সাহু সিজদার নিয়ম: কখন ওয়াজিব হয় ও কীভাবে দিতে হয়
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
নামাজে মন অন্য দিকে চলে যাওয়া মানুষের স্বাভাবিক দুর্বলতা। নবী (সা.)-এরও নামাজে ভুল হয়েছিল, আর সেখান থেকেই উম্মত শিখেছে সাহু সিজদার নিয়ম। সাহু মানে ভুল। নামাজে নির্দিষ্ট কিছু ভুল হলে শেষে অতিরিক্ত দুটি সিজদা দিয়ে সেই ঘাটতি পূরণ করা হয়, একেই সাহু সিজদা বলে।
বিজ্ঞাপন
হানাফি মাজহাবে সাহু সিজদা ওয়াজিব হয় তিন অবস্থায়: নামাজের কোনো ওয়াজিব ভুলে ছুটে গেলে, কোনো ফরজ বা ওয়াজিব আদায়ে ভুলবশত দেরি হলে, অথবা কোনো ফরজ বা ওয়াজিব আগে-পরে হয়ে গেলে বা দুবার করা হলে। দেওয়ার পদ্ধতি হলো, শেষ বৈঠকে শুধু তাশাহুদ পড়ে ডান দিকে এক সালাম ফেরানো, তারপর দুটি সিজদা দেওয়া, তারপর বসে আবার তাশাহুদ, দরুদ ও দোয়া পড়ে দুই দিকে সালাম ফেরানো।
মনে রাখার মতো একটি মূল কথা: সাহু সিজদা শুধু ভুলের জন্য। ইচ্ছা করে কোনো ওয়াজিব বাদ দিলে সাহু সিজদায় তা পূরণ হয় না, আর কোনো ফরজ বাদ পড়লে তো নামাজই হয় না।
হাদিসে সাহু সিজদা
বুখারি ও মুসলিমে আবদুল্লাহ ইবনে বুহাইনা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) এক জোহরের নামাজে দুই রাকাতের পর না বসে দাঁড়িয়ে যান। নামাজ শেষের দিকে তিনি দুটি সিজদা দেন। আরেকটি প্রসিদ্ধ ঘটনায় তিনি চার রাকাতের নামাজ দুই রাকাতে সালাম ফিরিয়ে ফেলেছিলেন; সাহাবি জুল ইয়াদাইন (রা.) মনে করিয়ে দিলে তিনি বাকি নামাজ পূর্ণ করে সাহু সিজদা দেন (বুখারি, মুসলিম)।
বিজ্ঞাপন
সাহু সিজদা সালামের আগে না পরে, এ নিয়ে মাজহাবগুলোর মধ্যে মতভেদ আছে, কারণ হাদিসে দুই রকম বর্ণনাই এসেছে। হানাফি মাজহাব সালামের পরে দেওয়ার মত গ্রহণ করেছে, আবু দাউদে বর্ণিত সাওবান (রা.)-এর হাদিসের ভিত্তিতে, যেখানে প্রতিটি ভুলের জন্য সালামের পর দুটি সিজদার কথা আছে। শাফেয়ি মাজহাবে সাধারণত সালামের আগে দেওয়া হয়। দুটিই দলিলভিত্তিক।
সাহু সিজদা দেওয়ার পদ্ধতি
১. শেষ বৈঠকে তাশাহুদ: শেষ রাকাতের পর বসে আত্তাহিয়াতু পড়ুন, আবদুহু ওয়া রাসুলুহু পর্যন্ত।
২. ডান দিকে এক সালাম: শুধু ডান দিকে আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ বলে সালাম ফেরান। হানাফি ফকিহদের অনেকে এক সালামের কথা বলেছেন, আর এটিই বাংলাদেশে প্রচলিত।
বিজ্ঞাপন
৩. দুটি সিজদা: আল্লাহু আকবার বলে সিজদায় যান, সাধারণ সিজদার মতো তিনবার সুবহানা রাব্বিয়াল আলা পড়ুন। তাকবির বলে বসুন, আবার তাকবির বলে দ্বিতীয় সিজদা দিন।
৪. আবার বৈঠক: দ্বিতীয় সিজদার পর বসে আবার তাশাহুদ, তারপর দরুদে ইব্রাহিম ও দোয়া মাসুরা পড়ুন।
৫. দুই দিকে সালাম: স্বাভাবিক নিয়মে ডানে ও বাঁয়ে সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করুন।
কেউ ভুলে প্রথমবারেই তাশাহুদের সঙ্গে দরুদ ও দোয়া পড়ে ফেললেও সমস্যা নেই। সালাম ফিরিয়ে সাহু সিজদা দিয়ে আবার তাশাহুদ, দরুদ ও দোয়া পড়বেন।
বিজ্ঞাপন
যেসব ভুলে সাহু সিজদা ওয়াজিব হয়
সাধারণত যে ভুলগুলো বেশি হয়:
১. প্রথম বৈঠক ভুলে যাওয়া: তিন বা চার রাকাতের নামাজে দ্বিতীয় রাকাতের পর না বসে দাঁড়িয়ে গেলে। পুরো সোজা হওয়ার আগে মনে পড়লে বসে যাবেন; পুরো দাঁড়িয়ে গেলে আর ফিরবেন না, শেষে সাহু সিজদা দেবেন।
২. সূরা ফাতিহা বাদ পড়া: ফরজের প্রথম দুই রাকাতে বা সুন্নত-নফলের যেকোনো রাকাতে ফাতিহা পড়তে ভুলে গেলে।
বিজ্ঞাপন
