তারাবির নামাজের নিয়ম: নিয়ত, রাকাত সংখ্যা ও পড়ার পদ্ধতি
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
রমজানের চাঁদ দেখা গেলে সেদিন রাত থেকেই তারাবি শুরু হয়, আর শেষ হয় ঈদের চাঁদ দেখা গেলে। এশার ফরজ ও দুই রাকাত সুন্নতের পর, বিতরের আগে এই নামাজ পড়া হয়। হানাফি মাজহাবে তারাবি নারী-পুরুষ সবার জন্য সুন্নতে মুয়াক্কাদা, অর্থাৎ গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত; বিনা কারণে ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশের মসজিদগুলোতে হানাফি মাজহাব অনুযায়ী দুই রাকাত করে মোট বিশ রাকাত তারাবি পড়া হয়। প্রতি চার রাকাত পর কিছুক্ষণ বসে বিশ্রাম নেওয়া হয়, যাকে তারবিহা বলে। এই বিশ্রাম থেকেই নামাজটির নাম তারাবি।
তারাবির ফজিলত নিয়ে বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত একটি হাদিস সবচেয়ে পরিচিত:
যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে ও সওয়াবের আশায় রমজানে রাতের নামাজ আদায় করে, তার আগের গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়। (বুখারি, মুসলিম)
তারাবির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
বিজ্ঞাপন
নবী (সা.) রমজানের কয়েক রাত মসজিদে সাহাবিদের নিয়ে এই নামাজ পড়েছিলেন। মানুষ বাড়তে থাকলে এক রাতে তিনি আর বের হননি। পরে বলেছিলেন, আমার আশঙ্কা হয়েছিল, এটি তোমাদের ওপর ফরজ করে দেওয়া হতে পারে (বুখারি, মুসলিম)। এরপর সাহাবিরা আলাদা আলাদা পড়তেন।
উমর (রা.)-এর খিলাফতকালে এক রাতে তিনি মসজিদে গিয়ে দেখেন, লোকেরা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে আলাদা আলাদা ইমামের পেছনে নামাজ পড়ছে। তখন তিনি সবাইকে এক ইমাম উবাই ইবনে কাব (রা.)-এর পেছনে একত্র করেন (বুখারি)। সেই থেকে মসজিদে জামাতে তারাবি পড়ার রীতি চলে আসছে। হানাফি মাজহাবে মসজিদে জামাতে তারাবি পড়া সুন্নতে কিফায়া; মহল্লার মসজিদে জামাত হলে সবার পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যায়, তবে কেউ জামাত ছেড়ে ঘরে পড়লে জামাতের সওয়াব থেকে বঞ্চিত হবেন।
তারাবির নামাজ কত রাকাত
হানাফি মাজহাবসহ প্রসিদ্ধ চার মাজহাবের অধিকাংশ ইমামের মতে তারাবি বিশ রাকাত, আর উমর (রা.)-এর সময় থেকে মুসলিম বিশ্বের বড় অংশে এভাবেই পড়া হয়ে আসছে। বাংলাদেশের অধিকাংশ মসজিদে তাই বিশ রাকাতই পড়া হয়।
বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে আহলে হাদিস ঘরানার আলেমরা আয়েশা (রা.)-এর এগারো রাকাতের হাদিসকে ভিত্তি ধরে আট রাকাত তারাবি ও তিন রাকাত বিতরের পক্ষে মত দেন। এটি আলেমদের মধ্যে পুরোনো মতভেদ। যিনি যে মসজিদে পড়েন, সেখানকার ইমামের অনুসরণ করাই শান্তিপূর্ণ পথ; এ নিয়ে বিবাদে জড়ানো তারাবির চেতনার সঙ্গে যায় না।
তারাবির নামাজের নিয়ত: নিয়ত মনে মনে করলেই হয়: আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দুই রাকাত তারাবির সুন্নত নামাজ এই ইমামের পেছনে আদায় করছি। একা পড়লে ইমামের পেছনে কথাটি বাদ যাবে। প্রতি দুই রাকাতের জন্য আলাদা নিয়তের প্রয়োজন নেই; প্রথমবার পুরো তারাবির নিয়ত করলেও চলে। আরবি নিয়ত মুখস্থ করা জরুরি নয়।
ধাপে ধাপে তারাবি পড়ার পদ্ধতি
১. এশার নামাজ শেষ করুন: এশার চার রাকাত ফরজ ও দুই রাকাত সুন্নত আগে পড়তে হবে। এশার আগে তারাবি পড়লে তা শুদ্ধ হয় না।
বিজ্ঞাপন
২. দুই রাকাত করে পড়ুন: সাধারণ দুই রাকাত সুন্নত নামাজের মতোই। সানা, সূরা ফাতিহা, অন্য সূরা, রুকু, সিজদা, বৈঠক ও সালাম। ইমাম কেরাত উচ্চ স্বরে পড়বেন, মুক্তাদি চুপ করে শুনবেন। একা পড়লে কেরাত নিচু স্বরে বা মাঝারি স্বরে পড়তে পারেন। প্রতি দুই রাকাত শেষে সালাম ফেরানোই নিয়ম; চার রাকাত এক সালামে পড়ার অভ্যাস করবেন না।
