নিউজিল্যান্ডের বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের মাত্রা রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। এর ফলে দেশটিতে আরও ঘন ঘন ও তীব্র তাপপ্রবাহ, শক্তিশালী ঝড় ও ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি বাড়ছে। একই সঙ্গে চলতি শতাব্দীর শেষ নাগাদ দেশটির প্রায় সব হিমবাহের বরফ গলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বুধবার প্রকাশিত ‘আওয়ার অ্যাটমোসফিয়ার অ্যান্ড ক্লাইমেট ২০২৬’ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। নিউজিল্যান্ডের পরিবেশ ও পরিবহনবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং স্ট্যাটিস্টিকস নিউজিল্যান্ডের যৌথ প্রতিবেদনে দেশটির পরিবেশ ও জলবায়ুর বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯০৯ সালে তাপমাত্রার রেকর্ড রাখা শুরুর পর থেকে নিউজিল্যান্ডের বার্ষিক গড় তাপমাত্রা ১ দশমিক ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। গত এক দশকের মধ্যেই দেশটির রেকর্ড করা সবচেয়ে উষ্ণ ১০ বছরের মধ্যে সাতটি বছর ছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উষ্ণতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিউজিল্যান্ডের হিমবাহগুলো দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে। দেশটিতে প্রায় ৩ হাজার হিমবাহ রয়েছে। ১৯৯৭ সালে এসব হিমবাহে মোট বরফের পরিমাণ ছিল প্রায় ৫৬ ঘন কিলোমিটার। ২০২৩ সালে তা কমে ৩০ ঘন কিলোমিটারে নেমে এসেছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিভিন্ন পরিস্থিতি বিবেচনা করে করা পূর্বাভাসে হিমবাহ আরও সংকুচিত হওয়ার উচ্চঝুঁকি দেখা গেছে। কম নিঃসরণ পরিস্থিতিতে ২১০০ সালের মধ্যে হিমবাহগুলোর বরফের পরিমাণ ১৪ থেকে ৮৬ শতাংশ কমে যেতে পারে। আর উচ্চ নিঃসরণ পরিস্থিতিতে কমতে পারে ৬৯ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত।
প্রতিবেদনের প্রধান বিজ্ঞান উপদেষ্টা অ্যালিসন কলিন্স বলেন, হিমবাহের এই ক্ষয় অত্যন্ত বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এদিকে নিউজিল্যান্ডের বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাইঅক্সাইডের মাত্রা ১৯৭২ সালে পরিমাপ শুরু হওয়ার পর থেকে ৩০ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৫ সালে মিথেনের ঘনত্বও সামান্য বেড়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রিনহাউস গ্যাসের কারণে অতিরিক্ত তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাব এখন সমুদ্রের উষ্ণতা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন এবং চরম আবহাওয়ার ঘটনায় দেখা যাচ্ছে।
দেশজুড়ে তাপপ্রবাহের সংখ্যা, স্থায়িত্ব ও তীব্রতা বাড়বে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০৫০ সালের মধ্যে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রার দিনের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। এতে শারীরিক অসুস্থতা, বিভিন্ন রোগ ও মানসিক চাপসহ তাপজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়বে।
উষ্ণ হয়ে উঠছে নিউজিল্যান্ডের সমুদ্রও। ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, দেশটির সমুদ্র বিশ্বের গড় হারের তুলনায় ৩৪ শতাংশ বেশি দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে সামুদ্রিক প্রাণী ও উদ্ভিদের ওপর। সামুদ্রিক স্পঞ্জের ব্যাপক বিবর্ণতা, সামুদ্রিক শৈবালের মৃত্যু, মাছের অস্বাভাবিকভাবে তীরে ভেসে আসা এবং পেঙ্গুইনের মৃত্যুর মতো ঘটনা এরই মধ্যে দেখা গেছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শক্তিশালী ঝড় ও ঘূর্ণিঝড়, খরা এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকিও বাড়ছে। এতে কৃষি ও বিভিন্ন প্রাণী ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে অবকাঠামো ও বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি মাওরি জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে প্রবেশাধিকারও কমে যেতে পারে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঘূর্ণিঝড় গ্যাব্রিয়েল ও ২০২৩ সালের অকল্যান্ডের বন্যার মতো ভয়াবহ দুর্যোগে নিউজিল্যান্ডে প্রাণহানি ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এসব দুর্যোগে দেশটির কয়েক বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতিও হয়েছে।
অ্যালিসন কলিন্স বলেন, নিউজিল্যান্ডের বর্তমান অবকাঠামো ও অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল জলবায়ুর ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। সেই জলবায়ু পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলে এর প্রভাব শুধু পরিবেশে নয়, মানুষের জীবন ও অর্থনীতিতেও পড়বে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান








মন্তব্য