৩. সূরা মেলাতে ভুলে যাওয়া: ফরজের প্রথম দুই রাকাতে কিংবা সুন্নত, নফল ও বিতরের যেকোনো রাকাতে ফাতিহার পর সূরা না মেলালে।
৪. ফাতিহার আগে সূরা পড়া: ক্রম উল্টে গেলে, অর্থাৎ আগে অন্য সূরা, পরে ফাতিহা।
৫. একটি রুকন দুবার করা: যেমন কোনো রাকাতে ভুলে তিনটি সিজদা দেওয়া বা দুবার রুকু করা।
৬. দোয়া কুনুত ভুলে যাওয়া: বিতরের তৃতীয় রাকাতে কুনুত না পড়ে রুকুতে চলে গেলে।
বিজ্ঞাপন
৭. চিন্তায় দেরি: নামাজের মাঝে কোনো কিছু ভাবতে গিয়ে এক রুকন, অর্থাৎ তিনবার সুবহানাল্লাহ বলার মতো সময় চুপ থেকে দেরি করা।
৮. জোরে-আস্তের ভুল: ইমাম যদি নিচু স্বরের নামাজে উচ্চ স্বরে বা উচ্চ স্বরের নামাজে নিচু স্বরে অন্তত ছোট এক আয়াত পরিমাণ পড়ে ফেলেন।
৯. ঈদের অতিরিক্ত তাকবির বাদ পড়া: ঈদের নামাজের ছয় তাকবিরের কোনোটি ছুটে গেলে।
এক নামাজে একাধিক ভুল হলেও সাহু সিজদা একবারই দিতে হয়।
বিজ্ঞাপন
যেসব ক্ষেত্রে সাহু সিজদা লাগে না
সুন্নত বা মুস্তাহাব ছুটে গেলে সাহু সিজদা লাগে না। যেমন সানা না পড়া, রুকু-সিজদার তাসবিহ তিনবারের কম পড়া, দরুদ বা দোয়া মাসুরা না পড়া। ফরজের তৃতীয় ও চতুর্থ রাকাতে ভুলে সূরা মিলিয়ে ফেললেও সাহু সিজদা লাগে না।
জামাতে মুক্তাদির নিজের ভুলের জন্য সাহু সিজদা নেই, ইমামের অনুসরণই যথেষ্ট। তবে ইমাম সাহু সিজদা দিলে মুক্তাদিদেরও তাঁর সঙ্গে দিতে হবে। মাসবুক, অর্থাৎ যিনি দেরিতে এসেছেন, তিনি ইমামের সঙ্গে সাহু সিজদা দেবেন, তারপর নিজের বাকি রাকাতগুলো আদায় করবেন।
রাকাত নিয়ে সন্দেহ ও বড় ভুল হলে
বিজ্ঞাপন
তিন রাকাত পড়েছি নাকি চার, এমন সন্দেহ জীবনে প্রথমবার বা কালেভদ্রে হলে হানাফি মাজহাবে নামাজ নতুন করে পড়ার কথা বলা হয়েছে। যাঁর প্রায়ই এমন সন্দেহ হয়, তিনি একটু ভেবে যেদিকে মন বেশি সায় দেয়, সেটি ধরে নামাজ শেষ করবেন। আর কোনো দিকেই মন না ঝুঁকলে কম সংখ্যাটি ধরবেন, প্রতিটি সম্ভাব্য শেষ রাকাতে বসবেন এবং শেষে সাহু সিজদা দেবেন।
কোনো রাকাতের একটি সিজদা ভুলে গেলে নামাজের ভেতরে যখনই মনে পড়ুক, এমনকি শেষ বৈঠকে বসেও, তখনই সিজদাটি আদায় করে নিন। তারপর আবার বৈঠক করে তাশাহুদ পড়ুন এবং শেষে সাহু সিজদা দিন। হানাফি ফিকহে এ সুযোগ আছে।
চার রাকাতের ফরজে চতুর্থ রাকাতের পর না বসে ভুলে পঞ্চম রাকাতের জন্য দাঁড়িয়ে গেলে, পঞ্চম রাকাতের সিজদার আগে মনে পড়ামাত্র বসে যাবেন এবং সাহু সিজদা দেবেন। আর চতুর্থ রাকাতে শেষ বৈঠক করার পর ভুলে দাঁড়িয়ে পঞ্চম রাকাতের সিজদাও দিয়ে ফেললে আরেক রাকাত মিলিয়ে ছয় রাকাত পূর্ণ করবেন এবং সাহু সিজদা দেবেন। এতে ফরজ আদায় হয়ে যাবে, অতিরিক্ত দুই রাকাত নফল হবে। কিন্তু চতুর্থ রাকাতে না বসেই পঞ্চম রাকাতের সিজদা দিয়ে ফেললে ফরজ আর থাকে না; ফরজ নামাজটি আবার পড়তে হবে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিজ্ঞাপন
সাহু সিজদা দিতে ভুলে গেলে করণীয় কী?
সালাম ফেরানোর পর কথা বলা, কিবলা থেকে ঘুরে যাওয়া বা মসজিদ থেকে বের হওয়ার মতো কিছু না করে থাকলে তখনই সাহু সিজদা দিয়ে নিন। এসব করে ফেললে ওয়াক্তের মধ্যে নামাজটি আবার পড়ে নেওয়া উচিত।
সাহু সিজদা কি দুই দিকে সালাম ফিরিয়ে দিতে হয়?
বাংলাদেশে প্রচলিত ও অনেক হানাফি ফকিহের মত হলো ডান দিকে এক সালাম। কোনো কোনো হানাফি আলেম দুই সালামের কথাও বলেছেন। যেকোনোটিতে সাহু সিজদা আদায় হয়ে যায়।
বিজ্ঞাপন
নফল নামাজেও কি সাহু সিজদা আছে?
হ্যাঁ। ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত, নফল সব নামাজেই একই নিয়ম।