তাহাজ্জুদ নামাজের নিয়ম: সময়, রাকাত সংখ্যা, নিয়ত ও ফজিলত
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
রাত তখন গভীর। ঘরের সবাই ঘুমিয়ে, বাইরে শুধু ঝিঁঝির ডাক। এমন সময় ঘুম ভেঙে অজু করে জায়নামাজে দাঁড়ানো—এটিই তাহাজ্জুদ। এশার নামাজের পর কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে উঠে সুবহে সাদিকের আগে যে নফল নামাজ পড়া হয়, তাকেই তাহাজ্জুদ বলে।
বিজ্ঞাপন
এর রাকাত সংখ্যা বাঁধাধরা নয়। সর্বনিম্ন দুই রাকাত, আর নবী (সা.) সাধারণত আট রাকাত পড়তেন, এরপর বিতর। নামাজ পড়ার পদ্ধতি অন্য সাধারণ নফলের মতোই: দুই রাকাত করে, প্রতি রাকাতে সূরা ফাতিহার পর যেকোনো সূরা। সময়ের মধ্যে রাতের শেষ তৃতীয়াংশ সবচেয়ে উত্তম।
ফরজ নয় বলে অনেকে একে কঠিন বা ঐচ্ছিক বিলাসিতা ভাবেন। কিন্তু কোরআন ও হাদিসে রাতের এই নামাজের যে মর্যাদা বর্ণিত হয়েছে, তা অন্য খুব কম নফল ইবাদতের বেলায় দেখা যায়।
তাহাজ্জুদ নামাজের সময়
এশার নামাজের পর থেকে সুবহে সাদিক পর্যন্ত পুরো রাতই নফল নামাজের সময়। তবে তাহাজ্জুদ শব্দের মূল অর্থের মধ্যে ঘুম থেকে জেগে ওঠার ভাব আছে। তাই আলেমরা বলেন, এশার পর কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে উঠে পড়লে তা প্রকৃত অর্থে তাহাজ্জুদ। কেউ ঘুমানোর আগে এশার পরই কয়েক রাকাত নফল পড়ে নিলে সেটিও রাতের নামাজ হিসেবে সওয়াব পাবেন, যদিও তাহাজ্জুদের পূর্ণ অর্থ তাতে আসে না।
বিজ্ঞাপন
সবচেয়ে উত্তম সময় রাতের শেষ তৃতীয়াংশ। বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত হাদিসে নবী (সা.) বলেছেন, প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আমাদের মহান রব নিকটবর্তী আসমানে নেমে আসেন এবং বলেন, কে আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব; কে আমার কাছে চাইবে, আমি তাকে দেব; কে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে, আমি তাকে ক্ষমা করব।
হিসাবটি সহজ। মাগরিবের সময় থেকে পরদিন ফজরের ওয়াক্ত শুরু হওয়া পর্যন্ত সময়কে তিন ভাগ করুন। শেষ ভাগটিই রাতের শেষ তৃতীয়াংশ। বাংলাদেশে এ সময় সাধারণত রাত একটার আশপাশে শুরু হয়, মৌসুমভেদে কিছুটা আগে-পরে। স্থানীয় নামাজের সময়সূচি দেখে নিজের এলাকার হিসাব করে নিন।
কত রাকাত পড়বেন
আয়েশা (রা.) বলেছেন, রমজান হোক বা অন্য মাস, নবী (সা.) রাতের নামাজ এগারো রাকাতের বেশি পড়তেন না (বুখারি, মুসলিম)। অর্থাৎ আট রাকাত তাহাজ্জুদ ও তিন রাকাত বিতর। অন্য কিছু বর্ণনায় তেরো রাকাতের কথাও এসেছে। আলেমরা বলেন, নফল নামাজের রাকাত সংখ্যার কোনো ঊর্ধ্বসীমা নেই।
বিজ্ঞাপন
