ঢাকার দর্শনীয় স্থান: শহরের ভেতরে ঘুরতে যাওয়ার সেরা জায়গা
ট্রাভেল ডেস্ক · ঢাকা
প্রকাশ:
যানজট আর ব্যস্ততার শহর হিসেবে ঢাকার যে পরিচিতি, তার আড়ালে চাপা পড়ে আছে চার শ বছরের বেশি পুরোনো এক নগরের ইতিহাস। মোগল আমলের কেল্লা, নবাবদের প্রাসাদ, শত বছরের পুরোনো মসজিদ-মন্দির-গির্জা, আবার বিশ্বখ্যাত স্থপতির নকশা করা সংসদ ভবন, সবই এই শহরের ভেতরে। ঘুরতে যাওয়ার জায়গার খোঁজে তাই ঢাকার বাইরে না গিয়েও একটি দিন দারুণভাবে কাটানো যায়।
বিজ্ঞাপন
ঢাকায় ঘোরার সবচেয়ে বুদ্ধিমান উপায় হলো এলাকা ধরে পরিকল্পনা করা। এক দিনে পুরান ঢাকা, আরেক দিনে শাহবাগ থেকে আগারগাঁও, এভাবে ভাগ করলে যানজটে সময় নষ্ট কম হয়। মেট্রোরেল চালু হওয়ায় উত্তরা, মিরপুর, আগারগাঁও, শাহবাগ আর মতিঝিলের মধ্যে চলাচলও এখন অনেক সহজ।
একটি কথা আগে জেনে রাখুন। জাদুঘর আর প্রত্নস্থানগুলো সপ্তাহে নির্দিষ্ট দিনে বন্ধ থাকে, শুক্রবারে অনেক জায়গা খোলে জুমার নামাজের পর। যাওয়ার আগে সময়সূচি দেখে নিলে খালি হাতে ফিরতে হবে না।
পুরান ঢাকা: ইতিহাসের শহর
১. লালবাগ কেল্লা: সপ্তদশ শতকে মোগল সুবাদার শাহজাদা আজম এর নির্মাণ শুরু করেন, পরে শায়েস্তা খানের আমলে কাজ থেমে যায়। কেল্লার ভেতরে পরীবিবির সমাধি, দরবার হল আর তিন গম্বুজের মসজিদ আছে। সবুজ লন আর পুরোনো দেয়াল মিলিয়ে বিকেলে ঘোরার জন্য জায়গাটি চমৎকার। সাধারণত রোববার পুরো দিন আর সোমবার অর্ধদিবস বন্ধ থাকে।
বিজ্ঞাপন
২. আহসান মঞ্জিল: বুড়িগঙ্গার তীরে গোলাপি রঙের এই প্রাসাদ ছিল ঢাকার নবাবদের বাসভবন। এখন এটি জাতীয় জাদুঘরের অধীন একটি জাদুঘর, ভেতরে নবাব আমলের আসবাব, ছবি আর ব্যবহার্য জিনিস সাজানো। সাধারণত বৃহস্পতিবার বন্ধ থাকে।
৩. তারা মসজিদ: আরমানিটোলায় সাদা মার্বেলের ওপর নীল তারার নকশা আর চীনামাটির টুকরো দিয়ে সাজানো মসজিদ। নামাজের সময় এড়িয়ে শালীন পোশাকে যান।
৪. আর্মেনিয়ান চার্চ ও ঢাকেশ্বরী মন্দির: আরমানিটোলার আর্মেনিয়ান চার্চ ঢাকায় একসময়ের আর্মেনীয় বণিকদের স্মৃতি বহন করে। আর ঢাকেশ্বরী মন্দির দেশের হিন্দুধর্মাবলম্বীদের গুরুত্বপূর্ণ উপাসনালয়। দুই জায়গাতেই উপাসনার পরিবেশ বজায় রেখে ঘুরতে হয়।
৫. সদরঘাট ও শাঁখারীবাজার: সদরঘাটে বুড়িগঙ্গার বুকে লঞ্চ আর নৌকার ব্যস্ততা দেখার মতো, চাইলে খেয়ানৌকায় নদীতে খানিকটা ঘুরে আসা যায়। কাছেই শাঁখারীবাজারের সরু গলি, যেখানে শাঁখার কারিগরদের কাজ আর পুরোনো বাড়িগুলো এক ভিন্ন ঢাকার ছবি দেখায়।
বিজ্ঞাপন
৬. বলধা গার্ডেন: ওয়ারীতে শত বছরের পুরোনো এই উদ্যানে দুর্লভ প্রজাতির অনেক গাছ সংরক্ষিত আছে। পুরান ঢাকার কোলাহলের মাঝে শান্ত একটি সবুজ কোণ, উদ্ভিদপ্রেমীদের ভালো লাগবে।
