দোয়া কুনুত বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ: বিতর নামাজে পড়ার নিয়ম
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
এশার পর তিন রাকাত বিতর নামাজের শেষ রাকাতে সূরা ফাতিহা ও অন্য সূরা পড়ার পর রুকুতে যাওয়ার আগে একটু থেমে যে দোয়াটি পড়া হয়, সেটিই দোয়া কুনুত। হানাফি মাজহাবে বিতর নামাজ ওয়াজিব, আর তার তৃতীয় রাকাতে দোয়া কুনুত পড়াও ওয়াজিব। ভুলে ছুটে গেলে শেষে সাহু সিজদা দিতে হয়।
বিজ্ঞাপন
কুনুত শব্দের অর্থ বিনয়ের সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকা, আনুগত্য করা বা দোয়া করা। তাই বিতরে দাঁড়ানো অবস্থায় এই বিশেষ দোয়াকে দোয়া কুনুত বলা হয়। বাংলাদেশে বিতরে যে দোয়াটি পড়া হয়, তা আল্লাহুম্মা ইন্না নাসতাইনুকা দিয়ে শুরু। সাহাবিদের আমল থেকে বর্ণিত এই দোয়াটি হানাফি মাজহাবে বিতরের কুনুত হিসেবে গৃহীত।
নিচে দোয়াটির আরবি, বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ দেওয়া হলো। সঙ্গে আছে বিতরে এটি পড়ার নিয়ম আর যাঁরা এখনো মুখস্থ করতে পারেননি, তাঁদের করণীয়।
দোয়া কুনুত আরবি ও বাংলা উচ্চারণ
اللَّهُمَّ إِنَّا نَسْتَعِينُكَ وَنَسْتَغْفِرُكَ وَنُؤْمِنُ بِكَ وَنَتَوَكَّلُ عَلَيْكَ وَنُثْنِي عَلَيْكَ الْخَيْرَ وَنَشْكُرُكَ وَلَا نَكْفُرُكَ وَنَخْلَعُ وَنَتْرُكُ مَنْ يَفْجُرُكَ، اللَّهُمَّ إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَلَكَ نُصَلِّي وَنَسْجُدُ وَإِلَيْكَ نَسْعَى وَنَحْفِدُ وَنَرْجُو رَحْمَتَكَ وَنَخْشَى عَذَابَكَ إِنَّ عَذَابَكَ بِالْكُفَّارِ مُلْحِقٌ
বিজ্ঞাপন
বাংলা উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্না নাসতাইনুকা ওয়া নাসতাগফিরুকা ওয়া নুমিনু বিকা ওয়া নাতাওয়াক্কালু আলাইকা ওয়া নুসনি আলাইকাল খাইর, ওয়া নাশকুরুকা ওয়ালা নাকফুরুকা ওয়া নাখলাউ ওয়া নাতরুকু মাই ইয়াফজুরুক। আল্লাহুম্মা ইয়্যাকা নাবুদু ওয়ালাকা নুসাল্লি ওয়া নাসজুদু ওয়া ইলাইকা নাসআ ওয়া নাহফিদু ওয়া নারজু রাহমাতাকা ওয়া নাখশা আজাবাকা ইন্না আজাবাকা বিলকুফফারি মুলহিক।
বাংলা হরফে কয়েকটি আরবি ধ্বনি ঠিকমতো লেখা যায় না, যেমন নাসতাইনুকার আইন বা নাখশার খা। তাই উচ্চারণটি একবার কোনো ইমাম বা কারির কাছে শুনে নিন। নামাজে পড়ার দোয়ায় অক্ষর বদলে গেলে অর্থও বদলে যেতে পারে।
দোয়ায়ে কুনুতের অর্থ
