তারাবির নামাজের দোয়া ও মোনাজাত: আরবি, বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
তারাবির প্রতি চার রাকাত শেষে মসজিদে কয়েক মিনিটের বিরতি পড়ে। সে সময় বাংলাদেশের অধিকাংশ মসজিদে মুসল্লিরা একসঙ্গে বা নিচু স্বরে একটি তাসবিহ পড়েন, যার শুরু সুবহানা জিল মুলকি ওয়াল মালাকুতি দিয়ে। এরপর হাত তুলে একটি ছোট মোনাজাত করা হয়, যার শুরু আল্লাহুম্মা ইন্না নাসআলুকাল জান্নাতা দিয়ে। এ দুটিকেই সাধারণত তারাবির নামাজের দোয়া ও মোনাজাত বলা হয়।
বিজ্ঞাপন
শুরুতেই একটি বিষয় পরিষ্কার থাকা দরকার। তারাবির প্রতি চার রাকাত পর বসে বিশ্রাম নেওয়া মুস্তাহাব, কিন্তু এ সময়ের জন্য নির্দিষ্ট কোনো দোয়া নবী (সা.) থেকে বর্ণিত হয়নি। ফিকহের কিতাবে বলা হয়েছে, এ সময় মুসল্লি চাইলে তাসবিহ পড়বেন, চাইলে কোরআন পড়বেন, চাইলে দরুদ পড়বেন, চাইলে নীরবে বসে থাকবেন।
প্রচলিত তাসবিহ ও মোনাজাতের বাক্যগুলো অর্থের দিক থেকে সুন্দর ও আল্লাহর প্রশংসায় ভরা, তাই আলেমরা এগুলো পড়তে নিষেধ করেন না। তবে একে বাধ্যতামূলক ভাবা, না পড়লে তারাবি অসম্পূর্ণ মনে করা, বা অন্য কেউ না পড়লে তাকে দোষারোপ করা ঠিক নয়।
তারাবির চার রাকাত পরের তাসবিহ
سُبْحَانَ ذِي الْمُلْكِ وَالْمَلَكُوتِ، سُبْحَانَ ذِي الْعِزَّةِ وَالْعَظَمَةِ وَالْهَيْبَةِ وَالْقُدْرَةِ وَالْكِبْرِيَاءِ وَالْجَبَرُوتِ، سُبْحَانَ الْمَلِكِ الْحَيِّ الَّذِي لَا يَنَامُ وَلَا يَمُوتُ، سُبُّوحٌ قُدُّوسٌ رَبُّنَا وَرَبُّ الْمَلَائِكَةِ وَالرُّوحِ
বিজ্ঞাপন
বাংলা উচ্চারণ: সুবহানা জিল মুলকি ওয়াল মালাকুতি, সুবহানা জিল ইজ্জাতি ওয়াল আজমাতি ওয়াল হাইবাতি ওয়াল কুদরাতি ওয়াল কিবরিয়ায়ি ওয়াল জাবারুত। সুবহানাল মালিকিল হাইয়িল্লাজি লা ইয়ানামু ওয়ালা ইয়ামুত। সুব্বুহুন কুদ্দুসুন রাব্বুনা ওয়া রাব্বুল মালাইকাতি ওয়ার রুহ।
অর্থ: পবিত্র তিনি, যিনি দৃশ্যমান রাজত্ব ও অদৃশ্য জগতের অধিপতি। পবিত্র তিনি, যিনি সম্মান, মহত্ত্ব, প্রতাপ, ক্ষমতা, বড়ত্ব ও পরাক্রমের অধিকারী। পবিত্র সেই চিরঞ্জীব বাদশাহ, যিনি ঘুমান না এবং যাঁর মৃত্যু নেই। তিনি মহাপবিত্র, অতি পবিত্র; আমাদের রব এবং ফেরেশতা ও রুহের রব।
তাসবিহটির শেষ অংশ, সুব্বুহুন কুদ্দুসুন রাব্বুল মালাইকাতি ওয়ার রুহ, নবী (সা.) রুকু ও সিজদায় পড়তেন বলে মুসলিম শরিফে বর্ণিত আছে। বাকি বাক্যগুলোও আল্লাহর গুণবাচক নাম ও প্রশংসা দিয়ে গঠিত। এ জন্যই আলেমরা একে একটি উত্তম জিকির হিসেবে গ্রহণ করেছেন, যদিও তারাবির সঙ্গে এর নির্দিষ্ট সম্পর্ক হাদিস থেকে প্রমাণিত নয়।
তারাবির মোনাজাত
বিজ্ঞাপন
اللَّهُمَّ إِنَّا نَسْأَلُكَ الْجَنَّةَ وَنَعُوذُ بِكَ مِنَ النَّارِ، يَا خَالِقَ الْجَنَّةِ وَالنَّارِ، بِرَحْمَتِكَ يَا عَزِيزُ يَا غَفَّارُ يَا كَرِيمُ يَا سَتَّارُ يَا رَحِيمُ يَا جَبَّارُ يَا خَالِقُ يَا بَارُّ، اللَّهُمَّ أَجِرْنَا مِنَ النَّارِ يَا مُجِيرُ يَا مُجِيرُ يَا مُجِيرُ، بِرَحْمَتِكَ يَا أَرْحَمَ الرَّاحِمِينَ
