এনআইডি কার্ড সংশোধন করার নিয়ম: অনলাইনে আবেদন, কাগজপত্র ও সময়
প্রযুক্তি ডেস্ক
প্রকাশ:
নামের বানানে একটি অক্ষর ভুল, বাবার নামে মোহাম্মদের জায়গায় মো., কিংবা জন্মতারিখ সনদের সঙ্গে মেলে না। জাতীয় পরিচয়পত্রের এমন ছোট-বড় ভুল পরে পাসপোর্ট, ব্যাংক হিসাব, জমির কাজ, এমনকি বিদেশে চাকরির সময় বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ভালো খবর হলো, এনআইডি কার্ড সংশোধনের আবেদন এখন পুরোপুরি অনলাইনে করা যায়।
বিজ্ঞাপন
নিয়মটি মোটাদাগে এমন: নির্বাচন কমিশনের services.nidw.gov.bd ওয়েবসাইটে নিজের অ্যাকাউন্টে লগইন করে সংশোধনের অংশে যেতে হয়, ভুল তথ্যটি বেছে সঠিক তথ্য লিখতে হয়, প্রমাণ হিসেবে কাগজপত্রের স্ক্যান কপি দিতে হয় এবং অনলাইনে ফি পরিশোধ করতে হয়। এরপর আবেদন যাচাই করে নির্বাচন অফিস সিদ্ধান্ত দেয়। প্রয়োজনে শুনানিতে ডাকা হয়।
আবেদনের আগে বুঝে নিন ভুলটি কোন ধরনের
সব সংশোধন সমান নয়। বানানের সামান্য ভুল আর জন্মতারিখ কয়েক বছর পেছানো, এ দুটি এক বিষয় নয়। নির্বাচন কমিশন সংশোধনগুলোকে কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করেছে। ছোটখাটো বানান বা তথ্যের ভুল সাধারণত উপজেলা বা থানা পর্যায়ে নিষ্পত্তি হয়। নামের বড় পরিবর্তন, জন্মতারিখ বদল বা মা-বাবার নাম পুরোপুরি পরিবর্তনের মতো আবেদন যায় জেলা, আঞ্চলিক বা কেন্দ্রীয় পর্যায়ে।
যত বড় পরিবর্তন, তত বেশি প্রমাণ লাগে এবং তত বেশি সময় যায়। তাই আবেদনের আগে নিজেকে প্রশ্ন করুন, আমার কাছে কি এমন সরকারি নথি আছে যা সঠিক তথ্যটি প্রমাণ করে? উত্তর হ্যাঁ হলে তবেই আবেদন করুন।
বিজ্ঞাপন
কোন সংশোধনে কী কাগজপত্র লাগে
সাধারণভাবে যে নথিগুলো প্রমাণ হিসেবে কাজে লাগে, সেগুলো হলো:
১. নামের সংশোধন: এসএসসি বা সমমানের সনদ, অনলাইন জন্ম নিবন্ধন সনদ, পাসপোর্ট। শিক্ষাগত সনদ না থাকলে অন্যান্য সরকারি নথি।
২. জন্মতারিখ সংশোধন: এসএসসি বা সমমানের সনদ সবচেয়ে শক্ত প্রমাণ। শিক্ষাগত সনদ না থাকলে জন্ম নিবন্ধন, পাসপোর্ট বা চাকরির নথি। জন্মতারিখ বদলের আবেদনে যাচাই বেশি কড়া হয়।
বিজ্ঞাপন
৩. মা-বাবার নাম সংশোধন: মা-বাবার জাতীয় পরিচয়পত্র, সন্তানের এসএসসি সনদ বা জন্ম নিবন্ধন সনদ।
৪. স্বামী বা স্ত্রীর নাম যোগ বা বদল: নিকাহনামা বা বিবাহ নিবন্ধনের কপি, তালাকের ক্ষেত্রে তালাকের প্রমাণপত্র।
৫. পেশা, রক্তের গ্রুপ, ধর্মের মতো তথ্য: সংশ্লিষ্ট প্রমাণপত্র, যেমন রক্তের গ্রুপের জন্য রোগনির্ণয় কেন্দ্রের রিপোর্ট।