৩. প্রতি চার রাকাতে তারবিহা: চার রাকাত শেষে প্রায় চার রাকাত পরিমাণ সময় বসে বিশ্রাম নেওয়া মুস্তাহাব। এ সময় জিকির, দরুদ, তেলাওয়াত বা চুপচাপ বসে থাকা সবই চলে। অনেক মসজিদে এ সময় একটি প্রচলিত তাসবিহ পড়া হয়, যা নিয়ে আলাদা লেখায় বিস্তারিত আছে।
৪. বিশ রাকাত শেষে বিতর: তারাবির পর রমজানে বিতর নামাজও জামাতে পড়া হয়। এটি শুধু রমজানের বৈশিষ্ট্য; অন্য মাসে বিতর জামাতে পড়া হয় না।
খতম তারাবি ও সূরা তারাবি
বিজ্ঞাপন
রমজানে তারাবিতে অন্তত একবার পুরো কোরআন খতম করা সুন্নত, আর বাংলাদেশের বহু মসজিদে হাফেজ সাহেবরা সাতাশ বা ঊনত্রিশ রাতে খতম শেষ করেন। যেসব মসজিদে বা বাড়িতে খতম সম্ভব নয়, সেখানে ছোট সূরা দিয়ে তারাবি পড়া হয়, যাকে লোকে সূরা তারাবি বলে। অনেকে সূরা ফিল থেকে সূরা নাস পর্যন্ত দশটি সূরা দুবার করে পড়েন; এটি সুবিধার জন্য প্রচলিত একটি পদ্ধতি, বাধ্যতামূলক কিছু নয়।
খতম তারাবিতে দ্রুত পড়ার প্রতিযোগিতা একটি দুঃখজনক প্রবণতা। শব্দ ও অক্ষর স্পষ্ট না হলে, কিংবা রুকু-সিজদায় স্থিরতা না থাকলে নামাজের মান নষ্ট হয়। আলেমরা বারবার মনে করিয়ে দেন, তাড়াহুড়ার খতমের চেয়ে ধীরস্থির সূরা তারাবি উত্তম।
মুক্তাদিদেরও কিছু দায়িত্ব আছে। অনেকে ইমাম রুকুতে যাওয়ার অপেক্ষায় পেছনে বসে থাকেন, তারপর রুকুর ঠিক আগে উঠে দাঁড়ান। এতে কোরআন শোনার সওয়াব হাতছাড়া হয়, আর আলেমরা এ অভ্যাসকে মাকরুহ বলেছেন। ক্লান্ত লাগলে বসে নফলের মতো পড়ার সুযোগ থাকলেও সুস্থ অবস্থায় দাঁড়িয়েই পড়া উচিত। মসজিদে মোবাইল বন্ধ রাখা, শিশুদের নিয়ে গেলে তাদের দিকে খেয়াল রাখা এবং কাতারের ফাঁক পূরণ করাও জামাতের আদবের অংশ।
এশা, তারাবি ও বিতর: পুরো রাতের ক্রম
বিজ্ঞাপন
রমজানের রাতে মসজিদে সাধারণত এই ক্রমে নামাজ হয়: এশার চার রাকাত সুন্নত (গায়রে মুয়াক্কাদা, চাইলে পড়বেন), চার রাকাত ফরজ জামাতে, দুই রাকাত সুন্নতে মুয়াক্কাদা, এরপর বিশ রাকাত তারাবি, সবশেষে তিন রাকাত বিতর জামাতে। যাঁরা শেষ রাতে তাহাজ্জুদ পড়তে অভ্যস্ত, তাঁরাও রমজানে ইমামের সঙ্গে বিতর পড়ে নিতে পারেন; তখন শেষ রাতে শুধু তাহাজ্জুদ পড়বেন, বিতর আবার পড়বেন না।
দেরিতে মসজিদে পৌঁছালে
মসজিদে গিয়ে দেখলেন এশার জামাত শেষ, তারাবি চলছে। এ ক্ষেত্রে আগে একা এশার ফরজ ও সুন্নত পড়ে নিন, তারপর তারাবির জামাতে শরিক হন। যে কয় রাকাত ছুটে গেল, তা ইমামের সঙ্গে বিতর পড়ার পর আলাদাভাবে পড়ে নিতে পারেন, অথবা বিতরের আগেই আদায় করতে পারেন। দুটিই বৈধ।
নারীরা ঘরে একা তারাবি পড়তে পারেন, পদ্ধতি একই। অসুস্থ ব্যক্তি বসে পড়তে পারেন। মুসাফির হলেও সম্ভব হলে তারাবি ছাড়বেন না।
বিজ্ঞাপন
সাধারণ জিজ্ঞাসা
তারাবির নামাজ কি সুন্নত না নফল?
হানাফি মাজহাবে তারাবি নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য সুন্নতে মুয়াক্কাদা। নবী (সা.) নিজে পড়েছেন এবং সাহাবিরা ধারাবাহিকভাবে পড়েছেন।
তারাবির নামাজ ঘরে পড়লে কি হবে?
বিজ্ঞাপন
হবে। তবে মসজিদে জামাতে পড়ার আলাদা সওয়াব আছে। পুরুষদের জন্য জামাতে পড়াই উত্তম, আর নারীদের জন্য ঘরে পড়া উত্তম।
তারাবি কত রাত পর্যন্ত পড়তে হয়?
রমজানের প্রথম রাত থেকে শেষ রাত পর্যন্ত, অর্থাৎ শাওয়ালের চাঁদ দেখা যাওয়ার আগের রাত পর্যন্ত। খতম আগে শেষ হয়ে গেলেও বাকি রাতগুলোতে তারাবি পড়া সুন্নত।
তারাবির মাঝে ঘুম পেলে কী করব?
বিজ্ঞাপন
নামাজে খুব ঘুম পেলে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার শুরু করুন। ঝিমুনি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলে কী পড়ছেন সেটাই খেয়াল থাকে না।
মুসাফির কি তারাবি পড়বেন?
সফরে থাকলেও তারাবি সুন্নত থেকে যায়, তবে কষ্ট হলে ছাড়ার অবকাশ আছে। সুযোগ ও শক্তি থাকলে পড়ে নেওয়াই ভালো, কারণ রমজানের রাতগুলো আর ফিরে আসে না।