জন্ম নিবন্ধন সংশোধন করার নিয়ম: অনলাইনে আবেদন থেকে সনদ হাতে পাওয়া
প্রযুক্তি ডেস্ক
প্রকাশ:
জন্মসনদে ছেলের নামের ইংরেজি বানান ভুল, মায়ের নামের জায়গায় অন্য নাম, কিংবা জন্মতারিখে এক বছরের গরমিল। অনেকে বিষয়টি টের পান পাসপোর্ট বা এনআইডির আবেদনের সময়, যখন হাতে সময় কম। ভুল যত ছোটই হোক, জন্ম নিবন্ধন সংশোধন না করলে পরের সব নথিতে সমস্যা থেকে যায়।
বিজ্ঞাপন
সংশোধনের কাজ শুরু হয় অনলাইনে। জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের ওয়েবসাইট bdris.gov.bd তে সংশোধনের আবেদন অংশে গিয়ে নিবন্ধন নম্বর ও জন্মতারিখ দিয়ে রেকর্ডটি খুঁজে বের করতে হয়। তারপর কোন তথ্য ভুল তা বাছাই করে সঠিক তথ্য লিখতে হয় এবং প্রমাণপত্র সংযুক্ত করতে হয়। আবেদন প্রিন্ট করে মূল কাগজসহ নিবন্ধক কার্যালয়ে জমা দিলে যাচাই শেষে সংশোধিত সনদ পাওয়া যায়।
কোন কার্যালয়ে আবেদন যাবে
জন্ম নিবন্ধন যেখান থেকে হয়েছে, সংশোধনও সাধারণত সেই কার্যালয়ের মাধ্যমে হয়। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে নিবন্ধন হলে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা থেকে হলে পৌরসভা, সিটি করপোরেশনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক বা ওয়ার্ড কার্যালয়। যাঁরা অন্য এলাকায় চলে গেছেন, তাঁদের জন্য বর্তমান ঠিকানার কার্যালয়ে আবেদনের সুযোগ আছে কি না, তা সাইটে কার্যালয় বাছাইয়ের সময় দেখা যায়। প্রবাসীরা দূতাবাসের মাধ্যমে আবেদন করতে পারেন।
ভুলের ধরন অনুযায়ী অনুমোদনের এখতিয়ার আলাদা। বানানের সাধারণ ভুল নিবন্ধক নিজেই সংশোধন করতে পারেন। কিন্তু জন্মতারিখ বদলের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনে উপজেলা বা জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তার অনুমোদন লাগতে পারে। তাই এমন আবেদনে সময় ও যাচাই দুটোই বেশি।
বিজ্ঞাপন
আবেদনের আগে একবার everify.bdris.gov.bd তে নিজের নিবন্ধন নম্বর ও জন্মতারিখ দিয়ে দেখে নিন, অনলাইনে ঠিক কী তথ্য আছে। অনেক সময় কাগজের সনদে এক রকম আর সার্ভারে আরেক রকম তথ্য থাকে। সংশোধন হয় সার্ভারের তথ্যের ওপর, তাই সেটি দেখেই ঠিক করুন কোন কোন ঘর বদলাতে হবে। নিবন্ধনটি অনলাইনে না থাকলে সংশোধনের আগে তা অনলাইনে অন্তর্ভুক্ত করার ব্যবস্থা নিতে হবে।
জন্ম নিবন্ধন সংশোধনে কী কী কাগজ লাগে
১. সঠিক তথ্যের প্রমাণ: নামের বা জন্মতারিখের ক্ষেত্রে এসএসসি বা সমমানের সনদ সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য। ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে টিকা কার্ড, হাসপাতালের ছাড়পত্র বা স্কুলের প্রত্যয়ন।
