দোয়া মাসুরা বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ: নামাজের শেষ বৈঠকে যা পড়বেন
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
নামাজের শেষ বৈঠকে আত্তাহিয়াতু ও দরুদ শরিফ পড়ার পর সালাম ফেরানোর ঠিক আগে যে দোয়াটি পড়া হয়, বাংলাদেশে সেটিকে দোয়া মাসুরা বলা হয়। দোয়াটির শুরু আল্লাহুম্মা ইন্নি জালামতু নাফসি দিয়ে। এতে বান্দা নিজের অসংখ্য ভুল স্বীকার করে আল্লাহর কাছে বিশেষ ক্ষমা ও দয়া চায়।
বিজ্ঞাপন
মাসুরা শব্দের অর্থ বর্ণিত বা হাদিস থেকে প্রাপ্ত। অর্থাৎ নবী (সা.) থেকে বর্ণিত যেকোনো দোয়াকেই মাসুর দোয়া বলা চলে। তবে আমাদের দেশে নামাজ শেখানোর সময় এই নির্দিষ্ট দোয়াটিকে দোয়া মাসুরা নামে শেখানো হয় বলে নামটি এর সঙ্গেই জুড়ে গেছে।
দোয়াটির পটভূমি খুব সুন্দর। বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত, আবু বকর (রা.) নবী (সা.)-কে বললেন, আমাকে এমন একটি দোয়া শিখিয়ে দিন, যা আমি নামাজে পড়ব। তখন নবী (সা.) তাঁকে এই দোয়াটি শিখিয়ে দেন। যিনি উম্মতের শ্রেষ্ঠ মানুষ, তাঁকেই শেখানো হলো বলতে, আমি নিজের ওপর অনেক জুলুম করেছি। এর মধ্যেই আমাদের জন্য বিনয়ের বড় শিক্ষা লুকিয়ে আছে।
দোয়া মাসুরা আরবি
اللَّهُمَّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي ظُلْمًا كَثِيرًا، وَلَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ، فَاغْفِرْ لِي مَغْفِرَةً مِنْ عِنْدِكَ، وَارْحَمْنِي، إِنَّكَ أَنْتَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
বিজ্ঞাপন
বাংলা উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি জালামতু নাফসি জুলমান কাসিরাও, ওয়ালা ইয়াগফিরুজ জুনুবা ইল্লা আনতা, ফাগফিরলি মাগফিরাতাম মিন ইনদিকা, ওয়ারহামনি, ইন্নাকা আনতাল গাফুরুর রাহিম।
অর্থ: হে আল্লাহ, আমি নিজের ওপর অনেক বেশি জুলুম করেছি। আর আপনি ছাড়া গুনাহ ক্ষমা করার কেউ নেই। অতএব আপনার পক্ষ থেকে আমাকে বিশেষ ক্ষমা দান করুন এবং আমার প্রতি দয়া করুন। নিশ্চয়ই আপনি অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
হাদিসের কোনো কোনো বর্ণনায় জুলমান কাসিরা, অর্থাৎ অনেক জুলুম, আবার কোনো বর্ণনায় জুলমান কাবিরা, অর্থাৎ বড় জুলুম শব্দ এসেছে। দুটিই বর্ণিত, যেকোনোটি পড়লে চলবে। আমাদের দেশে কাসিরা শব্দটিই বেশি প্রচলিত।
শব্দে শব্দে অর্থ
বিজ্ঞাপন
অর্থ বুঝে পড়লে নামাজের শেষ মুহূর্তটি অনেক বেশি জীবন্ত হয়ে ওঠে। দোয়াটিকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে দেখা যাক।
১. আল্লাহুম্মা: হে আল্লাহ। সরাসরি আল্লাহকে সম্বোধন দিয়ে শুরু।
২. ইন্নি জালামতু নাফসি: নিশ্চয়ই আমি নিজের প্রতি জুলুম করেছি। ইসলামে গুনাহকে নিজের ওপর জুলুম বলা হয়, কারণ এর ক্ষতি শেষ পর্যন্ত নিজের ঘাড়েই পড়ে।
