কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে ৩৮০টি প্রতিমা ৪৫ মিনিটে বিসর্জন, লাখো দর্শক
দেবী দুর্গা বিদায়বেলায় পাঁচ কিলোমিটার তটে সমাবেশ
কক্সবাজার জেলা প্রতিনিধি · কক্সবাজার
প্রকাশ:
বিকাল দুইটায় কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের লাবণী পয়েন্টে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা সমাবেশ করতে শুরু করেন। ট্রাক ও ভ্যানে নিয়ে আসা প্রতিমাগুলো দলবদ্ধভাবে কাঁধে বা ভ্যানে নিয়ে সৈকতের বালুচরে পৌঁছায়। বিকেল চারটায় মঞ্চের সামনে বিশাল বালুচরে কয়েক শোয়তানিক প্রতিমা সাজানো হয়। একই সময়ে মঞ্চে অতিথিদের বক্তব্য শোনা যায়, আর ভক্তরা শেষ মুহূর্তের পূজা-অর্চনা চালিয়ে যান।
বিজ্ঞাপন
দেবী দুর্গার বিদায়বেলায় লাবণী, সিগাল, সুগন্ধা ও কলাতলী—সৈকতের প্রায় পাঁচ কিলোমিটার জুড়ে—বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হয়। আয়োজকদের মতে, মোট দর্শনার্থীর সংখ্যা তিন লাখের বেশি। বিকেল পাঁচটায় শহরের প্রাচীন সরস্বতীবাড়ি মন্দিরের পুরোহিত রানা ভট্টাচার্য মঞ্চে মন্ত্রপাঠ করেন। এরপর বিকেল ৫:০৯ মিনিটে বঙ্গোপসাগরে প্রতিমা বিসর্জন শুরু হয়, এবং ৪৫ মিনিটের মধ্যে ৩৮০টি প্রতিমা একে একে বিসর্জিত হয়।
কক্সবাজার জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি উদয় শংকর পাল প্রথম আলোকে জানান, গত বছরের মতোই এই বছরও বিসর্জন উৎসব শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে এবং এটি কক্সবাজারকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির শহর হিসেবে প্রমাণ করে। তিনি জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন উল্লেখ করেন, সমুদ্রসৈকতকে ঘিরে সরকার পরিবেশ সংরক্ষণ ও আকর্ষণীয়তা বৃদ্ধির জন্য নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে।
কক্সবাজার জেলায় মোট ৩২৪টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে, যার মধ্যে ১৫৫টি মণ্ডপে প্রতিমাপূজা এবং ১৬৯টি মণ্ডপে ঘটপূজা হয়েছে। চকরিয়া উপজেলায় সর্বোচ্চ ৭১টি মণ্ডপ, কুতুবদিয়া ৪৪টি, রামু ৩৭টি, কক্সবাজার সাদরে ৩১টি, ঈদগাঁওয়ে ২৯টি, মহেশখালীতে ২৮টি, কক্সবাজার পৌরসভায় ২৬টি, চকরিয়া পৌরসভায় ২৫টি, পেকুয়ায় ৯টি, উখিয়ায় ৯টি, মহেশখালী পৌরসভায় ৬টি এবং টেকনাফে ৬টি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বিজয়া দশমীর আনুষ্ঠানিকতা শেষে কক্সবাজার শহর, সদর উপজেলা, উখিয়া, টেকনাফ, রামু ও ঈদগাঁওয়ের বিভিন্ন মণ্ডপ থেকে প্রতিমা সৈকতে আনা হয়। মন্ত্রপাঠ, ঘণ্টা, ঢাক, ধূপ ও ফুলের অঞ্জলিতে দেবীকে বিদায় জানিয়ে ভক্তরা শেষ পূজা-অর্চনা সম্পন্ন করেন, যেখানে সিঁদুর খেলায় অংশগ্রহণকারীরা কপালের ওপর ও পায়ে সিঁদুর ছুঁইয়েও প্রণাম করেন। শহরের বৈদ্যঘোনার বাসিন্দা বিশ্বজিৎ পাল বলেন, দেবীর বিদায়ে মন খারাপ হলেও উৎসবের আনন্দ সবাই ভাগাভাগি করে নিয়েছেন। তাঁরা জগতের সব মানুষের মঙ্গল কামনা করেন। ঘোনাপাড়ার কলেজছাত্রী আলপনা দাশ বলেন, লাখো মানুষের উপস্থিতিতে মাকে বিদায় জানাতে পেরে তিনি শান্তি পেয়েছেন। তবে মা চলে যাওয়ায় মন ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েছে।
বিজ্ঞাপন
প্রতিমা বিসর্জন উৎসবের নিরাপত্তা ব্যবস্থা হিসেবে সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি ও আনসারসহ বিভিন্ন বাহিনী সমন্বিতভাবে কাজ করে, যা সন্ধ্যা ছয়টার আগে ৪৫ মিনিটে ৩৮০টি প্রতিমা বিসর্জন সম্পন্ন করার সুযোগ করে দেয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী, লুৎফর রহমান কাজল, শামীম আরা স্বপ্না, জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ জসিম উদ্দিন, পুলিশ সুপার এ এম সাজেদুর রহমান, রামকৃষ্ণ মিশন কক্সবাজারের সভাপতি সোমেশ্বর চক্রবর্তী, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি দোলন ধর ও দীপক শর্মা উপস্থিত ছিলেন। সভাপতি উদয় শংকর পাল অনুষ্ঠানের নেতৃত্ব দেন, আর পরিষদের সাধারণ সম্পাদক স্বপন দাশ সঞ্চালনা করেন।