আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাকে ‘অত্যন্ত দুঃখজনক’ বলে অভিহিত করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। একই সঙ্গে আদালতটির কার্যক্রম সচল রাখতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতির কথাও জানিয়েছে জোটটি। খবর ইউরো নিউজের।
শুক্রবার (০৯ অক্টোবর) ইউরোপীয় কমিশন এক বিবৃতিতে জানায়, আইসিসি যাতে কার্যকরভাবে কাজ চালিয়ে যেতে পারে, তা নিশ্চিত করতে আদালতটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে ইইউ। নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার আগে ছয় মাস সময় দেওয়ায় আলোচনার সুযোগ রয়েছে বলেও আশা প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।
ইইউর সম্ভাব্য পাল্টা পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে ‘ব্লকিং মেকানিজম’ নামে পরিচিত একটি আইনি ব্যবস্থা সক্রিয় করা। এর মাধ্যমে ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা মেনে চলতে বাধা দেওয়া যায়। নিষেধাজ্ঞার সরাসরি বা পরোক্ষ প্রভাব কমাতে এই ব্যবস্থা ব্যবহার করতে পারে জোটটি।
শুক্রবার নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানান ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা ও নেদারল্যান্ডসের প্রধানমন্ত্রী রব ইয়েটেন।
কস্তা বলেন, ‘প্রতিশোধের একমাত্র বিকল্প হলো বিচার, আন্তর্জাতিক বিচার। জবাবদিহি ছাড়া দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে আমরা যুক্তরাষ্ট্রকে আগামী ছয় মাসের মধ্যে আলোচনায় বসার আহ্বান জানাই। তবে আইসিসিকে সমর্থন দেওয়া, আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা বজায় রাখা এবং আদালতের সদস্য ও কর্মীদের সুরক্ষায় আমাদের পূর্ণ অঙ্গীকার রয়েছে।’
নেদারল্যান্ডসের প্রধানমন্ত্রী রব ইয়েটেনও আইসিসিকে রক্ষায় তার দেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘আইসিসিকে রক্ষার জন্য যা যা করা প্রয়োজন, আমরা তা-ই করব।’
আইসিসির ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা কেন?
যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করতে আইসিসি প্রতিষ্ঠা করা হয়। আদালতটির উদ্দেশ্য হলো, অন্যথায় বিচারহীন থেকে যেতে পারে; এমন গুরুতর অপরাধের জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা।
ট্রাম্প প্রশাসন আইসিসির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ তুলে আদালতটির ওপর ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ওয়াশিংটনের দাবি, আদালতটি যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নাগরিকদের অন্যায্যভাবে লক্ষ্যবস্তু করছে।
শুক্রবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দেন। দক্ষিণ আফ্রিকার কৌঁসুলি ও আইসিসির সাবেক বিচারক নাভি পিল্লাই নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার অল্প সময় পর এ ঘোষণা আসে। তবে নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্ত নোবেল পুরস্কার ঘোষণার আগেই নেওয়া হয়েছিল।
রুবিও বলেন, ‘আমরা এই নিয়ন্ত্রণহীন আদালতের সঙ্গে লেনদেন নিষিদ্ধ করব। এর সম্পদ বন্ধ করে দেব এবং আমাদের বিরুদ্ধে কাজ করার সক্ষমতা পঙ্গু করে দেব। যুক্তরাষ্ট্র ও মার্কিন জনগণ এই ভুয়া আইসিসির এখতিয়ারের অধীন নয়।’
নিষেধাজ্ঞার আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে থাকা আইসিসির সম্পদ জব্দ করা হবে। পাশাপাশি মার্কিন কোম্পানি ও ব্যক্তিদের আদালতটির সঙ্গে ব্যবসায়িক লেনদেন বন্ধ করতে ছয় মাস সময় দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, গাজায় সংঘটিত কথিত অপরাধের অভিযোগে আইসিসির জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানার মুখে থাকা ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে স্বাগত জানিয়েছেন।
শুক্রবার নেতানিয়াহুর দপ্তর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেছে, ‘আইসিসি কোনো আদালত নয়। এটি একটি রাজনৈতিক সংস্থা, যা বিশ্বজুড়ে আইন মেনে চলা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর জন্য এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বের ধারণার জন্য মারাত্মক হুমকি।’
নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে আইসিসির প্রতিক্রিয়া
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার নিন্দা জানিয়েছে আইসিসি। আদালতটি বলেছে, এই পদক্ষেপ আইনের শাসন ও আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থার ওপর আঘাত।
এক বিবৃতিতে আইসিসি জানায়, ‘এটি বিচারপ্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি এবং আদালতকে যে উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, সেই কাজ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা। এটি আইনের শাসন ও আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থার ভিত্তির ওপর আঘাত। এর মাধ্যমে সেই মৌলিক নীতিকে আঘাত করা হচ্ছে, যার কথা হলো, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়।’
আইসিসির প্রেসিডেন্ট তোমোকো আকানে বলেছেন, গুরুতর অপরাধের অসংখ্য ভুক্তভোগীর স্বার্থে আদালতটি স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে তার দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখবে। তিনি বলেন, আদালত কেবল আইন ও প্রমাণের ভিত্তিতেই কাজ করবে।
সূত্র : ইউরো নিউজ








মন্তব্য