যায়, তাই এতে রোজা ভেঙে যায়; একে মাকরুহ ভাবার ভুল করবেন না।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
রোজা অবস্থায় ভুলে খেয়ে ফেলেছি, মনে পড়ার পর কী করব?
মনে পড়ামাত্র মুখের খাবার ফেলে দিন এবং রোজা চালিয়ে যান। রোজা ভাঙেনি, কাজাও লাগবে না।
বিজ্ঞাপন
সেহরির সময় শেষ হওয়ার পর আজান শুনে পানি খেয়েছি, রোজা হবে কি?
সুবহে সাদিক পেরিয়ে যাওয়ার পর খেলে সেদিনের রোজা ভেঙে গেছে। দিনের বাকি সময় পানাহার থেকে বিরত থাকবেন এবং পরে একটি রোজা কাজা করবেন।
রোজা অবস্থায় রক্ত দেওয়া যায় কি?
রক্ত দেওয়ায় রোজা ভাঙে না। তবে দুর্বল হয়ে রোজা ভাঙার আশঙ্কা থাকলে ইফতারের পর দেওয়াই ভালো।
বিজ্ঞাপন
দাঁত তোলার পর রক্ত গিলে ফেললে কী হবে?
রক্ত থুতুর চেয়ে বেশি হলে বা তার স্বাদ গলায় পৌঁছালে রোজা ভেঙে যায়। তাই রক্ত গিলে না ফেলে বারবার ফেলে দিন।