জানাজার নামাজের নিয়ম, নিয়ত ও দোয়া: হানাফি মাজহাব অনুযায়ী
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
জানাজার নামাজ পুরোটাই দাঁড়িয়ে পড়া হয়। এতে রুকু নেই, সিজদা নেই, বৈঠকও নেই। চারটি তাকবির আর শেষে দুই দিকে সালাম, এটুকুই এর কাঠামো। প্রথম তাকবিরের পর সানা, দ্বিতীয় তাকবিরের পর দরুদ, তৃতীয় তাকবিরের পর মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া, আর চতুর্থ তাকবিরের পর সালাম।
বিজ্ঞাপন
মুসলমান মারা গেলে তাঁর জানাজা পড়া জীবিতদের ওপর ফরজে কিফায়া। এলাকার কিছু মানুষ পড়লেই সবার দায়িত্ব আদায় হয়ে যায়, কিন্তু কেউ না পড়লে সবাই গুনাহগার হবে। জানাজায় শরিক হওয়ার সওয়াবও অনেক। বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত হাদিসে আছে, যে ব্যক্তি জানাজার নামাজ পর্যন্ত উপস্থিত থাকে সে এক কিরাত, আর দাফন পর্যন্ত থাকে সে দুই কিরাত সওয়াব পায়। সাহাবিরা জানতে চাইলে নবী (সা.) বলেন, দুই কিরাত হলো দুটি বিশাল পাহাড়ের সমান।
অনেকে বছরে দু-একবার জানাজায় দাঁড়ান, তাই কোন তাকবিরের পর কী পড়তে হয় তা গুলিয়ে যায়। নিচে হানাফি মাজহাব অনুযায়ী পুরো পদ্ধতি সাজিয়ে দেওয়া হলো।
জানাজা শুদ্ধ হওয়ার শর্ত
সাধারণ নামাজের মতো জানাজার জন্যও অজু, পাক কাপড়, পাক জায়গা, সতর ঢাকা ও কিবলামুখী হওয়া জরুরি। এর সঙ্গে মৃত ব্যক্তির জন্য কয়েকটি শর্ত আছে: তিনি মুসলমান হবেন, তাঁকে গোসল ও কাফন দেওয়া হবে, এবং লাশ ইমামের সামনে মাটিতে বা খাটিয়ায় রাখা থাকবে।
বিজ্ঞাপন
ইমাম লাশের বুক বরাবর দাঁড়ান, পুরুষ ও নারী দুই ক্ষেত্রেই এটি হানাফি মত। মুসল্লিদের তিন বা পাঁচ, এভাবে বেজোড় কাতারে দাঁড়ানো মুস্তাহাব। জুতা পাক থাকলে জুতা পরে দাঁড়ানো যায়; সন্দেহ থাকলে জুতা খুলে তার ওপর দাঁড়ানোই নিরাপদ।
জানাজার নামাজের নিয়ত: নিয়ত মনে মনে করলেই যথেষ্ট। মনে এ সংকল্প রাখুন: আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এই মৃত ব্যক্তির জানাজার ফরজে কিফায়া নামাজ চার তাকবিরের সঙ্গে ইমামের পেছনে আদায় করছি; নামাজ আল্লাহর জন্য আর দোয়া এই মৃত ব্যক্তির জন্য। মৃত ব্যক্তি পুরুষ না নারী, তা না জানলেও নিয়ত শুদ্ধ হবে। আরবিতে নিয়ত মুখস্থ করা জরুরি নয়।
চার তাকবিরে যা পড়বেন
১. প্রথম তাকবির ও সানা: কান পর্যন্ত হাত তুলে আল্লাহু আকবার বলে হাত বাঁধুন। এরপর সানা পড়ুন: সুবহানাকাল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা ওয়া তাবারাকাসমুকা ওয়া তাআলা জাদ্দুকা ওয়া জাল্লা সানাউকা ওয়া লা ইলাহা গাইরুক। জানাজায় ওয়া জাল্লা সানাউকা অংশটি যোগ করার কথা ফিকহের কিতাবে আছে।
বিজ্ঞাপন