বাংলা উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্না নাসআলুকাল জান্নাতা ওয়া নাউজুবিকা মিনান নার। ইয়া খালিকাল জান্নাতি ওয়ান নার, বিরাহমাতিকা ইয়া আজিজু ইয়া গাফফারু ইয়া কারিমু ইয়া সাত্তারু ইয়া রাহিমু ইয়া জাব্বারু ইয়া খালিকু ইয়া বাররু। আল্লাহুম্মা আজিরনা মিনান নার, ইয়া মুজিরু ইয়া মুজিরু ইয়া মুজির, বিরাহমাতিকা ইয়া আরহামার রাহিমিন।
অর্থ: হে আল্লাহ, আমরা আপনার কাছে জান্নাত চাই এবং জাহান্নাম থেকে আশ্রয় চাই। হে জান্নাত ও জাহান্নামের স্রষ্টা, আপনার রহমতের উসিলায়, হে পরাক্রমশালী, হে মহাক্ষমাশীল, হে মহানুভব, হে দোষ গোপনকারী, হে দয়ালু, হে প্রবল, হে স্রষ্টা, হে কল্যাণকারী। হে আল্লাহ, আমাদের জাহান্নাম থেকে রক্ষা করুন, হে রক্ষাকারী, হে রক্ষাকারী, হে রক্ষাকারী। আপনার রহমতের উসিলায়, হে সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।
জান্নাত চাওয়া ও জাহান্নাম থেকে আশ্রয় চাওয়ার দোয়া হাদিসে বহুবার এসেছে। মোনাজাতের এই বিশেষ শব্দবিন্যাস পরবর্তী সময়ে প্রচলিত হয়েছে। মনে রাখা দরকার, প্রতি চার রাকাত পর সবাই মিলে হাত তুলে মোনাজাত করাকে অনেক আলেম জরুরি মনে করেন না; কেউ একা নিচু স্বরে পড়তে পারেন, কেউ না-ও পড়তে পারেন।
বিজ্ঞাপন
বিরতির সময় আর কী পড়া যায়
তারবিহার কয়েক মিনিট কাজে লাগানোর অনেক উপায় আছে, যেগুলোর ভিত্তি সরাসরি কোরআন-হাদিসে:
১. রমজানের রাতের বিশেষ দোয়া: আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া ফাফু আন্নি। অর্থ: হে আল্লাহ, আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতে ভালোবাসেন, তাই আমাকে ক্ষমা করুন। শবে কদরে পড়ার জন্য নবী (সা.) আয়েশা (রা.)-কে এটি শিখিয়েছিলেন (তিরমিজি)।
২. দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণের দোয়া: রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাও ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতাও ওয়া কিনা আজাবান নার। অর্থ: হে আমাদের রব, আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দিন, আখেরাতে কল্যাণ দিন এবং জাহান্নামের আজাব থেকে রক্ষা করুন (সূরা বাকারা, আয়াত ২০১)।
বিজ্ঞাপন
৩. সহজ চার কালিমা: সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার। মুসলিম শরিফের হাদিসে এগুলোকে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় বাক্য বলা হয়েছে।
৪. দরুদ শরিফ: নামাজে পড়া দরুদে ইব্রাহিম বা ছোট দরুদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
৫. ইস্তিগফার: আস্তাগফিরুল্লাহ, কিংবা রাব্বিগফিরলি ওয়ারহামনি।