৩. জুলমান কাসিরা: অনেক বেশি জুলুম। অর্থাৎ আমার ভুল একটি-দুটি নয়, অগণিত।
বিজ্ঞাপন
৪. ওয়ালা ইয়াগফিরুজ জুনুবা ইল্লা আনতা: আর আপনি ছাড়া কেউ গুনাহ ক্ষমা করতে পারে না। এটি তাওহিদের ঘোষণা; ক্ষমার একমাত্র মালিক আল্লাহ।
৫. ফাগফিরলি মাগফিরাতাম মিন ইনদিকা: সুতরাং আপনার নিজের পক্ষ থেকে আমাকে ক্ষমা করুন। আমার আমলের বিনিময়ে নয়, আপনার অনুগ্রহ থেকে।
৬. ওয়ারহামনি: এবং আমার প্রতি দয়া করুন। ক্ষমা মানে অতীতের দাগ মুছে ফেলা, আর দয়া মানে সামনের পথে কল্যাণ।
৭. ইন্নাকা আনতাল গাফুরুর রাহিম: নিশ্চয়ই আপনিই ক্ষমাশীল, দয়ালু। দোয়ার শেষে আল্লাহর এমন দুটি নাম, যা ঠিক এই চাওয়ার সঙ্গে মিলে যায়।
বিজ্ঞাপন
দোয়া মাসুরা কখন পড়তে হয়
যেকোনো নামাজের শেষ বৈঠকে পড়তে হয়, সেটি ফরজ, সুন্নত, ওয়াজিব বা নফল যা-ই হোক। ক্রম হলো: আগে তাশাহুদ বা আত্তাহিয়াতু, তারপর দরুদে ইব্রাহিম, তারপর দোয়া মাসুরা, এরপর সালাম। দুই রাকাতের নামাজে দ্বিতীয় রাকাতের বৈঠকই শেষ বৈঠক, তিন রাকাতের মাগরিব ও বিতরে তৃতীয় রাকাতের পর, আর চার রাকাতের নামাজে চতুর্থ রাকাতের পর। ক্রমটা মনে রাখার সহজ উপায়: আগে আল্লাহর প্রশংসা ও সাক্ষ্য, তারপর নবীর ওপর দরুদ, তারপর নিজের জন্য চাওয়া।
চার রাকাতের নামাজে দ্বিতীয় রাকাতের পরের প্রথম বৈঠকে শুধু তাশাহুদ পড়ে উঠে যেতে হয়। সেখানে দরুদ বা দোয়া মাসুরা পড়া হয় না। ভুলে প্রথম বৈঠকে দরুদ শুরু করে দিলে এবং আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদ পরিমাণ পড়ে ফেললে হানাফি ফকিহদের মতে সাহু সিজদা দিতে হয়, কারণ তৃতীয় রাকাতের জন্য দাঁড়াতে দেরি হয়েছে।
হানাফি মাজহাবে দরুদ ও দোয়া মাসুরা শেষ বৈঠকে পড়া সুন্নত। ভুলে না পড়লে নামাজ নষ্ট হয় না, সাহু সিজদাও লাগে না। তবে ইচ্ছা করে নিয়মিত বাদ দেওয়া সুন্নত ত্যাগের শামিল।
বিজ্ঞাপন
শেষ বৈঠকে আর যেসব দোয়া পড়া যায়
দোয়া মাসুরা ছাড়াও শেষ বৈঠকে কোরআন-হাদিসের অন্য দোয়া পড়া যায়। দুটি উদাহরণ:
মুসলিম শরিফে আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তোমাদের কেউ শেষ তাশাহুদ পড়া শেষ করলে যেন চারটি জিনিস থেকে আল্লাহর আশ্রয় চায়: জাহান্নামের আজাব, কবরের আজাব, জীবন ও মৃত্যুর ফিতনা এবং দাজ্জালের ফিতনার অনিষ্ট। উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিন আজাবি জাহান্নাম, ওয়া মিন আজাবিল কাবরি, ওয়া মিন ফিতনাতিল মাহইয়া ওয়াল মামাত, ওয়া মিন শাররি ফিতনাতিল মাসিহিদ দাজ্জাল।
বাংলাদেশে অনেকে সূরা ইব্রাহিমের ৪০ ও ৪১ নম্বর আয়াতের দোয়াও পড়েন:
বিজ্ঞাপন
رَبِّ اجْعَلْنِي مُقِيمَ الصَّلَاةِ وَمِنْ ذُرِّيَّتِي رَبَّنَا وَتَقَبَّلْ دُعَاءِ، رَبَّنَا اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِلْمُؤْمِنِينَ يَوْمَ يَقُومُ الْحِسَابُ
