সাজেক ভ্যালি ভ্রমণ: কীভাবে যাবেন, কোথায় থাকবেন, কখন যাবেন
ট্রাভেল ডেস্ক
প্রকাশ:
সাজেক কোথায় অবস্থিত, এই প্রশ্নের উত্তরে অনেকেই ভুল করেন। প্রশাসনিকভাবে সাজেক ভ্যালি রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার একটি ইউনিয়ন, আয়তনে দেশের অন্যতম বড় ইউনিয়ন। কিন্তু রাঙামাটি শহর থেকে সেখানে যাওয়ার সহজ সড়ক নেই। পর্যটকেরা যান খাগড়াছড়ি শহর হয়ে, দীঘিনালা পেরিয়ে পাহাড়ি পথে।
বিজ্ঞাপন
ঢাকা থেকে রাতের বাসে খাগড়াছড়ি, সেখান থেকে চাঁদের গাড়ি নামে পরিচিত খোলা জিপে সাজেক, এটাই সবচেয়ে প্রচলিত পথ। পথের একটি অংশে নিরাপত্তার জন্য দিনে নির্দিষ্ট সময়ে সেনাবাহিনীর এসকর্টে গাড়ি চলে। তাই সময়ের হিসাব মিলিয়ে পরিকল্পনা না করলে পথেই কয়েক ঘণ্টা বসে থাকতে হতে পারে।
সাজেকের মূল আকর্ষণ মেঘ। ভোরে কটেজের বারান্দায় দাঁড়ালে চারপাশের পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে মেঘ জমে থাকতে দেখা যায়। এই দৃশ্য সবচেয়ে বেশি মেলে বর্ষা ও শরতে।
ঢাকা থেকে সাজেক যাওয়ার উপায়
১. ঢাকা থেকে খাগড়াছড়ি: ঢাকার সায়েদাবাদ, আরামবাগ, কলাবাগান ও গাবতলী এলাকা থেকে খাগড়াছড়ির উদ্দেশে এসি ও নন-এসি বাস ছাড়ে। রাতের বাসে উঠলে ভোরে পৌঁছানো যায়, সময় লাগে সাত থেকে আট ঘণ্টা। নন-এসি বাসের ভাড়া আনুমানিক ৭০০ থেকে ৯০০ টাকা, এসি বাসে আরও বেশি।
বিজ্ঞাপন
২. খাগড়াছড়ি থেকে সাজেক: খাগড়াছড়ি শহর থেকে সাজেকের দূরত্ব প্রায় ৭০ কিলোমিটার। শহরের নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড থেকে চাঁদের গাড়ি, সিএনজি অটোরিকশা বা মোটরসাইকেল ভাড়া পাওয়া যায়। দলে গেলে চাঁদের গাড়িই সুবিধাজনক, একটি গাড়িতে ১০ থেকে ১৪ জন বসতে পারেন।
৩. সেনা এসকর্ট: দীঘিনালা পেরিয়ে বাঘাইহাট এলাকায় সেনা ক্যাম্প থেকে দিনে নির্দিষ্ট সময়ে, সাধারণত সকালে ও দুপুরের পর, গাড়িগুলো একসঙ্গে এসকর্টে সাজেকের দিকে রওনা হয়। ফেরার পথেও একই নিয়ম। এসকর্টের সময় চালকেরা জানেন, তবু রওনা হওয়ার আগে নিশ্চিত হয়ে নিন।
৪. চট্টগ্রাম হয়ে: চট্টগ্রাম থেকেও খাগড়াছড়ির বাস পাওয়া যায়, সময় লাগে তিন-চার ঘণ্টা। ট্রেনে চট্টগ্রাম পৌঁছে সেখান থেকে খাগড়াছড়ি যাওয়া আরেকটি বিকল্প।
পথে প্রবেশমুখে সাজেকে ঢোকার জন্য জনপ্রতি ও গাড়িপ্রতি নির্দিষ্ট ফি দিতে হয়। ফি সামান্য, তবে খুচরা টাকা রাখলে সুবিধা।
বিজ্ঞাপন
সাজেক যাওয়ার উপযুক্ত সময়
কী দেখতে চান, তার ওপর নির্ভর করে উপযুক্ত সময়। মেঘের সমুদ্র দেখতে চাইলে জুন থেকে অক্টোবর সবচেয়ে ভালো। এ সময় পাহাড় সবুজ থাকে, ভোরে আর বৃষ্টির পর মেঘ নেমে আসে উপত্যকায়। তবে বর্ষায় পাহাড়ি পথ পিচ্ছিল হয়, কখনো কখনো পাহাড়ধসে রাস্তা বন্ধ থাকে।
নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারিতে আকাশ পরিষ্কার থাকে, দূরের পাহাড়সারি স্পষ্ট দেখা যায়, রাতের আকাশে তারাও মেলে ভালো। ভোরের দিকে কুয়াশা আর হালকা মেঘও থাকে। শীতে রাতে বেশ ঠান্ডা পড়ে, গরম কাপড় নিতে হয়। মার্চ থেকে মে পর্যন্ত গরম বেশি, মেঘও কম, তাই এই সময়টা তুলনামূলক কম জনপ্রিয়।
শুক্র-শনিবার আর সরকারি ছুটিতে সাজেকে প্রচণ্ড ভিড় হয়। পারলে সপ্তাহের মাঝামাঝি যান, তাতে কটেজ ভাড়াও কম পড়বে।
বিজ্ঞাপন
সাজেকে কী কী দেখবেন
রুইলুই পাড়া সাজেকের মূল এলাকা, এখানেই কটেজ আর রেস্তোরাঁগুলো। হেলিপ্যাড এলাকা থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দুটোই চমৎকার দেখা যায়। রুইলুই পাড়া থেকে কিছুটা দূরে কংলাক পাড়া, সাজেকের সবচেয়ে উঁচু এলাকা। শেষ অংশটুকু হেঁটে উঠতে হয়, ভোরে উঠলে মেঘের ওপর থেকে সূর্য ওঠা দেখার সুযোগ মেলে।
খাগড়াছড়ি থেকে যাওয়ার পথে হাজাছড়া ঝরনা দেখে নেওয়া যায়, মূল সড়ক থেকে অল্প হাঁটলেই পৌঁছানো যায়। খাগড়াছড়ি শহরের কাছে আলুটিলা গুহা আর রিছাং ঝরনাও জনপ্রিয়। সময় থাকলে ফেরার দিন এগুলো ঘুরে আসতে পারেন।
থাকা, খাওয়া ও খরচ
বিজ্ঞাপন
রুইলুই ও কংলাক পাড়ায় অসংখ্য কটেজ ও রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। কাঠ বা বাঁশের তৈরি সাধারণ কটেজ থেকে শুরু করে পাকা দালানের রিসোর্ট, সব ধরনের ব্যবস্থাই আছে। উপত্যকার দিকে মুখ করা কক্ষগুলোর ভাড়া বেশি, কারণ সেগুলো থেকেই মেঘ দেখা যায়। সপ্তাহের মাঝে সাধারণ কটেজে প্রতি রাত আনুমানিক দুই থেকে চার হাজার টাকা, ছুটির দিনে আর ভালো রিসোর্টে ছয়-সাত হাজার টাকা বা তার বেশি লাগে।
ছুটির দিনে আগে বুক না করে গেলে থাকার জায়গা না পাওয়ার ঝুঁকি আছে। সাজেকে পানি ও বিদ্যুতের সংকট আছে, অনেক কটেজে নির্দিষ্ট সময়ে বিদ্যুৎ থাকে। বুক করার সময় এসব জেনে নিন। স্থানীয় পাহাড়িদের পরিচালিত কিছু কটেজও আছে, সেখানে থাকলে স্থানীয় জীবনযাত্রা কাছ থেকে দেখার সুযোগ মেলে।
রেস্তোরাঁগুলোতে সাধারণ ভাত-মাছ-মুরগি পাওয়া যায়। জনপ্রিয় খাবার ব্যাম্বু চিকেন, বাঁশের চোঙে রান্না করা মুরগি। অনেক রেস্তোরাঁয় আগে থেকে বলে রাখতে হয়। পাহাড়ের চূড়ায় সব জিনিস বয়ে আনতে হয় বলে দাম কিছুটা বেশি।
খরচের আনুমানিক হিসাব এমন: চাঁদের গাড়ি এক রাত থাকাসহ যাওয়া-আসার জন্য পুরো গাড়ির ভাড়া আনুমানিক ৮ থেকে ১২ হাজার টাকা, যা দলের সবার মধ্যে ভাগ হয়ে যায়। ১২ জনের দল হলে ঢাকা থেকে দুই রাত বাসে আর এক রাত সাজেকে থাকা ধরে জনপ্রতি আনুমানিক পাঁচ থেকে আট হাজার টাকায় ভ্রমণ সম্ভব। দল ছোট হলে মাথাপিছু খরচ বাড়বে।
বিজ্ঞাপন
দুই রাতের একটি নমুনা ভ্রমণসূচি
১. প্রথম রাত: ঢাকা থেকে রাতের বাসে খাগড়াছড়ির উদ্দেশে রওনা।