২. মা-বাবার তথ্যের প্রমাণ: মা-বাবার নাম সংশোধনে তাঁদের জাতীয় পরিচয়পত্র বা অনলাইন জন্ম নিবন্ধন সনদ।
বিজ্ঞাপন
৩. পুরোনো জন্মসনদ: যে সনদটি সংশোধন করছেন, তার মূল কপি বা ফটোকপি।
৪. ঠিকানার প্রমাণ: ঠিকানা সংশোধনে বিদ্যুৎ বা পানির বিল, হোল্ডিং ট্যাক্সের রসিদ বা স্থানীয় প্রত্যয়ন।
৫. আবেদনকারীর পরিচয়পত্র: প্রাপ্তবয়স্ক হলে নিজের এনআইডি, শিশুর ক্ষেত্রে মা বা বাবার এনআইডি।
জন্ম নিবন্ধন কিভাবে সংশোধন করব: ধাপগুলো
বিজ্ঞাপন
১. সংশোধনের অংশে প্রবেশ: bdris.gov.bd তে গিয়ে জন্ম নিবন্ধন তথ্য সংশোধনের আবেদন অপশন বেছে নিন।
২. রেকর্ড খোঁজা: ১৭ সংখ্যার জন্ম নিবন্ধন নম্বর ও জন্মতারিখ দিয়ে অনুসন্ধান করুন। পর্দায় বর্তমান তথ্যগুলো দেখাবে।
৩. ভুল তথ্য বাছাই: যে ঘরের তথ্য বদলাতে চান, সেটি বেছে নিন। যেমন নামের ইংরেজি বানান, বাবার নাম বা জন্মস্থান। একাধিক ঘর বাছাই করা যায়, তবে প্রতিটির পক্ষে প্রমাণ থাকতে হবে।
৪. সঠিক তথ্য লেখা: নির্বাচিত ঘরের পাশে সঠিক তথ্যটি লিখুন। সংশোধনের কারণও সংক্ষেপে লিখতে হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
৫. প্রমাণপত্র সংযুক্ত করা: স্ক্যান করা কাগজ নির্ধারিত আকার ও ফরম্যাটে আপলোড করুন। ছবি যেন পরিষ্কার পড়া যায়।
৬. আবেদনকারীর তথ্য ও যাচাই: আবেদনকারী কে, তাঁর সম্পর্ক, মোবাইল নম্বর ও ইমেইল দিন। মোবাইলে আসা কোড দিয়ে যাচাই সম্পন্ন করুন।
৭. জমা ও প্রিন্ট: সব দেখে আবেদন জমা দিন। আবেদন নম্বরসহ আবেদনপত্র প্রিন্ট করে রাখুন।
৮. কার্যালয়ে জমা ও ফি পরিশোধ: প্রিন্ট করা আবেদন, মূল কাগজ ও ফটোকপি নিয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কার্যালয়ে যান। সংশোধনের ধরন অনুযায়ী নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে রসিদ নিন।
বিজ্ঞাপন
ফরম পূরণের সময় কয়েকটি ভুল বারবার দেখা যায়। কেউ শুধু বাংলা নাম ঠিক করেন, ইংরেজি বানান আগের মতো ভুল রেখে দেন। কেউ সংশোধনের ঘরে পুরো নামের বদলে শুধু ভুল অংশটি লেখেন। আবার অনেকে প্রমাণপত্র হিসেবে এমন কাগজ দেন, যাতে নিজের বানানই আলাদা। জমা দেওয়ার আগে নতুন তথ্যগুলো প্রমাণপত্রের পাশে রেখে অক্ষর ধরে মিলিয়ে নিন। একবার জমা দেওয়ার পর ভুল ধরা পড়লে নতুন আবেদন ও নতুন ফি লাগতে পারে।
সময় কত লাগে, অবস্থা জানবেন যেভাবে
সাধারণ বানান সংশোধন অনেক কার্যালয়ে কয়েক দিনের মধ্যে হয়ে যায়। উচ্চতর অনুমোদনের প্রয়োজন হলে কয়েক সপ্তাহ থেকে এক-দুই মাসও লাগতে পারে। কার্যালয় অতিরিক্ত কাগজ চাইলে তা দ্রুত জমা দিন, নইলে আবেদন ঝুলে থাকবে।
