রোজার নিয়ত আরবি ও বাংলা উচ্চারণ: কখন ও কীভাবে নিয়ত করবেন
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
রোজার নিয়ত নিয়ে সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা হলো, নির্দিষ্ট আরবি বাক্য মুখে না বললে বুঝি রোজা হয় না। আসলে নিয়ত মানে মনের সংকল্প। আগামীকাল রোজা রাখব, এ কথা মনে স্থির থাকলেই নিয়ত হয়ে যায়। রোজা রাখার উদ্দেশ্যে শেষ রাতে উঠে সেহরি খাওয়াটাই একটি পূর্ণাঙ্গ নিয়ত।
বিজ্ঞাপন
হানাফি মাজহাবে রমজানের রোজার নিয়ত আগের দিন সূর্যাস্তের পর থেকে শুরু করে পরদিন দুপুরের আগ পর্যন্ত করা যায়, যদি এর মধ্যে কিছু খাওয়া-দাওয়া না করা হয়। প্রতিদিনের রোজার জন্য আলাদা নিয়ত দরকার, কারণ প্রতিটি দিনের রোজা আলাদা ইবাদত।
তবু আমাদের দেশে একটি আরবি নিয়ত বহুল প্রচলিত, যা অনেক ক্যালেন্ডার ও বইয়ে ছাপা থাকে। কেউ মনোযোগের জন্য তা মুখে বলতে চাইলে বলতে পারেন। নিচে সেটি উচ্চারণ ও অর্থসহ দেওয়া হলো, সঙ্গে আছে নিয়তের সময় ও বিভিন্ন রোজার আলাদা নিয়ম।
রোজার প্রচলিত আরবি নিয়ত
نَوَيْتُ أَنْ أَصُومَ غَدًا مِنْ شَهْرِ رَمَضَانَ الْمُبَارَكِ فَرْضًا لَكَ يَا اللَّهُ فَتَقَبَّلْ مِنِّي إِنَّكَ أَنْتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
বিজ্ঞাপন
বাংলা উচ্চারণ: নাওয়াইতু আন আসুমা গাদাম মিন শাহরি রামাদানাল মুবারাকি ফারদাল লাকা ইয়া আল্লাহু ফাতাকাব্বাল মিন্নি ইন্নাকা আনতাস সামিউল আলিম।
অর্থ: আমি আগামীকাল পবিত্র রমজান মাসের ফরজ রোজা রাখার নিয়ত করছি, হে আল্লাহ, আপনার জন্য। অতএব আমার পক্ষ থেকে তা কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।
একটি বিষয় স্পষ্ট জানা দরকার। এই বাক্যগুলো নবী (সা.) বা সাহাবিদের থেকে বর্ণিত কোনো দোয়া নয়। পরবর্তী সময়ে মানুষের সুবিধার জন্য এটি প্রচলিত হয়েছে। অর্থ ঠিক আছে বলে পড়তে দোষ নেই, কিন্তু একে সুন্নত বা জরুরি মনে করার সুযোগ নেই। বাংলায় মনে মনে বললেও একই কাজ হবে: আমি আগামীকাল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য রমজানের ফরজ রোজা রাখার নিয়ত করছি।
নিয়ত কখন করতে হয়
বিজ্ঞাপন
রমজানের রোজা, নির্দিষ্ট দিনের মানতের রোজা ও নফল রোজার নিয়ত হানাফি মাজহাবে আগের রাত থেকে পরদিন শরয়ি দুপুরের আগ পর্যন্ত করা যায়। শরয়ি দুপুর মানে সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের ঠিক মাঝখান।