ঠিকানা পরিবর্তন কিন্তু সংশোধন নয়, এটি স্থানান্তর হিসেবে আলাদা আবেদনে হয়। নতুন ঠিকানার প্রমাণ হিসেবে বিদ্যুৎ বা গ্যাস বিলের কপি, হোল্ডিং ট্যাক্সের রসিদ বা ভাড়ার চুক্তিপত্র লাগে।
বিজ্ঞাপন
অনলাইনে এনআইডি কার্ড সংশোধনের ধাপ
১. লগইন: services.nidw.gov.bd তে নিজের ইউজারনেম-পাসওয়ার্ড দিয়ে ঢুকুন। আগে অ্যাকাউন্ট না থাকলে এনআইডি নম্বর, জন্মতারিখ, মোবাইল ওটিপি ও মুখমণ্ডল যাচাই দিয়ে খুলে নিন।
২. সংশোধনের অপশন বেছে নিন: প্রোফাইল পাতায় তথ্য সংশোধন বা এডিট করার বোতাম থাকে। সেখানে চাপ দিলে ব্যক্তিগত তথ্য, পারিবারিক তথ্য ইত্যাদি ভাগে ভাগে ঘর দেখাবে।
৩. সঠিক তথ্য লিখুন: শুধু যে তথ্যটি ভুল, সেটির ঘরে সঠিক তথ্য দিন। বাংলা ও ইংরেজি দুই ঘরই মিলিয়ে লিখুন। অপ্রয়োজনীয় ঘর বদলাবেন না, এতে আবেদন জটিল হয়।
বিজ্ঞাপন
৪. ফি পরিশোধ: পর্দায় সংশোধনের ধরন অনুযায়ী ফির পরিমাণ দেখাবে। মোবাইল ব্যাংকিং, কার্ড বা অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পরিশোধ করা যায়। ফি নির্ভর করে কোন তথ্য বদলাচ্ছেন এবং এর আগে কতবার সংশোধন করেছেন তার ওপর।
৫. কাগজপত্র আপলোড: প্রমাণপত্রগুলো পরিষ্কার করে স্ক্যান বা ছবি তুলে আপলোড করুন। ঝাপসা ছবি দিলে আবেদন ফেরত আসতে পারে।
৬. জমা ও প্রিন্ট: সব যাচাই করে আবেদন জমা দিন। আবেদনের কপি ডাউনলোড বা স্ক্রিনশট করে রাখুন।
এনআইডি কার্ড সংশোধন করতে কতদিন লাগে
বিজ্ঞাপন
এ প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর নেই। ছোট বানান সংশোধন, যার পক্ষে শক্ত প্রমাণ আছে, তা কয়েক সপ্তাহের মধ্যে নিষ্পত্তি হওয়ার নজির আছে। অন্যদিকে জন্মতারিখ বা নামের বড় পরিবর্তনে তদন্ত ও শুনানির কারণে কয়েক মাসও লেগে যেতে পারে। নির্বাচন অফিসে আবেদনের চাপ, প্রমাণপত্রের মান এবং তদন্তের প্রয়োজন আছে কি না, এসবের ওপর সময় নির্ভর করে।
শুনানিতে ডাকা হলে নির্ধারিত দিনে মূল কাগজপত্র নিয়ে হাজির হোন। অনুপস্থিত থাকলে আবেদন বাতিল হতে পারে। শুনানির খবর সাধারণত এসএমএস বা অ্যাকাউন্টের বার্তার মাধ্যমে জানানো হয়, তাই আবেদনের পর নিয়মিত প্রোফাইল দেখুন এবং নিবন্ধিত মোবাইল নম্বরটি সচল রাখুন।
এনআইডি কার্ড সংশোধন চেক করবেন যেভাবে
আবেদনের পর একই অ্যাকাউন্টে লগইন করলে প্রোফাইলে আবেদনের অবস্থা দেখা যায়। সাধারণত প্রক্রিয়াধীন, তদন্তাধীন, অনুমোদিত বা বাতিল, এ ধরনের অবস্থা দেখায়। অনুমোদন হলে প্রোফাইল থেকে হালনাগাদ তথ্যসহ নতুন অনলাইন কপি ডাউনলোড করা যায়। বাতিল হলে কারণ দেখে প্রয়োজনীয় নথি নিয়ে নতুন করে আবেদন করতে হয়।