হে আল্লাহ, আমরা আপনার কাছে সাহায্য চাই, আপনার কাছে ক্ষমা চাই, আপনার ওপর ইমান আনি, আপনার ওপর ভরসা করি এবং উত্তমভাবে আপনার প্রশংসা করি। আমরা আপনার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি, অকৃতজ্ঞ হই না। যে আপনার অবাধ্য হয়, আমরা তার সঙ্গ ত্যাগ করি ও তাকে ছেড়ে দিই। হে আল্লাহ, আমরা শুধু আপনারই ইবাদত করি, আপনার জন্যই নামাজ পড়ি ও সিজদা করি, আপনার দিকেই ছুটে যাই এবং আপনার আনুগত্যে তৎপর থাকি। আমরা আপনার রহমতের আশা করি এবং আপনার শাস্তিকে ভয় করি। নিশ্চয়ই আপনার শাস্তি অবিশ্বাসীদের ঘিরে ধরবে।
বিজ্ঞাপন
অর্থের দিকে তাকালে বোঝা যায়, দোয়াটি আসলে একজন মুমিনের অঙ্গীকারনামা। সাহায্য চাওয়া, ক্ষমা চাওয়া, ভরসা, কৃতজ্ঞতা, অবাধ্যতা থেকে দূরে থাকা, ইবাদতে একনিষ্ঠতা, আশা ও ভয়—ইমানের প্রায় সব মৌলিক অনুভূতি এখানে কয়েকটি বাক্যে গাঁথা। প্রতি রাতে এটি পড়া মানে সেই অঙ্গীকার নতুন করে করা।
বিতর নামাজে দোয়া কুনুত পড়ার নিয়ম
১. প্রথম দুই রাকাত: বিতরের প্রথম দুই রাকাত সাধারণ নামাজের মতো। প্রতি রাকাতে সূরা ফাতিহার পর অন্য সূরা মেলাতে হবে। দ্বিতীয় রাকাতের পর বসে শুধু তাশাহুদ পড়ে তৃতীয় রাকাতের জন্য উঠে দাঁড়াবেন।
২. তৃতীয় রাকাতে কেরাত: সূরা ফাতিহা ও তার সঙ্গে অন্য একটি সূরা পড়ুন। বিতরের প্রতি রাকাতেই সূরা মেলানো ওয়াজিব।
বিজ্ঞাপন
৩. কুনুতের তাকবির: কেরাত শেষে রুকুতে না গিয়ে আল্লাহু আকবার বলে তাকবিরে তাহরিমার মতো কান পর্যন্ত হাত তুলুন, তারপর আবার নাভির নিচে হাত বাঁধুন। নারীরা কাঁধ পর্যন্ত হাত তুলে বুকে বাঁধবেন।
৪. দোয়া কুনুত পড়া: হাত বাঁধা অবস্থায় নিচু স্বরে দোয়া কুনুত পড়ুন।
৫. রুকু ও বাকি নামাজ: দোয়া শেষে আল্লাহু আকবার বলে রুকুতে যান। তারপর সিজদা, শেষ বৈঠকে তাশাহুদ, দরুদ, দোয়া মাসুরা পড়ে সালাম ফেরান।
রমজানে বিতর জামাতে পড়া হয়। তখন ইমাম ও মুক্তাদি সবাই তাকবির বলে হাত বেঁধে নিজে নিজে নিচু স্বরে দোয়া কুনুত পড়বেন।
বিজ্ঞাপন
মুখস্থ না থাকলে বা ভুলে গেলে
যিনি দোয়া কুনুত এখনো মুখস্থ করতে পারেননি, তিনি শেখার আগ পর্যন্ত রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাও ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতাও ওয়া কিনা আজাবান নার পড়তে পারেন। অথবা তিনবার আল্লাহুম্মাগফিরলি পড়বেন। হানাফি ফকিহরা এ সুযোগের কথা বলেছেন। তবে এটিকে স্থায়ী অভ্যাস বানানো ঠিক নয়; দ্রুত মুখস্থ করে নেওয়া দরকার।
কুনুত পড়তে ভুলে গিয়ে রুকুতে চলে গেলে আর দাঁড়িয়ে ফিরে আসবেন না। নামাজ চালিয়ে যান এবং শেষ বৈঠকে সাহু সিজদা দিন। আর রুকুতে যাওয়ার আগেই মনে পড়লে তখনই তাকবির বলে দোয়া কুনুত পড়ে নিন, তারপর রুকুতে যান।
বিতর কখন পড়বেন, কেন গুরুত্বপূর্ণ
বিজ্ঞাপন