২. দ্বিতীয় তাকবির ও দরুদ: এবার হাত না তুলে শুধু আল্লাহু আকবার বলুন। হানাফি মাজহাবে জানাজায় প্রথম তাকবির ছাড়া অন্যগুলোতে হাত তোলা হয় না। এরপর নামাজে পড়া দরুদে ইব্রাহিম পড়ুন: আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিও ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদ…
৩. তৃতীয় তাকবির ও মৃতের জন্য দোয়া: আবার আল্লাহু আকবার বলে মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া পড়ুন। প্রাপ্তবয়স্ক, ছেলে শিশু ও মেয়ে শিশুর জন্য দোয়া আলাদা, যা নিচে দেওয়া হলো।
৪. চতুর্থ তাকবির ও সালাম: চতুর্থবার আল্লাহু আকবার বলে কিছু না পড়ে প্রথমে ডান দিকে, তারপর বাঁ দিকে সালাম ফেরান। সালামের সঙ্গে হাত ছেড়ে দিন।
ইমাম তাকবির ও সালাম উচ্চ স্বরে বলবেন, আর বাকি সব পড়া ইমাম-মুক্তাদি সবাই নিচু স্বরে পড়বেন।
বিজ্ঞাপন
প্রাপ্তবয়স্কের জন্য জানাজার দোয়া
মৃত ব্যক্তি প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ বা নারী যেই হোন, তৃতীয় তাকবিরের পর এই দোয়া পড়া হয়, যা তিরমিজি ও আবু দাউদে বর্ণিত:
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِحَيِّنَا وَمَيِّتِنَا وَشَاهِدِنَا وَغَائِبِنَا وَصَغِيرِنَا وَكَبِيرِنَا وَذَكَرِنَا وَأُنْثَانَا، اللَّهُمَّ مَنْ أَحْيَيْتَهُ مِنَّا فَأَحْيِهِ عَلَى الْإِسْلَامِ، وَمَنْ تَوَفَّيْتَهُ مِنَّا فَتَوَفَّهُ عَلَى الْإِيمَانِ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাগফির লিহাইয়িনা ওয়া মাইয়িতিনা ওয়া শাহিদিনা ওয়া গাইবিনা ওয়া সাগিরিনা ওয়া কাবিরিনা ওয়া জাকারিনা ওয়া উনসানা। আল্লাহুম্মা মান আহইয়াইতাহু মিন্না ফাআহয়িহি আলাল ইসলাম, ওয়া মান তাওয়াফফাইতাহু মিন্না ফাতাওয়াফফাহু আলাল ইমান।
বিজ্ঞাপন
অর্থ: হে আল্লাহ, আমাদের জীবিত ও মৃত, উপস্থিত ও অনুপস্থিত, ছোট ও বড়, পুরুষ ও নারী সবাইকে ক্ষমা করুন। হে আল্লাহ, আমাদের মধ্যে যাকে জীবিত রাখবেন তাকে ইসলামের ওপর জীবিত রাখুন, আর যাকে মৃত্যু দেবেন তাকে ইমানের সঙ্গে মৃত্যু দিন।
এই দোয়া মুখস্থ না থাকলে আল্লাহুম্মাগফির লাহু (পুরুষের জন্য) বা আল্লাহুম্মাগফির লাহা (নারীর জন্য) বলে ক্ষমা প্রার্থনা করলেও চলবে। অন্য কোনো মাসনুন দোয়া জানা থাকলে তাও পড়া যায়।
শিশুর জানাজার দোয়া
নাবালেগ ছেলে শিশুর জন্য তৃতীয় তাকবিরের পর পড়া হয়: আল্লাহুম্মাজআলহু লানা ফারাতাও ওয়াজআলহু লানা আজরাও ওয়া জুখরাও ওয়াজআলহু লানা শাফিআও ওয়া মুশাফফাআ। অর্থ: হে আল্লাহ, তাকে আমাদের জন্য অগ্রগামী করুন, তাকে আমাদের জন্য প্রতিদান ও সঞ্চয় বানান, এবং তাকে আমাদের জন্য সুপারিশকারী ও এমন বানান যার সুপারিশ কবুল হয়।
বিজ্ঞাপন
মেয়ে শিশুর ক্ষেত্রে সর্বনাম বদলে পড়তে হয়: আল্লাহুম্মাজআলহা লানা ফারাতাও ওয়াজআলহা লানা আজরাও ওয়া জুখরাও ওয়াজআলহা লানা শাফিআতাও ওয়া মুশাফফাআহ।