উচ্চারণ: রাব্বিজআলনি মুকিমাস সালাতি ওয়া মিন জুররিয়্যাতি, রাব্বানা ওয়া তাকাব্বাল দুআ। রাব্বানাগফিরলি ওয়া লিওয়ালিদাইয়া ওয়া লিলমুমিনিনা ইয়াওমা ইয়াকুমুল হিসাব। অর্থ: হে আমার রব, আমাকে ও আমার বংশধরদের নামাজ কায়েমকারী বানান; হে আমাদের রব, আমার দোয়া কবুল করুন। হে আমাদের রব, যেদিন হিসাব হবে, সেদিন আমাকে, আমার মা-বাবাকে এবং সব মুমিনকে ক্ষমা করুন।
একটি সতর্কতা: হানাফি মাজহাবে নামাজের ভেতরে দোয়া হতে হবে কোরআন বা হাদিসের দোয়ার মতো আরবি বাক্যে। মানুষের কাছে যেভাবে দুনিয়াবি জিনিস চাওয়া হয়, সেভাবে নিজের ভাষায় নামাজের ভেতরে কিছু চাওয়া ঠিক নয়। নিজের ভাষার দোয়া সালাম ফেরানোর পর মোনাজাতে করুন।
জামাতে নামাজে দোয়া মাসুরা
বিজ্ঞাপন
জামাতে ইমামের পেছনে মুক্তাদিও শেষ বৈঠকে তাশাহুদ, দরুদ ও দোয়া মাসুরা পড়বেন, নিচু স্বরে। ইমাম সালাম ফেরানোর আগে দোয়া শেষ হয়ে গেলে অন্য কোনো মাসনুন দোয়া পড়তে পারেন। আর দোয়া শেষ হওয়ার আগে ইমাম সালাম ফিরিয়ে ফেললে মুক্তাদি দোয়া সংক্ষেপ করে ইমামের অনুসরণে সালাম ফেরাবেন।
যিনি দেরিতে জামাতে এসেছেন, অর্থাৎ মাসবুক, তিনি ইমামের শেষ বৈঠকে শুধু তাশাহুদ পড়বেন, ধীরে ধীরে, যাতে ইমামের সালাম পর্যন্ত সময় মেলে। দরুদ ও দোয়া মাসুরা তিনি পড়বেন নিজের ছুটে যাওয়া রাকাতগুলো আদায় করার পর, নিজের শেষ বৈঠকে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
দোয়া মাসুরা না পড়লে কি নামাজ হবে?
বিজ্ঞাপন
হবে। এটি শেষ বৈঠকের সুন্নত। ভুলে বাদ পড়লে নামাজ শুদ্ধ, সাহু সিজদারও প্রয়োজন নেই।
দোয়া মাসুরা মুখস্থ না থাকলে কী পড়ব?
যতদিন মুখস্থ না হয়, ততদিন রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাও ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতাও ওয়া কিনা আজাবান নার পড়তে পারেন, বা আল্লাহুম্মাগফিরলি বলতে পারেন। দ্রুত মুখস্থ করার চেষ্টা করুন।
দোয়া মাসুরা কি নামাজের বাইরেও পড়া যায়?
বিজ্ঞাপন
যায়। এটি ক্ষমা প্রার্থনার একটি চমৎকার দোয়া। মোনাজাতে, তাহাজ্জুদের পর বা যেকোনো সময় পড়া যায়।
মেয়েদের জন্য কি দোয়া মাসুরা আলাদা?
না, একই দোয়া। এখানে শব্দগুলো নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য একই রকম, তাই কোনো পরিবর্তন করতে হয় না।
দোয়া মাসুরা কোন হাদিসে আছে?
বিজ্ঞাপন
সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম, দুই গ্রন্থেই আবু বকর (রা.)-এর বর্ণনায় দোয়াটি এসেছে। হাদিসের দুই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সংকলনে থাকায় এর বিশুদ্ধতা নিয়ে কোনো সংশয় নেই। তাই নামাজের শেষ বৈঠকে নিশ্চিন্তে এটি পড়তে পারেন।