নামাজের নিষিদ্ধ সময় কয়টি ও কখন: যে তিন সময়ে নামাজ পড়া যায় না
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
দিনের তিনটি সময়ে কোনো নামাজ পড়া যায় না—ফরজ নয়, সুন্নত নয়, নফল তো নয়ই। প্রথমটি সূর্য ওঠার সময়, যতক্ষণ না সূর্য কিছুটা ওপরে ওঠে। দ্বিতীয়টি ঠিক দুপুরে, যখন সূর্য আকাশের মাঝখানে থাকে। তৃতীয়টি সূর্য ডোবার সময়, যখন সূর্য হলদে হয়ে অস্ত যেতে থাকে।
বিজ্ঞাপন
এই তিন সময়কে বলা হয় নামাজের নিষিদ্ধ সময়। এর বাইরে আরও কিছু সময় আছে, যখন নামাজ পুরোপুরি নিষিদ্ধ নয়, কিন্তু নফল নামাজ পড়া মাকরুহ। যেমন ফজরের ফরজ পড়ার পর থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত এবং আসরের ফরজ পড়ার পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত। দুই ধরনের সময়ের বিধান আলাদা, তাই গুলিয়ে ফেললে ভুল হতে পারে।
নিচে হানাফি মাজহাব অনুযায়ী প্রতিটি সময়ের হিসাব, কোন সময়ে কী করা যায় আর কী যায় না, তা পরিষ্কার করে দেওয়া হলো।
হাদিসে তিন নিষিদ্ধ সময়
মুসলিম শরিফে উকবা ইবনে আমের (রা.) থেকে বর্ণিত:
বিজ্ঞাপন
তিনটি সময় এমন, যখন নবী (সা.) আমাদের নামাজ পড়তে এবং মৃতদের দাফন করতে নিষেধ করতেন: সূর্য যখন উদিত হতে থাকে যতক্ষণ না তা ওপরে ওঠে, দুপুরে সূর্য যখন মাঝ আকাশে থাকে যতক্ষণ না তা হেলে পড়ে, আর সূর্য যখন অস্ত যাওয়ার জন্য ঝুঁকে পড়ে যতক্ষণ না তা ডুবে যায়। (মুসলিম)
এই নিষেধের কারণও হাদিসে এসেছে। মুসলিম শরিফে আমর ইবনে আবাসা (রা.)-এর বর্ণনায় আছে, সূর্য ওঠে ও অস্ত যায় শয়তানের দুই শিংয়ের মাঝখান দিয়ে, আর তখন সূর্যপূজারিরা সূর্যকে সিজদা করে। মুসলমানের ইবাদত যেন কোনোভাবেই তাদের উপাসনার সময়ের সঙ্গে মিলে না যায়, সে জন্যই এই নিষেধ।
তিন নিষিদ্ধ সময় কখন, কতক্ষণ
১. সূর্যোদয়ের সময়: সূর্যের কিনারা দিগন্তে দেখা দেওয়া থেকে শুরু করে সূর্য এক বর্শা পরিমাণ ওপরে ওঠা পর্যন্ত। ফকিহরা এর পরিমাণ সাধারণত পনেরো থেকে বিশ মিনিট ধরেছেন। বাংলাদেশের নামাজের সময়সূচিতে সূর্যোদয়ের সময় দেওয়া থাকে; তার পর আনুমানিক পনেরো-বিশ মিনিট অপেক্ষা করা নিরাপদ।
বিজ্ঞাপন
২. ঠিক দুপুরের সময়: সূর্য যখন আকাশের ঠিক মাঝখানে থাকে, তারপর পশ্চিমে হেলে পড়লেই জোহরের ওয়াক্ত শুরু হয়। এ সময়টি খুব সংক্ষিপ্ত, কয়েক মিনিট মাত্র। সতর্কতার জন্য জোহরের ওয়াক্ত শুরুর আগের কয়েক মিনিট নামাজ না পড়াই ভালো। অনেক ক্যালেন্ডারে এ সময়টি আলাদা করে চিহ্নিত থাকে।