পুরান ঢাকার সরু রাস্তায় গাড়ির চেয়ে রিকশাই ভালো। সকালে লালবাগ দিয়ে শুরু করে দুপুরে আহসান মঞ্জিল আর বিকেলে তারা মসজিদ ও আর্মেনিয়ান চার্চ, এভাবে একটি দিন সাজানো যায়। দুপুরে পুরান ঢাকার কাচ্চি বা তেহারি আর বিকেলে বাকরখানি চেখে দেখতে ভুলবেন না।
শাহবাগ, রমনা ও বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা
জাতীয় জাদুঘর শাহবাগে, দেশের সবচেয়ে বড় জাদুঘর। প্রাচীন মুদ্রা, ভাস্কর্য, লোকশিল্প, প্রাকৃতিক ইতিহাস আর মুক্তিযুদ্ধের নিদর্শন দেখতে অন্তত দুই-তিন ঘণ্টা লাগে। সাধারণত বৃহস্পতিবার বন্ধ, শুক্রবার খোলে জুমার পর।
বিজ্ঞাপন
কাছেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা। লাল ইটের কার্জন হল, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার আর বাংলা একাডেমি একসঙ্গে হেঁটে দেখা যায়। পাশেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও রমনা পার্ক। ভোরে রমনায় হাঁটতে আসা মানুষের ভিড় আর পয়লা বৈশাখের বটমূলের আয়োজন এই পার্কের পরিচিতি। ফেব্রুয়ারিতে বাংলা একাডেমির বইমেলা চললে এ এলাকার রূপ পুরো বদলে যায়।
আগারগাঁও ও শেরেবাংলা নগর
জাতীয় সংসদ ভবন বিশ্বখ্যাত স্থপতি লুই আই কানের নকশায় তৈরি, স্থাপত্যপ্রেমীদের কাছে এটি তীর্থস্থানের মতো। বাইরে থেকে ভবন, লেক আর চারপাশের খোলা চত্বর দেখা যায়। ভেতরে প্রবেশ সাধারণত বিশেষ অনুমতি সাপেক্ষ।
আগারগাঁওয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর অবশ্যই দেখার মতো। মুক্তিযুদ্ধের দলিল, ছবি, শহীদদের ব্যবহৃত জিনিস আর গণহত্যার নিদর্শন সাজানো আছে কয়েকটি গ্যালারিতে। শিশু-কিশোরদের নিয়ে গেলে ইতিহাস জানার ভালো সুযোগ হয়। এই এলাকায় নভোথিয়েটার আর জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘরও আছে, শিশুরা এগুলো বেশ উপভোগ করে। মেট্রোরেলের আগারগাঁও স্টেশন থেকে এসব জায়গা কাছেই।
বিজ্ঞাপন
মিরপুর, হাতিরঝিল ও খোলা জায়গা
১. জাতীয় চিড়িয়াখানা ও জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান: মিরপুরে পাশাপাশি দুটি বড় খোলা জায়গা। চিড়িয়াখানায় বাঘ, সিংহ, হাতি, জিরাফসহ নানা প্রাণী আর উদ্ভিদ উদ্যানে বিস্তীর্ণ সবুজ, লেক আর নানা প্রজাতির গাছ। পুরো দিন রাখলে দুটোই দেখা যায়। চিড়িয়াখানা সপ্তাহে এক দিন বন্ধ থাকে, সময়সূচি দেখে যান।
২. হাতিরঝিল: শহরের মাঝখানে লেক, সেতু আর হাঁটার পথ। সন্ধ্যার পর আলো জ্বললে জায়গাটি জমজমাট হয়। লেকে ওয়াটার ট্যাক্সিতে চড়ে এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যাওয়া যায়।
৩. ধানমন্ডি লেক: সকালের হাঁটা আর বিকেলের আড্ডার জন্য পরিচিত। লেকের পাড়ে বসার জায়গা আর আশপাশে অনেক খাবারের দোকান।
বিজ্ঞাপন