আবেদনের অবস্থা জানতে bdris.gov.bd তে আবেদনের অবস্থা দেখার অপশন আছে, সেখানে আবেদন নম্বর ও জন্মতারিখ দিয়ে খোঁজ নেওয়া যায়। অনুমোদন হলে everify.bdris.gov.bd তে নিবন্ধন নম্বর দিয়ে দেখলে হালনাগাদ তথ্য দেখা যাবে। তারপর কার্যালয় থেকে সংশোধিত সনদের নতুন কপি সংগ্রহ করুন।
বিজ্ঞাপন
যে ভুলগুলো সংশোধন সহজে হয় না
জন্মতারিখ কয়েক বছর পেছানো বা এগোনোর আবেদন সবচেয়ে কঠোরভাবে যাচাই হয়। শক্ত প্রমাণ ছাড়া এমন আবেদন সাধারণত গৃহীত হয় না। যাঁর এসএসসি সনদে এক তারিখ, তাঁর জন্মসনদে অন্য তারিখ বসানো প্রায় অসম্ভব। তাই শিক্ষাগত সনদ থাকলে সেটির সঙ্গে মিলিয়েই জন্মসনদ সংশোধন করুন।
আরেকটি জটিল পরিস্থিতি হলো দ্বৈত নিবন্ধন। একই ব্যক্তির দুটি জন্ম নিবন্ধন থাকলে সংশোধনের আগে একটি বাতিল করতে হতে পারে। এ বিষয়ে কার্যালয়ের পরামর্শ নিন।
সংশোধনের পর অন্য নথিও হালনাগাদ করুন
বিজ্ঞাপন
জন্মসনদ সংশোধনের পর কাজ পুরোপুরি শেষ হয় না। সন্তানের স্কুলের রেজিস্ট্রেশনে পুরোনো বানান থাকলে স্কুলকে জানান। প্রাপ্তবয়স্ক হলে এনআইডিতে একই ভুল আছে কি না দেখে নিন এবং প্রয়োজনে সংশোধনের আবেদন করুন। পাসপোর্টের আবেদনের আগে সব নথিতে একই তথ্য নিশ্চিত করলে ভবিষ্যতে বিদেশযাত্রা, চাকরি বা উত্তরাধিকারের কাজে জটিলতা কমবে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
জন্ম নিবন্ধন সংশোধন আবেদন কি ঘরে বসে পুরোপুরি করা যায়?
অনলাইন অংশ ঘরে বসে করা যায়। তবে প্রিন্ট করা আবেদন ও মূল কাগজ নিয়ে সাধারণত একবার নিবন্ধক কার্যালয়ে যেতে হয়।
বিজ্ঞাপন
জন্ম নিবন্ধন সংশোধনের নিয়ম কি শিশু ও বড়দের জন্য আলাদা?
ধাপ একই। পার্থক্য প্রমাণপত্রে। শিশুর ক্ষেত্রে টিকা কার্ড বা হাসপাতালের কাগজ, বড়দের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত সনদ বা এনআইডি বেশি গুরুত্ব পায়।
সংশোধনের পর নিবন্ধন নম্বর কি বদলে যায়?
না, সাধারণত নিবন্ধন নম্বর একই থাকে। শুধু ভুল তথ্যগুলো হালনাগাদ হয়।
বিজ্ঞাপন
দালাল দিয়ে দ্রুত সংশোধন করানো কি নিরাপদ?
না। ভুয়া কাগজ বা ভুল তথ্যে সংশোধনের ঝুঁকি থাকে, আর সেই দায় আপনার ওপর পড়ে। নিজে আবেদন করুন অথবা ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের সহায়তা নিন।
মৃত ব্যক্তির জন্মসনদে ভুল থাকলে কি সংশোধন করা যায়?
উত্তরাধিকার বা জমিজমার কাজে এমন প্রয়োজন হয়। এ ক্ষেত্রে সাধারণত নিকটাত্মীয় আবেদনকারী হন এবং মৃত্যু সনদসহ প্রমাণপত্র লাগে। নিবন্ধক কার্যালয়ে গিয়ে নির্দিষ্ট নিয়ম জেনে আবেদন করাই ভালো।