কক্সবাজার ভ্রমণ গাইড: যাওয়ার উপায়, থাকা, খাওয়া ও খরচ
ট্রাভেল ডেস্ক · কক্সবাজার
প্রকাশ:
ঢাকা থেকে কক্সবাজারের সড়কপথের দূরত্ব প্রায় ৪০০ কিলোমিটার। রাতের বাসে উঠলে সকালে পৌঁছে যাওয়া যায়, সরাসরি ট্রেনেও প্রায় একই সময় লাগে, আর উড়োজাহাজে লাগে এক ঘণ্টার মতো। পকেট আর সময় মিলিয়ে এই তিনটির একটি বেছে নিলেই কক্সবাজার ভ্রমণের অর্ধেক পরিকল্পনা শেষ।
বিজ্ঞাপন
দেখার মূল আকর্ষণ অবশ্যই সমুদ্র। প্রায় ১২০ কিলোমিটার লম্বা এই সৈকতকে বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক বালুকাময় সৈকতগুলোর একটি হিসেবে ধরা হয়। শহরের লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্টে সারা দিন মানুষের ভিড়, আর মেরিন ড্রাইভ ধরে দক্ষিণে গেলে হিমছড়ি ও ইনানীতে পাওয়া যায় পাহাড় আর সাগরের একসঙ্গে দেখা।
থাকা আর খাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। সাধারণ গেস্টহাউস থেকে শুরু করে তারকা হোটেল, সব ধরনের ব্যবস্থাই আছে। খরচ কত হবে, তা নির্ভর করে মৌসুম, ছুটির দিন আর আপনি কেমন জায়গায় থাকতে চান তার ওপর। নিচে যাতায়াত থেকে বাজেট পর্যন্ত সব খুঁটিনাটি দেওয়া হলো।
ঢাকা থেকে কক্সবাজার যাওয়ার উপায়
১. বাসে: ঢাকার সায়েদাবাদ, ফকিরাপুল-আরামবাগ ও কলাবাগানসহ কয়েকটি জায়গা থেকে প্রতিদিন সকাল ও রাতে অনেক এসি ও নন-এসি বাস ছাড়ে। পথে সাধারণত ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা লাগে, যানজট থাকলে আরও বেশি। নন-এসি বাসের ভাড়া আনুমানিক ৯০০ থেকে ১২০০ টাকা, এসি বাসে আনুমানিক ১৫০০ থেকে আড়াই হাজার টাকা। ছুটির মৌসুমে কয়েক দিন আগে টিকিট কেটে রাখা ভালো।
বিজ্ঞাপন
২. ট্রেনে: ঢাকা থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি আন্তঃনগর ট্রেন চালু হওয়ার পর অনেকেই এখন রেলপথ বেছে নিচ্ছেন। কমলাপুর থেকে ছেড়ে ট্রেন পৌঁছায় কক্সবাজারের ঝিনুক আকৃতির নতুন রেলস্টেশনে। শ্রেণিভেদে ভাড়া আনুমানিক ৭০০ থেকে আড়াই হাজার টাকা। চাহিদা বেশি বলে টিকিট ছাড়ার দিনই অনলাইনে কেটে ফেলাই নিরাপদ।
৩. উড়োজাহাজে: ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কক্সবাজার বিমানবন্দরে দেশি কয়েকটি এয়ারলাইনসের নিয়মিত ফ্লাইট আছে। আকাশপথে সময় লাগে প্রায় এক ঘণ্টা। আগেভাগে কাটলে একপথের ভাড়া আনুমানিক সাড়ে চার হাজার টাকা থেকে শুরু হয়, ছুটির সময় তা অনেক বেড়ে যায়।
৪. চট্টগ্রাম হয়ে: অনেকে ট্রেনে চট্টগ্রাম গিয়ে সেখান থেকে বাসে কক্সবাজার যান। চট্টগ্রাম থেকে সড়কপথে চার ঘণ্টার মতো লাগে। চট্টগ্রামে আত্মীয়স্বজন থাকলে বা পথে শহরটাও দেখতে চাইলে এই পথ সুবিধাজনক।
কখন যাবেন
বিজ্ঞাপন
নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত কক্সবাজার ভ্রমণের সবচেয়ে আরামদায়ক সময়। এ সময় সাগর তুলনামূলক শান্ত থাকে, রোদ কড়া নয়, আকাশও পরিষ্কার। তবে ভিড় আর হোটেল ভাড়া দুটোই তখন সবচেয়ে বেশি। ডিসেম্বরের ছুটি, বছরের শেষ সপ্তাহ আর দুই ঈদের ছুটিতে গেলে হোটেল অন্তত দুই-তিন সপ্তাহ আগে বুক করে রাখুন।
বর্ষায়, অর্থাৎ জুন থেকে সেপ্টেম্বরে সাগর উত্তাল থাকে। এ সময় হোটেলে বড় ছাড় পাওয়া যায়, সৈকতও ফাঁকা থাকে। বৃষ্টির মধ্যে উত্তাল ঢেউ দেখতে যাঁরা ভালোবাসেন, তাঁদের জন্য এটি আলাদা অভিজ্ঞতা। তবে আবহাওয়া অফিস সতর্কসংকেত দিলে পানিতে নামার চিন্তাও করবেন না।
কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে কী দেখবেন
শহরের ভেতরের তিনটি পয়েন্ট পাশাপাশি। লাবণী পয়েন্ট শহরের সবচেয়ে কাছে, এর পাশেই বার্মিজ পণ্যের দোকান। সুগন্ধা পয়েন্ট সবচেয়ে জমজমাট, সন্ধ্যায় ভাজা মাছের দোকানে ভিড় লেগে থাকে। কলাতলী এলাকায় হোটেল বেশি, সকালের দিকে এখানকার সৈকত তুলনামূলক নিরিবিলি।
বিজ্ঞাপন
শহর থেকে দক্ষিণে মেরিন ড্রাইভ সড়ক চলে গেছে টেকনাফ পর্যন্ত। একপাশে পাহাড়, অন্যপাশে সাগর, এই পথটুকু নিজেই একটা দর্শনীয় জায়গা। পথে পড়ে হিমছড়ি, যেখানে সিঁড়ি বেয়ে পাহাড়চূড়ায় উঠলে সৈকতের লম্বা রেখা চোখে পড়ে। আরও এগোলে ইনানী সৈকত, যেখানে ভাটার সময় পানির ওপর জেগে ওঠে কালো পাথরের সারি। শহর থেকে ইনানী প্রায় ২৫ কিলোমিটার।
সময় থাকলে একদিন রামুর প্রাচীন বৌদ্ধ বিহার আর আরেক দিন মহেশখালী দ্বীপ ঘুরে আসা যায়। মহেশখালী যেতে শহরের ঘাট থেকে স্পিডবোট বা ট্রলার পাওয়া যায়।
থাকা ও খাওয়াদাওয়া
কক্সবাজারে থাকার জায়গা মূলত কলাতলী, সুগন্ধা ও লাবণী এলাকায়। প্রধান সড়ক থেকে একটু ভেতরের গলিতে সাধারণ মানের হোটেল ও গেস্টহাউস পাওয়া যায়, মৌসুম ছাড়া সময়ে যেগুলোর ভাড়া আনুমানিক ১৫০০ থেকে ৩০০০ টাকা। মাঝারি মানের হোটেলে আনুমানিক ৩০০০ থেকে ৭০০০ টাকা, আর সমুদ্রমুখী তারকা হোটেলে ১০ হাজার টাকার বেশি লাগে।
বিজ্ঞাপন
নিরিবিলি চাইলে মেরিন ড্রাইভের পাশে বা ইনানীর দিকের রিসোর্টগুলো দেখতে পারেন। তবে সেখান থেকে শহরে আসা-যাওয়ার খরচ আলাদা করে ধরতে হবে। বাস থেকে নামতেই দালালেরা হোটেলের প্রস্তাব নিয়ে আসেন, তাঁদের কথায় না গিয়ে আগে থেকে বুক করা বা নিজে কয়েকটি হোটেল দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়াই ভালো। চেক-ইন ও চেক-আউটের সময় আর গরম পানির ব্যবস্থা আছে কি না, আগে জেনে নিন।
কক্সবাজারে গেলে সামুদ্রিক মাছ না খাওয়া মানে ভ্রমণ অসম্পূর্ণ থাকা। রূপচাঁদা, কোরাল, লইট্টা ফ্রাই, চিংড়ি আর কাঁকড়া এখানকার জনপ্রিয় পদ। সুগন্ধা পয়েন্টের দোকানগুলোতে মাছ সাজিয়ে রাখা থাকে, পছন্দ করে দিলে ভেজে দেয়। ভাজার আগেই প্রতি পিস বা প্রতি কেজির দাম ঠিক করে নিন, না হলে বিলের সময় বিপাকে পড়তে পারেন।
