শব্দের ফাঁদে এডিস মশা শনাক্ত করবে এআই, ঢাবি গবেষকদের যন্ত্র
পরীক্ষাগারে শব্দযুক্ত ফাঁদে নীরব ফাঁদের তুলনায় পাঁচ গুণ বেশি এডিস মশা ধরা পড়েছে
ঢাকা জেলা প্রতিনিধি · ঢাকা
প্রকাশ:
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) গবেষকেরা এমন একটি যন্ত্র বানিয়েছেন, যা শব্দ দিয়ে এডিস মশাকে কাছে টেনে ছবি তোলে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সাহায্যে সেগুলো শনাক্ত ও গণনা করে। ‘মাস্ট-ক্লাউডনেট’ নামের এই প্রযুক্তি ডেঙ্গুর বাহক এডিসের বিস্তার নজরে রাখা সহজ করতে পারে বলে গবেষকদের ধারণা।
বিজ্ঞাপন
তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল এবং প্রাণিবিদ্যা বিভাগের গবেষকেরা যৌথভাবে যন্ত্রটি তৈরি করেছেন। যন্ত্রের ক্যামেরা ফাঁদে আটকা পড়া মশার ছবি তুলে ইন্টারনেটে ক্লাউডভিত্তিক এআই ব্যবস্থায় পাঠায়। সেখানে এআই ছবি বিশ্লেষণ করে এডিস মশা চিনে নেয় ও গুনে ফেলে।
চলতি পদ্ধতিতে ফাঁদ থেকে মশা তুলে পরীক্ষাগারে আলাদা করে এডিস বাছাই করতে হয়, যা সময়সাপেক্ষ ও শ্রমনির্ভর। নতুন যন্ত্র এ কাজ স্বয়ংক্রিয় করেছে। স্ত্রী মশার ডানার ঝাপটার মতো শব্দ তৈরি করে যন্ত্রটি পুরুষ এডিস মশাকে টানে। পরীক্ষাগারে শব্দযুক্ত ফাঁদে নীরব ফাঁদের চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি এডিস মশা ধরা পড়ে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তিন দিনের প্রাথমিক মাঠপরীক্ষায় শব্দযুক্ত যন্ত্রে ধরা পড়ে ৪৯টি এডিস ও অন্য প্রজাতির ১০টি মশা, অর্থাৎ ধরা মশার ৮৩ দশমিক ১ শতাংশই এডিস। নীরব ফাঁদে ধরা পড়ে একটি এডিসসহ মোট চারটি মশা।
বৃষ্টি, বাতাস ও ক্যাম্পাসের নিত্যদিনের কোলাহলের মধ্যেও যন্ত্রটি চলেছে। তবে বাইরের পরিবেশে ৪৯টি এডিসের মধ্যে ৩৫টি সঠিকভাবে শনাক্ত করতে পেরেছে এআই, যা প্রায় ৭১ শতাংশ। গবেষকেরা বলছেন, যন্ত্রটির কার্যকারিতা আরও যাচাই করতে বড় পরিসরে পরীক্ষা চালাতে হবে। তাঁদের হিসাবে এর আনুমানিক দাম ৯৯ ডলার।
বিজ্ঞাপন
গবেষণার নেতৃত্বে ছিলেন তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. আহসান হাবিব, একই বিভাগের অধ্যাপক সাঈদ মাহমুদ উল্লাহ এবং প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক খন্দকার আশফাকুল মুইদ। গবেষণাটি চলতি বছর IEEE Transactions on Instrumentation and Measurement সাময়িকীতে ছাপা হয়েছে।
আহসান হাবিব বলেন, এডিস মশা কোথায় আছে এবং সময়ের সঙ্গে তাদের সংখ্যা কীভাবে বদলাচ্ছে, তা এই ব্যবস্থা দ্রুত কর্তৃপক্ষকে জানাতে পারবে। এতে মশার প্রজননস্থল সরানোর ক্ষেত্রে কোনটি আগে করতে হবে এবং নেওয়া পদক্ষেপ কাজ করছে কি না, তা যাচাই করা সহজ হবে। চলতি ফাঁদের তুলনায় মশা ধরা ও শনাক্তের কাজ স্বয়ংক্রিয় হবে এবং বিদ্যমান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে।
তবে শুধু পুরুষ মশা ধরে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। ডেঙ্গু ছড়ায় স্ত্রী এডিস মশা। পুরুষ মশার উপস্থিতি থেকে কোনও এলাকায় এডিস কতটা ছড়িয়েছে, তার ধারণা মিললেও সংক্রমিত স্ত্রী মশার সংখ্যা বা ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব নিশ্চিতভাবে অনুমান করা যায় না। যন্ত্রটির মূল উদ্দেশ্য মশার উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে সম্ভাব্য প্রজননস্থল খুঁজে পেতে সাহায্য করা।
২০২৭ সালের জুন-জুলাইয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আবাসিক এলাকায় ১০ থেকে ১৫টি যন্ত্র বসিয়ে পরীক্ষা চালানোর পরিকল্পনা আছে গবেষক দলের। তখন বাইরের পরিবেশে এআইয়ের মশা শনাক্তের সক্ষমতা, আবহাওয়া থেকে সুরক্ষা ও দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা বাড়ানোর চেষ্টা করা হবে। সৌরবিদ্যুৎ ও আরও নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবহারের বিষয়টিও ভাবা হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
প্রকল্পের নেতৃত্বদাতা ও গবেষণাপত্রের সহলেখক আতিকে বি জাকির তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, হার্ডওয়্যার ও এআই সফটওয়্যার জুড়ে একটি ব্যবস্থা দাঁড় করানো ছিল চ্যালেঞ্জিং। বিশেষায়িত পরীক্ষাগার সরঞ্জাম, যন্ত্রাংশ বানানো এবং আমদানি করা উপকরণের কারণে প্রাথমিক নমুনা তৈরির খরচ বেড়ে যায়। তাঁর মতে, গবেষণায় অর্থায়নের সুযোগ বাড়লে এসব বাধা কমবে এবং কার্যকর প্রযুক্তি উদ্ভাবন সহজ হবে।
তিনি জানান, মাস্ট-ক্লাউডনেটের পরবর্তী সংস্করণে কাজ চলছে। একই সঙ্গে ছবি বিশ্লেষণের বদলে মশার ডানার ঝাপটার শব্দ ধরে এডিস চেনার মতো কম খরচের পদ্ধতিও পরীক্ষা করা হচ্ছে।