বিতরের পর সুন্নত জিকির
বিজ্ঞাপন
তারাবির শেষে রমজানে জামাতে বিতর পড়া হয়। বিতরের সালাম ফেরানোর পর একটি জিকির সরাসরি হাদিস থেকে প্রমাণিত, যা অনেকেই জানেন না। আবু দাউদ ও নাসায়িতে বর্ণিত, নবী (সা.) বিতরের সালামের পর তিনবার বলতেন:
سُبْحَانَ الْمَلِكِ الْقُدُّوسِ
উচ্চারণ: সুবহানাল মালিকিল কুদ্দুস। অর্থ: পবিত্র সেই বাদশাহ, যিনি মহাপবিত্র। বর্ণনায় আছে, তৃতীয়বার তিনি স্বর একটু টেনে উঁচু করে বলতেন। তারাবির প্রচলিত তাসবিহের সঙ্গে এই সুন্নত জিকিরটিও অভ্যাসে যোগ করে নিতে পারেন।
এরপর ব্যক্তিগতভাবে হাত তুলে দোয়া করা যায়। রমজানের রাত দোয়ার জন্য বিশেষ সময়। নিজের, পরিবারের, মৃত আত্মীয়দের, অসুস্থদের এবং দেশ ও উম্মাহর জন্য দোয়া করুন। নিজের ভাষায় করা দোয়াও আল্লাহ শোনেন।
বিজ্ঞাপন
যে বিষয়গুলো খেয়াল রাখবেন
তাসবিহ বা মোনাজাত পড়তে গিয়ে বিরতি এত লম্বা করা উচিত নয় যে মুসল্লিরা বিরক্ত হন বা অসুস্থ ও বয়স্কদের কষ্ট হয়। আবার কেউ পড়তে না চাইলে তাঁর ওপর চাপিয়ে দেওয়াও ঠিক নয়। সমস্বরে উচ্চ শব্দে পড়লে পাশে যিনি নিজের মতো জিকির বা তেলাওয়াত করছেন, তাঁর মনোযোগ নষ্ট হয়। নিচু স্বরে পড়াই আদবের কাছাকাছি।
যাঁরা আরবি পড়তে পারেন না, তাঁরা বাংলা উচ্চারণ দেখে পড়তে পারেন। তবে বাংলা হরফে আরবির সব ধ্বনি ধরা যায় না। তাই একবার মসজিদের ইমাম বা কোনো কারির কাছে শুনে উচ্চারণ ঠিক করে নিন। অর্থ জেনে পড়লে মনোযোগ ও আবেগ দুটিই বাড়ে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিজ্ঞাপন
তারাবির দোয়া না পড়লে কি নামাজ হবে না?
অবশ্যই হবে। চার রাকাত পরের তাসবিহ বা মোনাজাত তারাবির অংশ নয়। এটি না পড়লে নামাজে কোনো ঘাটতি হয় না।
তারাবির তাসবিহ কি হাদিসে আছে?
এই নির্দিষ্ট বিন্যাসে হাদিসে নেই। এর কিছু বাক্য হাদিসে বর্ণিত জিকিরের অংশ, আর পুরোটা পরবর্তী সময়ে প্রচলিত হয়েছে। অর্থের দিক থেকে এটি আল্লাহর প্রশংসা, তাই পড়তে বাধা নেই।
বিজ্ঞাপন
মহিলারা ঘরে তারাবি পড়লে কি এই দোয়া পড়বেন?
পড়তে পারেন, না-ও পড়তে পারেন। চার রাকাত পর একটু বিশ্রাম নিয়ে যেকোনো জিকির, দরুদ বা ইস্তিগফার পড়লেই যথেষ্ট।
তাসবিহটি কয়বার পড়তে হয়?
নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা নেই। অনেক মসজিদে তিনবার পড়ার রেওয়াজ আছে, কিন্তু এটি বাধ্যতামূলক নয়। বিশ্রামের সময়ের মধ্যে যতবার স্বাচ্ছন্দ্যে পড়া যায়, ততবার পড়ুন।
বিজ্ঞাপন
মসজিদে সবাই মিলে জোরে তাসবিহ পড়া কি ঠিক?
আলেমদের অনেকে সমস্বরে উচ্চ শব্দে পড়াকে অপছন্দ করেছেন, কারণ এতে অন্যের ইবাদতে ব্যাঘাত ঘটে। প্রত্যেকে নিচু স্বরে নিজে নিজে পড়াই উত্তম।
মোনাজাত কি আরবিতেই করতে হবে?
নামাজের বাইরে মোনাজাত যেকোনো ভাষায় করা যায়। আরবি দোয়ার পাশাপাশি নিজের ভাষায় মনের কথা আল্লাহকে বলুন।