তাই শুরুতে দুই রাকাত দিয়ে শুরু করুন। অভ্যাস হলে চার, তারপর আট রাকাত। লম্বা কেরাতে কম রাকাত পড়া, আর ছোট কেরাতে বেশি রাকাত পড়া, দুটিই ঠিক আছে। যা নিয়মিত করতে পারবেন, সেটিই ভালো। বুখারি ও মুসলিমের হাদিসে আছে, আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল সেটি, যা নিয়মিত করা হয়, পরিমাণে অল্প হলেও।
নিয়ত ও পড়ার পদ্ধতি
নিয়ত মনে মনে করলেই যথেষ্ট: আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দুই রাকাত তাহাজ্জুদের নফল নামাজ পড়ছি। আরবিতে নিয়ত বলা বা মুখস্থ করা জরুরি নয়। ধাপগুলো এমন:
১. অজু ও প্রস্তুতি: ঘুম থেকে উঠে মিসওয়াক বা ব্রাশ করে অজু করুন। নবী (সা.) রাতে উঠে মিসওয়াক করতেন বলে বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত আছে।
বিজ্ঞাপন
২. দুই রাকাত দিয়ে শুরু: অনেক আলেম প্রথমে সংক্ষিপ্ত দুই রাকাত দিয়ে শুরু করার কথা বলেছেন, যাতে ঘুমের জড়তা কাটে।
৩. দুই রাকাত করে পড়া: প্রতি দুই রাকাত পর সালাম ফেরান। প্রতি রাকাতে সূরা ফাতিহার পর যেকোনো সূরা বা আয়াত পড়ুন। যা মুখস্থ আছে, তা-ই পড়ুন; নির্দিষ্ট কোনো সূরা পড়ার বাধ্যবাধকতা নেই।
৪. ধীরে, মনোযোগ দিয়ে: রাতে কেউ তাড়া দেয় না। রুকু-সিজদা লম্বা করুন, সিজদায় নিজের ভাষায় মনে মনে আল্লাহর কাছে চাইতে পারেন। তবে হানাফি মাজহাবে নামাজের ভেতরে মুখে উচ্চারণ করে দোয়া করতে হলে কোরআন-হাদিসের আরবি দোয়া পড়াই নিয়ম।
৫. শেষে দোয়া ও ইস্তিগফার: নামাজ শেষে হাত তুলে নিজের ভাষায় মন খুলে দোয়া করুন। এই সময়ের দোয়ার বিশেষ মর্যাদার কথা ওপরের হাদিসেই আছে।
বিজ্ঞাপন
তাহাজ্জুদ ও বিতর: কোনটি আগে
হানাফি মাজহাবে বিতর ওয়াজিব এবং তা রাতের শেষ নামাজ হিসেবে পড়া উত্তম। মুসলিম শরিফে জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, যে আশঙ্কা করে শেষ রাতে উঠতে পারবে না, সে রাতের প্রথম ভাগেই বিতর পড়ে নিক। আর যে শেষ রাতে ওঠার আশা রাখে, সে শেষ রাতে বিতর পড়ুক, কারণ শেষ রাতের নামাজে ফেরেশতারা উপস্থিত থাকেন।
তাই যাঁর নিয়মিত ওঠার অভ্যাস আছে, তিনি বিতর তাহাজ্জুদের পর পড়বেন। আর যাঁর ঘুম ভাঙার নিশ্চয়তা নেই, তিনি এশার পরই বিতর পড়ে রাখবেন। বিতর পড়ে ঘুমানোর পর ঘুম ভাঙলে তাহাজ্জুদ পড়া যাবে, তবে বিতর আর দ্বিতীয়বার পড়তে হবে না।
কোরআন-হাদিসে তাহাজ্জুদের ফজিলত
বিজ্ঞাপন
সূরা বনি ইসরাইলে আল্লাহ নবী (সা.)-কে বলেছেন:
আর রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদ পড়ুন, এটি আপনার জন্য অতিরিক্ত। আশা করা যায়, আপনার রব আপনাকে প্রশংসিত স্থানে পৌঁছাবেন। (সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত ৭৯)