বিতরের সময় এশার ফরজ নামাজের পর থেকে সুবহে সাদিক পর্যন্ত। এশার আগে বিতর পড়লে তা আদায় হয় না। যাঁর শেষ রাতে ওঠার অভ্যাস আছে, তাঁর জন্য তাহাজ্জুদের পর বিতর পড়া উত্তম; আর যাঁর ঘুম ভাঙার নিশ্চয়তা নেই, তিনি এশার সুন্নতের পরপরই বিতর পড়ে নেবেন। মুসলিম শরিফে জাবির (রা.)-এর বর্ণনায় এ নির্দেশনা আছে।
হানাফি মাজহাবে বিতর ওয়াজিব হওয়ায় এটি ছুটে গেলে কাজা করতে হয়। সুবহে সাদিকের পর মনে পড়লে ফজরের আগে বা পরে, নিষিদ্ধ সময় এড়িয়ে, তিন রাকাত বিতর কাজা পড়ে নেবেন, দোয়া কুনুতসহ। অনেকে বিতরকে সাধারণ সুন্নত ভেবে অবহেলা করেন; হানাফি মতে এটি ঠিক নয়। তাই দোয়া কুনুত শুদ্ধ করে মুখস্থ রাখা প্রতিটি নামাজির জন্য জরুরি।
শিশুদের নামাজ শেখানোর সময় সূরা ফাতিহা ও ছোট সূরার পরপরই দোয়া কুনুত শেখানো ভালো। ছোটবেলায় মুখস্থ করা দোয়া সারা জীবন মনে থাকে। প্রতিদিন বিতরে পড়ার কারণে একবার শিখে নিলে আর ভুলে যাওয়ার ভয় থাকে না।
আরেকটি কুনুত: আল্লাহুম্মাহদিনি
বিজ্ঞাপন
আবু দাউদ, তিরমিজি ও নাসায়িতে হাসান ইবনে আলি (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, নবী (সা.) তাঁকে বিতরে পড়ার জন্য একটি দোয়া শিখিয়েছিলেন, যার শুরু আল্লাহুম্মাহদিনি ফিমান হাদাইত, অর্থাৎ হে আল্লাহ, যাদের আপনি হেদায়েত দিয়েছেন, তাদের মধ্যে আমাকেও হেদায়েত দিন। শাফেয়ি ও হাম্বলি মাজহাবের অনুসারীরা সাধারণত এটি পড়েন। হানাফি আলেমরাও বলেছেন, এটি পড়া জায়েজ, কিংবা প্রচলিত দোয়ার সঙ্গে এটিও মিলিয়ে পড়া যায়। এ নিয়ে বিতর্কের কিছু নেই।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
দোয়া কুনুত কেন পড়া হয়?
এটি বিতর নামাজের ওয়াজিব অংশ। নামাজের শেষ ভাগে দাঁড়িয়ে আল্লাহর প্রশংসা, সাহায্য প্রার্থনা ও আনুগত্যের অঙ্গীকার করাই এর উদ্দেশ্য।
বিজ্ঞাপন
বিতর ছাড়া অন্য নামাজে কি দোয়া কুনুত পড়া যায়?
হানাফি মাজহাবে স্বাভাবিক অবস্থায় শুধু বিতরে কুনুত পড়া হয়। মুসলমানদের ওপর বড় বিপদ এলে ফজরের নামাজে কুনুতে নাজেলা পড়ার অনুমতি আছে, যা আলাদা দোয়া।
দোয়া কুনুত কি জোরে পড়তে হয়?
না। ইমাম, মুক্তাদি ও একা নামাজ আদায়কারী সবাই নিচু স্বরে পড়বেন।
বিজ্ঞাপন
কুনুতের আগে হাত তোলা কি জরুরি?
হানাফি মাজহাবে কুনুতের আগে তাকবির বলে কান পর্যন্ত হাত তোলা সুন্নত। ভুলে না তুললে নামাজ নষ্ট হয় না।
দোয়া কুনুত পড়ার সময় হাত বাঁধা থাকবে নাকি মোনাজাতের মতো তোলা থাকবে?
হানাফি মাজহাবে তাকবির বলে হাত তোলার পর আবার নাভির নিচে বেঁধে দোয়া কুনুত পড়া হয়। কিছু মাজহাবে মোনাজাতের মতো হাত তুলে কুনুত পড়ার নিয়ম আছে; এটি মাজহাবগত পার্থক্য, কোনোটিকে ভুল বলার সুযোগ নেই।