অনলাইনে জন্ম নিবন্ধন আবেদন করার নিয়ম ও কী কী কাগজপত্র লাগে
প্রযুক্তি ডেস্ক
প্রকাশ:
শিশুর জন্মের পর মা-বাবা যে সরকারি কাজটি সবার আগে সেরে রাখতে পারেন, তা হলো জন্ম নিবন্ধন। জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে নিবন্ধন করলে কোনো ফি লাগে না, আর কাজটিও সবচেয়ে সহজ হয়। স্কুলে ভর্তি, টিকা, পাসপোর্ট, পরে জাতীয় পরিচয়পত্র, সবকিছুর ভিত্তি এই সনদ।
বিজ্ঞাপন
জন্ম নিবন্ধন আবেদন এখন অনলাইনে শুরু করতে হয়। bdris.gov.bd ওয়েবসাইটে ফরম পূরণ করে আবেদনপত্র প্রিন্ট করতে হয়, তারপর প্রয়োজনীয় কাগজসহ সেটি নিজ এলাকার নিবন্ধক কার্যালয়ে জমা দিতে হয়। ইউনিয়নে থাকলে ইউনিয়ন পরিষদ, শহরে পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড বা আঞ্চলিক কার্যালয়, আর প্রবাসে থাকলে বাংলাদেশ দূতাবাস হলো নিবন্ধক কার্যালয়।
জন্ম নিবন্ধন কি কি লাগে
কাগজপত্র বয়সভেদে কিছুটা আলাদা। তবে সাধারণভাবে যা লাগে:
১. জন্মের প্রমাণ: হাসপাতালে জন্ম হলে হাসপাতালের ছাড়পত্র বা জন্মের প্রত্যয়ন। বাড়িতে জন্ম হলে টিকা কার্ড বা ইপিআই কার্ড, কিংবা স্বাস্থ্যকর্মীর প্রত্যয়ন। বড়দের ক্ষেত্রে এসএসসি বা সমমানের সনদ অথবা নিবন্ধিত চিকিৎসকের বয়স প্রত্যয়নপত্র।
বিজ্ঞাপন
২. মা-বাবার তথ্য: মা ও বাবার অনলাইন জন্ম নিবন্ধন নম্বর অথবা জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর। ২০০১ সাল বা তার পরে জন্ম নেওয়াদের নিবন্ধনে এখন মা-বাবার অনলাইন তথ্য সাধারণত বাধ্যতামূলক।
৩. ঠিকানার প্রমাণ: বাড়ির হোল্ডিং ট্যাক্সের রসিদ, বিদ্যুৎ বা পানির বিলের কপি, কিংবা ইউনিয়ন পরিষদের প্রত্যয়ন।
৪. আবেদনকারীর তথ্য: আবেদন যিনি করছেন, তাঁর নাম ও মোবাইল নম্বর। শিশুর ক্ষেত্রে সাধারণত মা বা বাবা আবেদনকারী হন।
অনলাইনে জন্ম নিবন্ধন আবেদন কিভাবে করব
বিজ্ঞাপন
১. সাইটে ঢুকে আবেদনের ধরন বাছাই: bdris.gov.bd তে গিয়ে জন্ম নিবন্ধনের আবেদন অংশে প্রবেশ করুন। সেখানে নতুন জন্ম নিবন্ধনের আবেদন বেছে নিন।
২. নিবন্ধন কার্যালয় নির্বাচন: আপনি কোথায় নিবন্ধন করবেন, তা ঠিক করুন। জন্মস্থান বা স্থায়ী ঠিকানা বা বর্তমান ঠিকানা, যেকোনো একটির ভিত্তিতে কার্যালয় বাছাই করা যায়। দেশ, বিভাগ, জেলা, উপজেলা থেকে নির্দিষ্ট ইউনিয়ন, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড বেছে নিন।
৩. শিশুর তথ্য: শিশুর নাম বাংলা ও ইংরেজিতে, জন্মতারিখ, লিঙ্গ, জন্মস্থান এবং মা-বাবার কততম সন্তান, এসব তথ্য দিন। নামের বানান এখনই ভালো করে ঠিক করুন, পরে বদলাতে ঝামেলা।