৪. দিয়াবাড়ি: উত্তরার এই এলাকা শরতে কাশফুলের জন্য পরিচিত। মেট্রোরেলের উত্তরা প্রান্তের স্টেশন থেকে কাছেই।
ঘোরার খরচ ও যাতায়াত
ঢাকার বেশির ভাগ দর্শনীয় জায়গায় প্রবেশমূল্য সামান্য, দেশি দর্শনার্থীদের জন্য সাধারণত আনুমানিক ২০ থেকে ৫০ টাকা, শিশুদের জন্য কম। বিদেশি দর্শনার্থীদের জন্য আলাদা ও বেশি টিকিট। পার্ক ও লেকগুলোর বেশির ভাগে প্রবেশ বিনা মূল্যে।
যাতায়াতে মেট্রোরেল সবচেয়ে দ্রুত। উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত লাইনে আগারগাঁও, শাহবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সচিবালয় স্টেশন পর্যটকদের কাজে লাগে। স্টেশন থেকে রিকশা বা হেঁটে গন্তব্যে যাওয়া যায়। রাইড শেয়ারিং অ্যাপও ব্যবহার করতে পারেন, তবে অফিস সময়ে যানজট মাথায় রাখুন।
বিজ্ঞাপন
ঘোরার আগে কয়েকটি পরামর্শ
শুক্র ও শনিবার এবং সরকারি ছুটির দিনে জনপ্রিয় জায়গাগুলোতে ভিড় বেশি থাকে। শান্তভাবে ঘুরতে চাইলে কর্মদিবসের সকালে যান। গ্রীষ্মে দুপুরের রোদ এড়িয়ে সকাল ও বিকেলে খোলা জায়গাগুলো রাখুন, দুপুরে রাখুন জাদুঘর। জাদুঘরের ভেতরে ছবি তোলার নিয়ম জায়গাভেদে আলাদা, প্রবেশের সময় জেনে নিন। পুরান ঢাকার ভিড়ে মোবাইল ও মানিব্যাগ সাবধানে রাখুন, আর পানির বোতল সঙ্গে নিন।
কিছু সময়ে পুরান ঢাকা ঘোরার আনন্দ দ্বিগুণ হয়। পৌষের শেষ দিনে সাকরাইন উৎসবে পুরান ঢাকার ছাদে ছাদে ঘুড়ি ওড়ানোর ধুম পড়ে, সন্ধ্যায় আতশবাজি আর আলোয় ভরে যায় আকাশ। রমজানে চকবাজারের ইফতারির বাজার দেখতে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসেন। এসব দিনে ভিড় অনেক বেশি থাকে, তাই শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে গেলে আগে থেকে পরিকল্পনা করুন। আর যেকোনো সময় পুরান ঢাকার পুরোনো বাড়িগুলোর ছবি তুলতে চাইলে বাসিন্দাদের ব্যক্তিগত পরিসরের প্রতি সম্মান রাখুন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিজ্ঞাপন
এক দিনে ঢাকার কোন কোন জায়গা ঘোরা যায়?
এক দিনে পুরান ঢাকার লালবাগ কেল্লা, আহসান মঞ্জিল, তারা মসজিদ আর সদরঘাট আরামে দেখা যায়। আরেক দিন রাখুন শাহবাগ ও আগারগাঁওয়ের জন্য।
শিশুদের নিয়ে ঢাকায় কোথায় যাওয়া ভালো?
জাতীয় চিড়িয়াখানা, জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান, নভোথিয়েটার, বিজ্ঞান জাদুঘর আর মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর শিশুদের জন্য উপযোগী।
বিজ্ঞাপন
লালবাগ কেল্লা কোন দিন বন্ধ থাকে?
সাধারণত রোববার পুরো দিন বন্ধ থাকে, সোমবার খোলে দুপুরের পর। সরকারি ছুটিতে সময়সূচি বদলাতে পারে।
ঢাকায় সন্ধ্যায় ঘোরার জায়গা কোনগুলো?
হাতিরঝিল, ধানমন্ডি লেক আর সংসদ ভবনের আশপাশের এলাকা সন্ধ্যায় ঘোরার জন্য জনপ্রিয়।