একটি উদাহরণ নিন। কোনো দিন সুবহে সাদিক ভোর চারটায় আর সূর্যাস্ত সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় হলে দিনের মোট দৈর্ঘ্য সাড়ে চৌদ্দ ঘণ্টা। এর অর্ধেক সোয়া সাত ঘণ্টা। তাহলে শরয়ি দুপুর বেলা সোয়া এগারোটা। এর আগে, কিছু না খেয়ে থাকলে, নিয়ত করা যাবে। অর্থাৎ কেউ ঘুম থেকে দেরিতে উঠে দেখলেন সেহরির সময় পেরিয়ে গেছে, তিনি কিছু না খেয়ে থাকলে তখনই নিয়ত করে রোজা রাখতে পারবেন।
তবে কাজা রোজা, কাফফারার রোজা ও নির্দিষ্ট দিন ঠিক না করা মানতের রোজার নিয়ত অবশ্যই সুবহে সাদিকের আগে করতে হবে। দিনের বেলা নিয়ত করলে এগুলো আদায় হয় না, নফল হয়ে যায়।
এ বিষয়ে মাজহাবগুলোর মধ্যে মতভেদ আছে। আবু দাউদ, তিরমিজি ও নাসায়িতে হাফসা (রা.)-এর বর্ণনায় আছে, যে ফজরের আগে রোজার নিয়ত করে না, তার রোজা নেই। শাফেয়ি ও হাম্বলি মাজহাব এর ভিত্তিতে রমজানের রোজার নিয়তও রাতেই জরুরি বলেছে। হানাফি মাজহাব আশুরার রোজা সংক্রান্ত বুখারির একটি হাদিস ও অন্যান্য দলিলের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট রোজায় দুপুরের আগ পর্যন্ত সুযোগ দিয়েছে। সাবধানতার জন্য রাতেই নিয়ত করে ফেলা সবার জন্য উত্তম।
বিজ্ঞাপন
বিভিন্ন রোজার নিয়ত
১. রমজানের রোজা: মনে মনে, আমি আগামীকাল রমজানের ফরজ রোজা রাখছি। শুধু রোজা রাখছি বললেও রমজানে তা রমজানের রোজা হিসেবেই গণ্য হয়।
২. কাজা রোজা: আমি রমজানের একটি কাজা রোজা রাখছি। রাতেই নিয়ত করতে হবে।
৩. নফল রোজা: সোমবার-বৃহস্পতিবার, আইয়ামে বিজ বা আশুরার মতো নফল রোজার জন্য শুধু রোজা রাখার সংকল্পই যথেষ্ট। দুপুরের আগে পর্যন্ত করা যায়।
বিজ্ঞাপন
৪. মানতের রোজা: কোন মানতের রোজা, তা নির্দিষ্ট করে নিয়ত করতে হবে।
নিয়ত নিয়ে আরও কয়েকটি মাসআলা
রাতে নিয়ত করার পর সুবহে সাদিকের আগে খাওয়া-দাওয়া করলে নিয়ত নষ্ট হয় না। কারণ সুবহে সাদিক পর্যন্ত পানাহার বৈধ, রোজা শুরু হয় তার পর থেকে।
কোনো নারীর ঋতুস্রাব সুবহে সাদিকের আগে বন্ধ হয়ে গেলে তিনি রোজার নিয়ত করবেন এবং রোজা রাখবেন, গোসল সুবহে সাদিকের পরে করলেও রোজা হয়ে যাবে। কিন্তু সুবহে সাদিকের পর বন্ধ হলে সেদিনের রোজা হবে না; তবে রমজানের সম্মানে দিনের বাকি সময় পানাহার থেকে বিরত থাকবেন এবং পরে কাজা করবেন।
বিজ্ঞাপন
মুসাফির বা অসুস্থ ব্যক্তি রোজা না রাখার সুযোগ পেলেও নিয়ত করে রোজা রাখলে তাঁর রোজা শুদ্ধ হবে। আবার সকালে সফর থেকে ফিরে এলে বা সুস্থ হয়ে উঠলে, আর ততক্ষণে কিছু না খেয়ে থাকলে, দুপুরের আগে নিয়ত করে রোজা রাখতে পারবেন।