২. প্রথম দিন: ভোরে খাগড়াছড়ি পৌঁছে নাশতা সেরে চাঁদের গাড়ি ঠিক করুন। সকালের এসকর্ট ধরতে সময়মতো বাঘাইহাট পৌঁছান, পথে হাজাছড়া ঝরনা দেখে নিন। দুপুরের মধ্যে সাজেক পৌঁছে কটেজে উঠুন, বিকেলে রুইলুই পাড়া ঘুরে হেলিপ্যাড থেকে সূর্যাস্ত দেখুন।
৩. দ্বিতীয় দিন: খুব ভোরে কংলাক পাড়ায় উঠে সূর্যোদয় আর মেঘ দেখুন। নাশতার পর এসকর্টে খাগড়াছড়ি ফিরে আলুটিলা গুহা ও রিছাং ঝরনা ঘুরে আসুন। রাতের বাসে ঢাকা।
বিজ্ঞাপন
এই সূচিতে অফিস থেকে মাত্র এক দিনের ছুটি নিয়ে বৃহস্পতিবার রাতে রওনা দিয়ে শনিবার সকালে ঢাকায় ফেরা যায়। হাতে আরেকটি দিন থাকলে সাজেকে দুই রাত কাটান, তাড়াহুড়া ছাড়া মেঘের আসা-যাওয়া দেখার আনন্দই আলাদা।
প্রস্তুতি ও সতর্কতা
জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি, পর্যাপ্ত নগদ টাকা, পাওয়ার ব্যাংক, টর্চ, রেইনকোট বা ছাতা, আরামদায়ক জুতা আর প্রয়োজনীয় ওষুধ সঙ্গে রাখুন। পাহাড়ি পথে বমির প্রবণতা থাকলে আগে থেকে চিকিৎসকের পরামর্শমতো ওষুধ নিয়ে নিন। সাজেকে এটিএম বুথ পাওয়ার আশা করবেন না, খাগড়াছড়ি থেকেই প্রয়োজনীয় টাকা তুলে নিন।
পার্বত্য এলাকায় নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে মাঝে মাঝে পর্যটক চলাচলে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। যাওয়ার আগে খাগড়াছড়ি বা রাঙামাটি জেলা প্রশাসনের সর্বশেষ নির্দেশনা দেখে নিন। চাঁদের গাড়ির ছাদে বসে যাত্রা ঝুঁকিপূর্ণ, পাহাড়ি বাঁকে দুর্ঘটনা ঘটে। জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি সঙ্গে রাখুন, পথে তল্লাশিচৌকিতে দেখাতে হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
পাহাড়ি মানুষের ছবি তোলার আগে অনুমতি নিন, তাঁদের ঘরবাড়িতে ঢুকে পড়বেন না। মোবাইল নেটওয়ার্ক কোথাও কোথাও দুর্বল থাকে, তাই দলের সঙ্গে আগে থেকেই মিলিত হওয়ার জায়গা ঠিক করে রাখুন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
সাজেক কোন জেলায়?
সাজেক রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলায়। তবে যাতায়াতের সুবিধার কারণে পর্যটকেরা খাগড়াছড়ি হয়ে যান।
বিজ্ঞাপন
এক দিনে কি সাজেক ঘুরে আসা যায়?
খাগড়াছড়ি থেকে সকালে গিয়ে বিকেলের এসকর্টে ফেরা সম্ভব। কিন্তু সাজেকের আসল সৌন্দর্য সন্ধ্যা আর ভোরে, তাই অন্তত এক রাত থাকাই ভালো।
নিজের গাড়ি নিয়ে কি সাজেক যাওয়া যায়?
যাওয়া যায়, তবে পাহাড়ি খাড়া পথে অভিজ্ঞ চালক জরুরি। এসকর্টের নিয়ম ব্যক্তিগত গাড়ির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
বিজ্ঞাপন
সাজেকে কি মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়া যায়?
রুইলুই পাড়ায় কয়েকটি অপারেটরের নেটওয়ার্ক পাওয়া যায়, তবে গতি সব সময় ভালো থাকে না। পথে অনেক জায়গায় নেটওয়ার্ক থাকে না।