৪. মা-বাবার তথ্য: মা ও বাবার জন্ম নিবন্ধন বা এনআইডি নম্বর ও জন্মতারিখ দিলে অনেক সময় নাম আপনাআপনি চলে আসে। মিলিয়ে নিয়ে পরের ধাপে যান।
বিজ্ঞাপন
৫. ঠিকানা ও আবেদনকারী: জন্মস্থান, স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা লিখুন। আবেদনকারীর সম্পর্ক ও মোবাইল নম্বর দিন।
৬. কাগজ সংযুক্ত করা: প্রমাণপত্রগুলোর স্ক্যান কপি নির্ধারিত আকারে আপলোড করুন। কিছু কার্যালয় মূল কাগজ জমার সময় দেখতে চায়।
৭. জমা ও প্রিন্ট: সব তথ্য একবার মিলিয়ে নিয়ে আবেদন জমা দিন। একটি আবেদন নম্বর পাবেন। আবেদনপত্রটি প্রিন্ট করুন এবং নম্বরটি লিখে রাখুন।
৮. কার্যালয়ে জমা: প্রিন্ট করা আবেদনপত্র ও কাগজের ফটোকপি নিয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিবন্ধক কার্যালয়ে যান। দেরি করলে অনলাইন আবেদন বাতিল হয়ে যেতে পারে, তাই কয়েক দিনের মধ্যেই জমা দিন।
বিজ্ঞাপন
নাম ঠিক করার আগে একটু ভাবুন
অনলাইন ফরমে শিশুর নাম লেখার মুহূর্তটি আসলে সারা জীবনের সিদ্ধান্ত। এই বানানই পরে স্কুলের সনদ, পাসপোর্ট আর জাতীয় পরিচয়পত্রে যাবে। তাই পরিবারে আলোচনা করে নাম চূড়ান্ত করুন, তারপর আবেদন করুন। ইংরেজি বানান কী হবে, সেটিও এখনই ঠিক করুন। যেমন মোহাম্মদ লিখবেন Mohammad না Muhammad, এমন সিদ্ধান্ত পরে বদলাতে চাইলে সংশোধনের আবেদন, প্রমাণপত্র আর ফি সবই লাগে।
ডাকনাম আর পোশাকি নাম মিশিয়ে ফেলবেন না। নামের আগে মো. বা মোছা. সংক্ষেপে লিখবেন নাকি পূর্ণরূপে, সেটিও একবারেই ঠিক করুন। মা-বাবার নাম অবশ্যই তাঁদের নিজেদের এনআইডি বা জন্মসনদের বানানের সঙ্গে হুবহু মিলিয়ে লিখবেন।
নিবন্ধক কার্যালয়ে জমা, ফি ও সময়
বিজ্ঞাপন
প্রিন্ট করা আবেদনপত্র নিয়ে কার্যালয়ে গেলে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা উদ্যোক্তা আপনার কাগজের সঙ্গে অনলাইনের তথ্য মিলিয়ে দেখবেন। ইউনিয়ন পরিষদে সাধারণত ডিজিটাল সেন্টারের উদ্যোক্তা এবং চেয়ারম্যান বা সচিবের মাধ্যমে কাজটি হয়। কোনো তথ্য অস্পষ্ট মনে হলে তাঁরা প্রশ্ন করতে পারেন বা অতিরিক্ত প্রত্যয়ন চাইতে পারেন। সব ঠিক থাকলে নিবন্ধক অনুমোদন দেন এবং সনদ ছাপা হয়। চাইলে ইউনিয়নের ডিজিটাল সেন্টার থেকেই পুরো অনলাইন আবেদন করিয়ে নিতে পারেন, তবে সব তথ্য নিজে পাশে বসে মিলিয়ে দিন।
জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে নিবন্ধন সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে। এর পরে নিবন্ধন করলে বয়স অনুযায়ী সামান্য বিলম্ব ফি দিতে হয়, যা কার্যালয়ে জানিয়ে দেওয়া হয়। ফি জমার রসিদ অবশ্যই নিয়ে রাখুন।