শিশুদের রোজায় অভ্যস্ত করার সময় তাদেরও নিয়তের ধারণা দিন। নিয়ত মানে মনে মনে বলা, আল্লাহর জন্য রোজা রাখছি। এই সহজ ব্যাখ্যা শিশুরাও বোঝে এবং ইবাদতে আন্তরিকতার শিক্ষা পায়।
সেহরির দোয়া বলে কিছু আছে কি
সেহরি খাওয়ার জন্য আলাদা কোনো নির্দিষ্ট দোয়া হাদিসে বর্ণিত হয়নি। মানুষ যেটিকে সেহরির দোয়া বলে, সেটি আসলে ওপরের প্রচলিত নিয়ত। সেহরিতে খাওয়ার শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা আর শেষে আলহামদুলিল্লাহ বলাই সুন্নত, যেমন অন্য যেকোনো খাবারে।
বিজ্ঞাপন
তবে সেহরি খাওয়াটাই একটি সুন্নত ও বরকতের কাজ। বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেছেন, তোমরা সেহরি খাও, কেননা সেহরিতে বরকত আছে। মুসলিম শরিফের আরেক হাদিসে আছে, আমাদের রোজা ও আহলে কিতাবের রোজার পার্থক্য হলো সেহরি খাওয়া। ক্ষুধা না থাকলেও কয়েকটি খেজুর বা এক গ্লাস পানি দিয়ে হলেও সেহরি করা ভালো।
সেহরি শেষ সময়ের কাছাকাছি খাওয়া সুন্নত। বুখারিতে জায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) বলেছেন, তাঁরা নবী (সা.)-এর সঙ্গে সেহরি খেয়ে নামাজে দাঁড়াতেন, আর দুইয়ের মাঝে প্রায় পঞ্চাশ আয়াত তেলাওয়াতের মতো সময় থাকত। তবে একেবারে শেষ মিনিট পর্যন্ত খেতে থাকলে সময় পেরিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। ক্যালেন্ডারের সেহরির শেষ সময়ের কয়েক মিনিট আগে খাওয়া শেষ করুন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
পুরো রমজানের জন্য কি একবার নিয়ত করলেই হয়?
বিজ্ঞাপন
মালেকি মাজহাবে মাসের শুরুতে একবার নিয়ত যথেষ্ট বলা হয়েছে। কিন্তু হানাফি মাজহাবে প্রতিদিনের রোজার জন্য আলাদা নিয়ত দরকার। সেহরি খেলেই সে নিয়ত হয়ে যায়, তাই বিষয়টি কঠিন কিছু নয়।
সেহরি খেতে না পারলে কি রোজা হবে?
হবে। সেহরি সুন্নত, রোজা শুদ্ধ হওয়ার শর্ত নয়। ঘুম থেকে উঠতে না পারলে দুপুরের আগে নিয়ত করে রোজা রেখে দিন।
মুখে নিয়ত না বললে কি রোজা হবে?
বিজ্ঞাপন
অবশ্যই হবে। নিয়ত অন্তরের কাজ। মুখে বলা ঐচ্ছিক।
নফল রোজার নিয়ত কি সকালে করা যায়?
যায়। মুসলিম শরিফে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) একদিন সকালে ঘরে এসে জিজ্ঞেস করলেন, খাবার কিছু আছে? না থাকায় তিনি বললেন, তাহলে আমি রোজা রাখলাম। তাই সকালে কিছু না খেয়ে থাকলে দুপুরের আগে নফল রোজার নিয়ত করা যায়।
সেহরির সময় আজান শুনে খাওয়া বন্ধ করব?
বিজ্ঞাপন
আজান সাধারণত সুবহে সাদিকের পরে দেওয়া হয়। তাই আজান পর্যন্ত খাওয়ার অপেক্ষা না করে ক্যালেন্ডারে দেওয়া সেহরির শেষ সময় মেনে চলুন।