সূরা সাজদার ১৬ নম্বর আয়াতে মুমিনদের পরিচয় দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, তাদের পার্শ্বদেশ শয্যা থেকে আলাদা থাকে, তারা ভয় ও আশা নিয়ে তাদের রবকে ডাকে। সূরা মুজ্জাম্মিলের ৬ নম্বর আয়াতে আছে, রাতে ওঠা প্রবৃত্তি দমনে বেশি কার্যকর এবং সে সময়ের পাঠ বেশি স্পষ্ট।
মুসলিম শরিফে আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রমজানের পর সর্বোত্তম রোজা মহররম মাসের রোজা, আর ফরজ নামাজের পর সর্বোত্তম নামাজ রাতের নামাজ। আয়েশা (রা.) দেখেছেন, রাতের নামাজে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে নবী (সা.)-এর পা ফুলে যেত। তিনি জিজ্ঞেস করলে নবী (সা.) বলেছিলেন, আমি কি কৃতজ্ঞ বান্দা হব না? (বুখারি, মুসলিম)
বিজ্ঞাপন
নিয়মিত তাহাজ্জুদের জন্য বাস্তব কিছু পরামর্শ
রাত জেগে মোবাইল দেখে শেষ রাতে ওঠা প্রায় অসম্ভব। এশার পর তাড়াতাড়ি ঘুমানোর চেষ্টা করুন, রাতের খাবার হালকা রাখুন। দুপুরে অল্প সময় বিশ্রাম নিলে রাতে ওঠা সহজ হয়। অ্যালার্ম ঘড়ি বিছানা থেকে একটু দূরে রাখুন, যাতে বন্ধ করতে উঠতেই হয়।
ঘুমানোর আগে ওঠার নিয়ত করে রাখুন। নাসায়ির এক বর্ণনায় আছে, যে ব্যক্তি রাতে উঠে নামাজ পড়ার নিয়ত নিয়ে ঘুমায় কিন্তু ঘুম তাকে কাবু করে ফেলে, তার জন্য নিয়ত অনুযায়ী সওয়াব লেখা হয় এবং তার ঘুম তার জন্য সদকা হয়ে যায়।
কোনো রাতে অসুস্থতা বা অন্য কারণে ছুটে গেলে হতাশ হবেন না। মুসলিম শরিফে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, ব্যথা বা অন্য কারণে নবী (সা.)-এর রাতের নামাজ ছুটে গেলে তিনি দিনের বেলা বারো রাকাত পড়ে নিতেন।
বিজ্ঞাপন
সাধারণ জিজ্ঞাসা
এশার পর না ঘুমিয়ে তাহাজ্জুদ পড়া যায় কি?
যায়। এশার পর থেকে সুবহে সাদিক পর্যন্ত যেকোনো সময় নফল পড়লে রাতের নামাজের সওয়াব পাওয়া যায়। তবে কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে উঠে পড়াই উত্তম এবং তাহাজ্জুদের প্রকৃত রূপ।
তাহাজ্জুদে কোন সূরা পড়তে হয়?
বিজ্ঞাপন
নির্দিষ্ট কোনো সূরা নেই। যা মুখস্থ আছে, তা-ই পড়ুন। একই সূরা বারবার পড়লেও নামাজ হয়ে যায়।
মহিলারা কি তাহাজ্জুদ পড়তে পারেন?
অবশ্যই। নারী-পুরুষ সবার জন্য একই সওয়াব। ঋতুস্রাবের দিনগুলোতে নামাজ পড়বেন না, তবে শেষ রাতে উঠে জিকির, দরুদ ও দোয়া করতে পারেন।
তাহাজ্জুদ কি জামাতে পড়া যায়?
বিজ্ঞাপন
তাহাজ্জুদ একা পড়াই নিয়ম। হানাফি মাজহাবে ডেকে ডেকে লোক জড়ো করে নফল নামাজের জামাত করা মাকরুহ, তবে রমজানের তারাবি এর ব্যতিক্রম।