৩. সূর্যাস্তের সময়: সূর্যের আলো হলদে ও নিস্তেজ হয়ে যাওয়া, যখন চোখ ধাঁধায় না, সেই সময় থেকে সূর্য পুরোপুরি ডুবে যাওয়া পর্যন্ত। সাধারণত সূর্যাস্তের আনুমানিক পনেরো-বিশ মিনিট আগে থেকে এ সময় শুরু হয়।
এখানে দেওয়া মিনিটের হিসাব আনুমানিক। ঋতু ও এলাকাভেদে কিছুটা পার্থক্য হয়, তাই ইসলামিক ফাউন্ডেশন বা স্থানীয় মসজিদের সময়সূচি দেখে নেওয়াই উত্তম।
নিষিদ্ধ সময়ে কোন নামাজের কী বিধান
বিজ্ঞাপন
হানাফি মাজহাবে এই তিন সময়ে ফরজ, কাজা, ওয়াজিব, সুন্নত, নফল—কোনো নামাজই শুদ্ধ হয় না। আগে থেকে উপস্থিত লাশের জানাজা এবং আগে পড়া আয়াতের তেলাওয়াতের সিজদাও এ সময় আদায় করা যায় না। তবে দুটি ব্যতিক্রম আছে।
প্রথম ব্যতিক্রম: কেউ কোনো কারণে আসরের নামাজ এত দেরি করে ফেলেছেন যে সূর্য হলদে হয়ে গেছে। তিনি সেদিনের আসর তখনও পড়ে নেবেন, নামাজ হয়ে যাবে। তবে এত দেরি করা মাকরুহ, আর অভ্যাসে পরিণত হলে গুনাহ।
দ্বিতীয় ব্যতিক্রম: ঠিক নিষিদ্ধ সময়েই কোনো লাশ উপস্থিত করা হলে তখনই জানাজা পড়া যায়। একইভাবে ঠিক ওই সময়ে কোনো সিজদার আয়াত তেলাওয়াত করলে তখনই সিজদা দেওয়া যায়, যদিও পরে দেওয়া উত্তম।
ফজরের নামাজ পড়তে পড়তে সূর্য উঠে গেলে হানাফি মতে সে নামাজ নষ্ট হয়ে যায়। সূর্য ওপরে ওঠার পর তা কাজা হিসেবে আবার পড়তে হয়। তাই ফজর যেন সূর্যোদয়ের যথেষ্ট আগে শুরু করা হয়।
বিজ্ঞাপন
যে সময়ে শুধু নফল নামাজ মাকরুহ
এবার দ্বিতীয় ধরনের সময়গুলো, যখন ফরজ বা কাজা পড়া যায়, কিন্তু নফল ও সাধারণ সুন্নত পড়া মাকরুহ:
১. ফজরের ফরজের পর: ফজরের ফরজ পড়ার পর থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত নফল পড়া মাকরুহ। তবে কাজা নামাজ, জানাজা ও তেলাওয়াতের সিজদা আদায় করা যায়।
২. আসরের ফরজের পর: আসরের ফরজ পড়ার পর থেকে সূর্য হলদে হওয়া পর্যন্ত নফল মাকরুহ, তবে কাজা পড়া যায়। এরপর তো সূর্যাস্তের নিষিদ্ধ সময় শুরু হয়ে যায়।
বিজ্ঞাপন
৩. সুবহে সাদিকের পর ফজরের আগে: ফজরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার পর শুধু ফজরের দুই রাকাত সুন্নত পড়া যায়। আলাদা নফল পড়া মাকরুহ।
৪. জুমার খুতবার সময়: ইমাম খুতবার জন্য বের হওয়ার পর থেকে নামাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত নফল পড়া হানাফি মতে মাকরুহ।