কাগজ ঠিক থাকলে অনেক কার্যালয় কয়েক দিনের মধ্যেই সনদ দেয়। আবার কোথাও যাচাই বা কাজের চাপে কয়েক সপ্তাহ লাগতে পারে। সনদ হাতে পাওয়ার দিন কার্যালয় থেকেই জানিয়ে দেওয়া হয়।
সনদ হাতে পেয়ে প্রথমেই যা করবেন
বিজ্ঞাপন
সনদ হাতে পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে everify.bdris.gov.bd সাইটে নিবন্ধন নম্বর ও জন্মতারিখ দিয়ে যাচাই করুন। অনলাইনে তথ্য আছে কি না এবং বানান সব ঠিক আছে কি না, মিলিয়ে নিন। কোনো ভুল থাকলে তখনই সংশোধনের আবেদন করুন। সময় যত গড়ায়, স্কুলের কাগজ, টিকার কার্ডসহ অন্য নথিতে ভুলটি ছড়িয়ে পড়ে।
সনদের কয়েকটি ফটোকপি করে রাখুন এবং মূল কপি শুকনো, নিরাপদ জায়গায় সংরক্ষণ করুন। মোবাইলেও একটি ছবি রেখে দেওয়া যায়।
যেসব ভুলে আবেদন আটকে যায়
মা-বাবার নিজেদের জন্ম নিবন্ধন অনলাইনে না থাকা সবচেয়ে সাধারণ সমস্যা। এ ক্ষেত্রে আগে মা-বাবার নিবন্ধন হালনাগাদ বা নতুন করে করতে হয়, অথবা তাঁদের এনআইডি নম্বর ব্যবহার করতে হয়। আরেকটি ভুল হলো ভুল কার্যালয় বেছে নেওয়া। যে এলাকার কার্যালয় বেছেছেন, কাগজ সেখানেই জমা দিতে হবে। আর অনেকে দালালের মাধ্যমে কাজ করাতে গিয়ে ভুয়া সনদের শিকার হন। নিজে অনলাইনে আবেদন করে নিজেই কার্যালয়ে জমা দেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।
বিজ্ঞাপন
সাধারণ জিজ্ঞাসা
জন্ম নিবন্ধন করার নিয়ম কি বড়দের জন্যও একই?
হ্যাঁ, অনলাইন আবেদনের ধাপ একই। তবে বড়দের ক্ষেত্রে জন্মের প্রমাণ হিসেবে শিক্ষাগত সনদ বা চিকিৎসকের প্রত্যয়ন লাগে এবং বিলম্ব ফি দিতে হয়।
মা-বাবার জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকলে কী হবে?
বিজ্ঞাপন
তাঁদের অনলাইন জন্ম নিবন্ধন নম্বর দিয়েও আবেদন করা যায়। কোনোটিই না থাকলে আগে মা-বাবার নিবন্ধন করে নিতে হবে।
প্রবাসে জন্ম নেওয়া শিশুর নিবন্ধন কোথায় হবে?
সংশ্লিষ্ট দেশের বাংলাদেশ দূতাবাস বা মিশন থেকে অনলাইনে আবেদন করে নিবন্ধন করা যায়। দেশে ফিরে স্থায়ী ঠিকানার কার্যালয়েও করা সম্ভব।
অনলাইন আবেদনের পর কাগজ জমা না দিলে কী হয়?
বিজ্ঞাপন
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জমা না দিলে আবেদনটি বাতিল হয়ে যেতে পারে। তখন আবার নতুন করে আবেদন করতে হবে।
একই শিশুর দুইবার নিবন্ধন হয়ে গেলে কী করণীয়?
দ্বৈত নিবন্ধন আইনত সমস্যা তৈরি করে এবং পরে এনআইডি বা পাসপোর্টে জটিলতা বাড়ায়। যে কার্যালয় থেকে নিবন্ধন হয়েছে, সেখানে যোগাযোগ করে একটি নিবন্ধন বাতিলের আবেদন করুন এবং একটি সনদই ব্যবহার করুন।