বিজ্ঞাপন
আবেদনের আগে সব নথি একসুতোয় মিলিয়ে নিন
এনআইডি সংশোধনের সবচেয়ে বড় সূত্র হলো নথির মিল। ধরুন, আপনার এসএসসি সনদে নাম মোছা. রাবেয়া খাতুন, জন্মসনদে রাবেয়া খাতুন, আর এনআইডিতে রাবিয়া খাতুন। এমন অবস্থায় শুধু এনআইডি বদলালেই সমস্যা মিটবে না, পরে পাসপোর্ট করার সময় আবার প্রশ্ন উঠবে। তাই আগে ঠিক করুন কোন নথির বানানটিকে আপনি মূল হিসেবে ধরবেন। সাধারণত শিক্ষাগত সনদকে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ধরা হয়।
জন্মসনদে ভুল থাকলে সেটি আগে সংশোধন করুন, তারপর সেই হালনাগাদ সনদ দিয়ে এনআইডি সংশোধনের আবেদন করুন। এতে আপনার আবেদনের পক্ষে দুটি সরকারি নথি একই কথা বলবে এবং অনুমোদনের সম্ভাবনা বাড়বে। একইভাবে মা-বাবার নাম সংশোধন করতে চাইলে তাঁদের নিজেদের এনআইডিতে নামটি কেমন আছে, সেটি দেখে নিন। তাঁদের কার্ডের সঙ্গে না মিললে আপনার আবেদন প্রশ্নের মুখে পড়বে।
একসঙ্গে অনেক তথ্য বদলানোর চেষ্টা করবেন না। বিশেষ করে বয়স কমানো বা বাড়ানোর আবেদন শক্ত প্রমাণ ছাড়া প্রায়ই বাতিল হয়। দালালের কাছে পাসওয়ার্ড দিয়ে কাজ করাবেন না, আপনার অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ তার হাতে চলে যাবে। আর মিথ্যা তথ্য বা জাল কাগজ দিয়ে আবেদন করলে তা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।
বিজ্ঞাপন
সাধারণ জিজ্ঞাসা
এনআইডি কার্ড সংশোধনের জন্য কি অফিসে যেতে হয়?
আবেদন অনলাইনে জমা দেওয়া যায়। তবে প্রয়োজন হলে উপজেলা বা থানা নির্বাচন অফিস শুনানির জন্য ডাকতে পারে।
এসএসসি সনদ না থাকলে কি জন্মতারিখ সংশোধন সম্ভব?
বিজ্ঞাপন
সম্ভব, তবে কঠিন। পাসপোর্ট, অনলাইন জন্ম নিবন্ধন, চাকরির নথির মতো অন্যান্য সরকারি প্রমাণ লাগবে এবং যাচাই বেশি হবে।
সংশোধনের পর নতুন স্মার্ট কার্ড কি আপনাআপনি পাব?
অনুমোদনের পর অনলাইন কপিতে হালনাগাদ তথ্য দেখা যায়। নতুন ছাপা কার্ডের জন্য নির্বাচন অফিসের নির্দেশনা অনুযায়ী আলাদা প্রক্রিয়া থাকতে পারে, অফিস থেকে জেনে নিন।
আবেদন বাতিল হলে কি ফি ফেরত পাব?
বিজ্ঞাপন
সাধারণত জমা দেওয়া ফি ফেরতযোগ্য নয়। তাই আবেদনের আগে প্রমাণপত্র ঠিক আছে কি না, নিশ্চিত হয়ে নিন।
অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড ভুলে গেলে সংশোধনের আবেদন দেখব কীভাবে?
লগইন পাতায় পাসওয়ার্ড পুনরুদ্ধারের অপশন থাকে। নিবন্ধিত মোবাইলে ওটিপি নিয়ে বা মুখমণ্ডল যাচাই করে নতুন পাসওয়ার্ড ঠিক করা যায়। এরপর আগের মতোই প্রোফাইলে আবেদনের অবস্থা দেখা যাবে।