৫. ঈদের নামাজের আগে: ঈদের দিন ঈদের নামাজের আগে ঘরে বা ঈদগাহে নফল পড়া মাকরুহ, আর নামাজের পর ঈদগাহে নফল পড়া মাকরুহ।
৬. সূর্যাস্তের পর মাগরিবের আগে: মাগরিবের ফরজ দেরি হয়ে যায় বলে এ সময় নফল পড়া হানাফি মাজহাবে অপছন্দনীয়।
বিজ্ঞাপন
নিষিদ্ধ সময়ে কোরআন পড়া ও অন্য ইবাদত
নিষিদ্ধ সময়গুলো শুধু নামাজের জন্য। এ সময় কোরআন তেলাওয়াত, জিকির, দরুদ, দোয়া, ইস্তিগফার সবই করা যায়। তবে হানাফি ফকিহদের অনেকে বলেছেন, সূর্যোদয়, দুপুর ও সূর্যাস্তের তিন সময়ে তেলাওয়াতের চেয়ে জিকির, দরুদ ও দোয়ায় ব্যস্ত থাকা উত্তম। তেলাওয়াত নিষিদ্ধ নয়, শুধু উত্তম-অনুত্তমের প্রশ্ন।
ফজরের পর সূর্যোদয় পর্যন্ত সময়টা বরং জিকির ও তেলাওয়াতের জন্য খুব বরকতময়। অনেকে এই সময়ে সকালের মাসনুন দোয়াগুলো পড়েন, তারপর সূর্য ওপরে উঠলে ইশরাকের নামাজ পড়েন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিজ্ঞাপন
নিষিদ্ধ সময়ে নামাজ পড়লে কী হয়?
তিন নিষিদ্ধ সময়ে পড়া ফরজ বা কাজা নামাজ শুদ্ধ হয় না, আবার পড়তে হবে। নফল শুরু করে ফেললে তা ভেঙে দিয়ে পরে উপযুক্ত সময়ে আদায় করা উচিত বলে হানাফি ফকিহরা বলেছেন।
জোহরের আগে নিষিদ্ধ সময় কতক্ষণ?
ঠিক মধ্যাহ্নের সময়টি কয়েক মিনিটের। স্থানীয় সময়সূচিতে জোহরের ওয়াক্ত শুরুর যে সময় দেওয়া আছে, তার আগের আনুমানিক পাঁচ-দশ মিনিট নামাজ না পড়লে নিরাপদ থাকবেন।
বিজ্ঞাপন
আসরের পর কাজা নামাজ পড়া যায় কি?
হ্যাঁ। আসরের ফরজের পর থেকে সূর্য হলদে হওয়ার আগ পর্যন্ত কাজা নামাজ পড়া যায়। শুধু নফল পড়া মাকরুহ।
ফজরের সুন্নত ছুটে গেলে ফরজের পরপর পড়া যাবে কি?
হানাফি মাজহাবে ফজরের ফরজের পর সূর্যোদয়ের আগে সুন্নত পড়া হয় না। সূর্য ওপরে ওঠার পর থেকে দুপুরের আগ পর্যন্ত পড়ে নেওয়া উত্তম।
বিজ্ঞাপন
রমজানে ইফতারের আগে আসর পড়তে দেরি হয়ে গেলে কী করব?
ইফতারের প্রস্তুতিতে অনেকের আসর দেরি হয়ে যায়। সূর্য হলদে হওয়ার আগেই আসর পড়ে নেওয়ার চেষ্টা করুন। একান্ত দেরি হয়ে গেলে সূর্য ডোবার আগে সেদিনের আসর পড়ে নিন, তবে এভাবে দেরি করার অভ্যাস বাদ দিন।
সূর্য ডোবার পর কি সঙ্গে সঙ্গে নামাজ পড়া যায়?
হ্যাঁ। সূর্য পুরোপুরি ডুবে গেলেই নিষিদ্ধ সময় শেষ, মাগরিবের ওয়াক্ত শুরু। তখন দেরি না করে মাগরিবের ফরজ পড়ে নেওয়াই সুন্নত।