সাধারণ রেস্তোরাঁয় ভাত, মাছ আর ডালের একবেলার খাবার আনুমানিক ২৫০ থেকে ৫০০ টাকায় হয়ে যায়। ফেরার সময় অনেকে শুঁটকি, আচার আর বার্মিজ পণ্য কেনেন। শুঁটকি কেনার সময় গন্ধ আর রং দেখে নিন, অতিরিক্ত চকচকে শুঁটকি এড়িয়ে চলাই ভালো।
কক্সবাজার ভ্রমণ খরচ: আনুমানিক হিসাব
বিজ্ঞাপন
ধরা যাক, একজন ঢাকা থেকে নন-এসি বাসে গিয়ে দুই রাত তিন দিন থাকবেন এবং আরেকজনের সঙ্গে কক্ষ ভাগ করবেন। তাহলে আনুমানিক খরচ দাঁড়াবে এ রকম।
১. যাওয়া-আসা: নন-এসি বাসে আনুমানিক ২০০০ থেকে ২৫০০ টাকা।
২. থাকা: দুই রাতে নিজের ভাগে আনুমানিক ২০০০ থেকে ৩০০০ টাকা।
৩. খাওয়া: তিন দিনে আনুমানিক ২০০০ থেকে ২৫০০ টাকা।
বিজ্ঞাপন
৪. স্থানীয় যাতায়াত: শহরে ইজিবাইক আর হিমছড়ি-ইনানী ঘোরার জন্য ভাগাভাগি করা সিএনজি অটোরিকশায় আনুমানিক ১০০০ থেকে ১৫০০ টাকা।
সব মিলিয়ে জনপ্রতি আনুমানিক ৭ থেকে ১০ হাজার টাকায় একটি সাধারণ ভ্রমণ সেরে আসা যায়। এসি বাস বা উড়োজাহাজে গিয়ে ভালো হোটেলে থাকলে খরচ ১৫ থেকে ২৫ হাজার টাকা বা তার বেশি হতে পারে।
নিরাপত্তা ও সতর্কতা
সৈকতে লাইফগার্ডদের পতাকা খেয়াল করুন। লাল পতাকা থাকলে পানিতে নামা নিষেধ। ভাটার সময় পানির টান সবচেয়ে বেশি থাকে, আর কোথাও কোথাও বালুর নিচে গর্ত বা খাদ তৈরি হয়, স্থানীয়রা যাকে গুপ্তখাল বলেন। সাঁতার না জানলে কোমরপানির বেশি যাবেন না, রাতে কখনোই সাগরে নামবেন না, আর শিশুদের এক মুহূর্তের জন্যও চোখের আড়াল করবেন না।
বিজ্ঞাপন
মূল্যবান জিনিস সৈকতে ফেলে রেখে পানিতে নামবেন না। ঘোড়ায় চড়া, বিচ বাইক বা ছবি তোলার সেবা নেওয়ার আগে দাম ঠিক করে নিন। কোনো সমস্যায় পড়লে সৈকতের ট্যুরিস্ট পুলিশ বুথে সহায়তা চাইতে পারেন। আর সৈকতে প্লাস্টিকের বোতল বা খাবারের প্যাকেট ফেলবেন না।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
কক্সবাজার ঘুরতে কয়দিন লাগে?
শহরের সৈকত, হিমছড়ি আর ইনানী দেখতে দুই রাত তিন দিন যথেষ্ট। রামু, মহেশখালী বা টেকনাফ যোগ করতে চাইলে আরও এক-দুই দিন হাতে রাখুন।
বিজ্ঞাপন
ঢাকা থেকে কক্সবাজার ট্রেনে কত সময় লাগে?
সরাসরি আন্তঃনগর ট্রেনে সাধারণত আট থেকে নয় ঘণ্টার মতো লাগে। সময়সূচি বদলাতে পারে, তাই টিকিট কাটার সময় হালনাগাদ সময় দেখে নিন।
বর্ষাকালে কক্সবাজার যাওয়া কি নিরাপদ?
যাওয়া যায়, খরচও কম পড়ে। তবে এ সময় সাগর উত্তাল থাকে বলে পানিতে নামার ব্যাপারে বাড়তি সতর্ক থাকতে হয়। সতর্কসংকেত চলাকালে সৈকতে না নামাই ভালো।
বিজ্ঞাপন
কম খরচে কক্সবাজারে থাকার উপায় কী?
ছুটির দিন এড়িয়ে সপ্তাহের মাঝামাঝি যান, প্রধান সড়ক থেকে একটু ভেতরের হোটেল নিন আর কয়েকজন মিলে কক্ষ ভাগ করুন। এতে থাকার খরচ অনেকটাই কমে যায়।