ঈদের নামাজের নিয়ম ও নিয়ত: অতিরিক্ত ছয় তাকবিরে কীভাবে পড়বেন
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
ঈদের নামাজ মোটে দুই রাকাত, কিন্তু বছরে মাত্র দুবার পড়া হয় বলে অনেকেরই তাকবিরের হিসাব গুলিয়ে যায়। কখন হাত তুলে ছেড়ে দিতে হবে, কখন বাঁধতে হবে, দ্বিতীয় রাকাতে তাকবির কেরাতের আগে না পরে—এসব প্রশ্ন প্রতি ঈদেই ঘুরেফিরে আসে।
বিজ্ঞাপন
সংক্ষেপে উত্তর হলো: হানাফি মাজহাবে ঈদের নামাজ ছয়টি অতিরিক্ত তাকবিরসহ দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ। প্রথম রাকাতে সানা পড়ার পর তিনটি তাকবির, তারপর কেরাত। দ্বিতীয় রাকাতে আগে কেরাত, তারপর রুকুতে যাওয়ার আগে তিনটি তাকবির। এর কোনো আজান বা ইকামত নেই, আর খুতবা হয় নামাজের পরে।
যাঁদের ওপর জুমার নামাজ ওয়াজিব, অর্থাৎ শহর বা জনপদে বসবাসকারী সুস্থ, প্রাপ্তবয়স্ক, মুকিম পুরুষ, তাঁদের ওপর ঈদের নামাজও ওয়াজিব। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা দুটির পদ্ধতিই এক।
ঈদের নামাজের সময়
সূর্য ওঠার পর মাকরুহ সময় পেরিয়ে গেলে, অর্থাৎ সূর্য কিছুটা ওপরে উঠলে ঈদের নামাজের সময় শুরু হয় এবং ঠিক দুপুর বা জাওয়ালের আগ পর্যন্ত থাকে। ঈদুল আজহার নামাজ একটু আগে পড়া উত্তম, যাতে মানুষ দ্রুত কোরবানি করতে পারে। আর ঈদুল ফিতরের নামাজ সামান্য দেরিতে পড়া উত্তম, যাতে সবাই নামাজের আগে ফিতরা আদায় করার সুযোগ পায়।
বিজ্ঞাপন
ঈদের দিনের বড় জামাতে মানুষের ভিড়, শিশুদের হট্টগোল আর মাইকের শব্দে অনেক সময় ইমামের তাকবির ঠিকমতো শোনা যায় না। তাই নামাজের আগে পদ্ধতিটা একবার মনে মনে ঝালিয়ে নিলে নামাজে মনোযোগ ধরে রাখা সহজ হয়। অনেক ঈদগাহে ইমাম নামাজ শুরুর আগে নিয়মটি সংক্ষেপে বলে দেন; সেটি মন দিয়ে শুনুন।
ঈদের নামাজের নিয়ত: নিয়ত মনে মনে করলেই হয়: আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য অতিরিক্ত ছয় তাকবিরসহ ঈদুল ফিতরের দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ এই ইমামের পেছনে আদায় করছি। ঈদুল আজহা হলে নামটি বদলে নেবেন। আরবিতে মুখে নিয়ত বলা জরুরি নয়।
ধাপে ধাপে ঈদের নামাজ
প্রথম রাকাত:
বিজ্ঞাপন
১. তাকবিরে তাহরিমা: নিয়ত করে কান পর্যন্ত হাত তুলে আল্লাহু আকবার বলে হাত বাঁধুন এবং সানা পড়ুন।
২. প্রথম অতিরিক্ত তাকবির: ইমামের সঙ্গে আল্লাহু আকবার বলে কান পর্যন্ত হাত তুলুন, তারপর হাত বাঁধবেন না, দুই পাশে ছেড়ে দিন।
৩. দ্বিতীয় অতিরিক্ত তাকবির: আবার আল্লাহু আকবার বলে হাত তুলে ছেড়ে দিন।
৪. তৃতীয় অতিরিক্ত তাকবির: আল্লাহু আকবার বলে হাত তুলে এবার নাভির নিচে বেঁধে ফেলুন।
বিজ্ঞাপন
৫. কেরাত, রুকু ও সিজদা: ইমাম আউজুবিল্লাহ, বিসমিল্লাহ, সূরা ফাতিহা ও অন্য সূরা উচ্চ স্বরে পড়বেন। মুক্তাদি চুপ থাকবেন। এরপর স্বাভাবিক নিয়মে রুকু ও দুই সিজদা।
দ্বিতীয় রাকাত:
৬. আগে কেরাত: দাঁড়িয়ে ইমাম সূরা ফাতিহা ও অন্য সূরা পড়বেন।
৭. রুকুর আগে তিন তাকবির: কেরাত শেষে তিনবার আল্লাহু আকবার বলে প্রতিবার কান পর্যন্ত হাত তুলে ছেড়ে দিন। তিনবারই হাত ছেড়ে দেবেন।
বিজ্ঞাপন
৮. চতুর্থ তাকবিরে রুকু: এবার হাত না তুলে আল্লাহু আকবার বলে সরাসরি রুকুতে যান। তারপর সিজদা, শেষ বৈঠক ও সালাম স্বাভাবিক নিয়মে।
মনে রাখার সহজ সূত্র: প্রথম রাকাতে তিন তাকবিরের শেষটিতে হাত বাঁধতে হয়, দ্বিতীয় রাকাতে তিনটিতেই হাত ছাড়তে হয়, আর চতুর্থটিতে রুকু। প্রতি দুই তাকবিরের মাঝে প্রায় তিনবার সুবহানাল্লাহ বলার মতো বিরতি দেওয়া হয়।
খুতবা ও তাকবিরে তাশরিক
নামাজের পর ইমাম দুটি খুতবা দেন। খুতবা শোনা জরুরি, এ সময় কথা বলা, মোবাইল দেখা বা উঠে চলে যাওয়া আদবের পরিপন্থী। খুতবা শেষে ইমামের সঙ্গে দোয়ায় শরিক হওয়া যায়।