গায়েবানা জানাজা ও নিষিদ্ধ সময়ে জানাজা
লাশ সামনে না থাকলে, অর্থাৎ অন্য কোথাও মারা যাওয়া ব্যক্তির জন্য দূর থেকে জানাজা পড়াকে গায়েবানা জানাজা বলে। এ বিষয়ে মাজহাবগুলোর মধ্যে মতভেদ আছে। হানাফি ও মালেকি মাজহাবে গায়েবানা জানাজা বৈধ নয়, কারণ তাঁদের মতে লাশ সামনে থাকা শর্ত; নবী (সা.) কর্তৃক বাদশাহ নাজাশির জানাজা পড়ার ঘটনাকে তাঁরা বিশেষ পরিস্থিতি হিসেবে দেখেন। শাফেয়ি ও হাম্বলি মাজহাবে তা বৈধ।
সূর্যোদয়, ঠিক দুপুর ও সূর্যাস্তের সময় সাধারণ নামাজ নিষিদ্ধ। হানাফি মাজহাবে লাশ যদি ঠিক ওই সময়েই উপস্থিত করা হয়, তবে তখন জানাজা পড়া যায়। কিন্তু আগে থেকে লাশ প্রস্তুত থাকলে নিষিদ্ধ সময় পার হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত। আসর ও ফজরের পরের সময়ে জানাজা পড়তে কোনো সমস্যা নেই।
বিজ্ঞাপন
জানাজা শেষে দেরি না করে দাফনের জন্য রওনা হওয়া সুন্নত। লাশ বহনের সময় চুপচাপ থাকা, উচ্চ স্বরে জিকির না করা এবং দাফন শেষে কবরের পাশে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করা উত্তম।
দেরিতে এলে করণীয়
ইমাম এক বা একাধিক তাকবির বলে ফেলার পর কেউ এলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে তাকবির বলবেন না। ইমামের পরের তাকবিরের জন্য অপেক্ষা করবেন এবং ইমামের সঙ্গে তাকবির বলে নামাজে শামিল হবেন। ইমাম সালাম ফেরানোর পর ছুটে যাওয়া তাকবিরগুলো শুধু আল্লাহু আকবার বলে দ্রুত আদায় করে সালাম ফেরাবেন, লাশ তুলে নেওয়ার আগেই। দোয়া পড়ার সুযোগ না থাকলে শুধু তাকবিরই যথেষ্ট।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিজ্ঞাপন
জানাজার নামাজে কয় তাকবির?
চার তাকবির। প্রতিটি তাকবির জানাজার এক রাকাতের মতো গণ্য হয়, তাই কোনো একটি বাদ পড়লে নামাজ পূর্ণ হয় না।
জানাজার নামাজে কি সূরা ফাতিহা পড়তে হয়?
হানাফি মাজহাবে জানাজায় কেরাত হিসেবে সূরা ফাতিহা পড়া হয় না; প্রথম তাকবিরের পর সানা পড়া হয়। শাফেয়ি মাজহাবে প্রথম তাকবিরের পর ফাতিহা পড়া হয়, এটি মাজহাবগত মতভেদ।
বিজ্ঞাপন
নারীরা কি জানাজার নামাজ পড়তে পারেন?
পারেন। জানাজা নারী-পুরুষ সবার জন্যই বৈধ ইবাদত; পর্দার ব্যবস্থা থাকলে নারীরা পুরুষদের কাতারের পেছনে আলাদা কাতারে দাঁড়াবেন। তবে আমাদের দেশে সাধারণত পুরুষেরাই জানাজায় অংশ নেন, আর নারীরা ঘরে মৃতের জন্য দোয়া ও ইস্তিগফার করেন। মনে রাখবেন, হানাফি মাজহাবে একবার জানাজা হয়ে গেলে একই লাশের জন্য আবার জানাজা পড়া হয় না।
অজু না থাকলে কি তায়াম্মুম করে জানাজা পড়া যায়?
অজু করতে গেলে জানাজা ছুটে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে হানাফি মাজহাবে তায়াম্মুম করে শামিল হওয়ার অনুমতি আছে। তবে মৃতের অভিভাবকের জন্য এ সুযোগ নেই, কারণ তাঁর জন্য অপেক্ষা করা হয়।