বিজ্ঞাপন
ঈদুল আজহার মৌসুমে জিলহজের নয় তারিখের ফজর থেকে তেরো তারিখের আসর পর্যন্ত প্রতিটি ফরজ নামাজের পর একবার তাকবিরে তাশরিক পড়া হানাফি মাজহাবে ওয়াজিব: আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ। ঈদগাহে যাওয়ার পথেও এই তাকবির পড়া সুন্নত; ঈদুল আজহায় উচ্চ স্বরে আর ঈদুল ফিতরে নিচু স্বরে পড়ার কথা হানাফি ফিকহে বেশি প্রসিদ্ধ।
ঈদের দিনের সুন্নতগুলো
ভোরে উঠে গোসল করা, মিসওয়াক করা, সামর্থ্য অনুযায়ী সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন পোশাক পরা, পুরুষদের সুগন্ধি ব্যবহার করা ঈদের দিনের সুন্নত। ঈদুল ফিতরে নামাজে যাওয়ার আগে বেজোড় সংখ্যক খেজুর বা মিষ্টি কিছু খাওয়া সুন্নত; নবী (সা.) ঈদুল ফিতরের দিন খেজুর না খেয়ে বের হতেন না বলে বুখারিতে বর্ণিত। ঈদুল আজহায় নামাজের আগে না খেয়ে নামাজের পর কোরবানির গোশত দিয়ে খাওয়া উত্তম।
সম্ভব হলে হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া এবং এক পথে গিয়ে অন্য পথে ফেরা সুন্নত, যা বুখারিতে বর্ণিত। ঈদুল ফিতরের নামাজের আগেই সদকাতুল ফিতর আদায় করে দেওয়া উত্তম। সাহাবিরা ঈদের দিন একে অপরকে বলতেন, তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম, অর্থাৎ আল্লাহ আমাদের ও আপনাদের পক্ষ থেকে কবুল করুন।
বিজ্ঞাপন
মহিলাদের ঈদের নামাজ
এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ আছে। হানাফি মাজহাবে নারীদের ওপর ঈদের নামাজ ওয়াজিব নয়। পরবর্তী যুগের হানাফি ফকিহরা ফিতনার আশঙ্কায় নারীদের ঈদগাহে যাওয়াকে নিরুৎসাহিত করেছেন। অন্যদিকে অনেক আলেম বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত উম্মে আতিয়া (রা.)-এর হাদিসের ভিত্তিতে পর্দা ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকলে নারীদের ঈদগাহে যাওয়ার পক্ষে মত দেন। যেখানে আলাদা ব্যবস্থা আছে, সেখানে নারীরা অংশ নিতে পারেন; স্থানীয় আলেমের পরামর্শ অনুসরণ করাই ভালো।
হানাফি মাজহাবে ঈদের নামাজ জামাত ছাড়া হয় না। তাই ঘরে একা ঈদের নামাজ পড়ার নিয়ম নেই।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিজ্ঞাপন
দেরিতে পৌঁছে অতিরিক্ত তাকবির ছুটে গেলে কী করব?
প্রথম রাকাতে ইমাম কেরাত শুরু করার পর পৌঁছালে তাকবিরে তাহরিমা বলে নিজে নিজে তিন তাকবির বলে নিন। ইমাম রুকুতে থাকলে দাঁড়িয়ে তাকবিরগুলো বলে রুকু ধরতে পারলে ভালো, না পারলে রুকুতে গিয়ে হাত না তুলে তাকবিরগুলো বলে নিন।
পুরো এক রাকাত ছুটে গেলে কীভাবে পূরণ করব?
ইমামের সালামের পর দাঁড়িয়ে আগে সূরা ফাতিহা ও অন্য সূরা পড়ুন, তারপর রুকুর আগে তিন তাকবির বলুন। হানাফি ফিকহে এ পদ্ধতিই বেশি প্রসিদ্ধ।
বিজ্ঞাপন
ঈদের নামাজ ছুটে গেলে কি একা পড়া যায়?
হানাফি মাজহাবে ঈদের নামাজ একা কাজা করা যায় না। সম্ভব হলে কাছের অন্য কোনো মসজিদ বা ঈদগাহে পরের জামাতে শরিক হোন। না পেলে ইস্তিগফার করুন, চাইলে চাশতের নফল পড়তে পারেন।
ঈদের নামাজে ভুল হলে কি সাহু সিজদা দিতে হয়?
নিয়ম অনুযায়ী ওয়াজিব ছুটলে সাহু সিজদা আসে। তবে বড় জামাতে বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা থাকলে ঈদ ও জুমায় সাহু সিজদা না দেওয়ার অবকাশ আছে বলে হানাফি ফকিহরা উল্লেখ করেছেন।
বিজ্ঞাপন
বৃষ্টি বা অন্য কারণে ঈদের দিন নামাজ না হলে?
শরিয়তসম্মত ওজরে ঈদের দিন নামাজ আদায় করা না গেলে ঈদুল ফিতরের নামাজ পরদিন জাওয়ালের আগে পড়া যায়। ঈদুল আজহার নামাজ এমন ওজরে জিলহজের বারো তারিখ পর্যন্ত পড়ার সুযোগ আছে। এ ক্ষেত্রে এলাকার ইমাম ও কমিটি মিলে সিদ্ধান্ত নেন।