স্টারলিংক স্যাটেলাইট যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবহারে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাসঘাতকতার কথা জানিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। এতে ইউক্রেনের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সমর্থন নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
লন্ডন সফরে গিয়ে জেলেনস্কি অভিযোগ করেন, চার বছরের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধের মধ্যে ট্রাম্প কার্যত রাশিয়ার পক্ষ বেছে নিচ্ছেন। মস্কো থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ডিজেল কেনার সম্মতিকে ঘিরেও দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামের সঙ্গে বৈঠকের আগেব্রিটিশ টক শো ‘পিয়ার্স মরগান আনসেন্সরড’-এ দেওয়া সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কিকে প্রশ্ন করা হয়, স্টারলিংক ব্যবহারে আকস্মিক বিধিনিষেধ ইচ্ছাকৃতভাবে আরোপ করা হয়েছে কি না এবং এ ঘটনায় তিনি ট্রাম্পের কাছে বিশ্বাসঘাতকতা অনুভব করছেন কি না।
জবাবে জেলেনস্কি বলেন, ‘সত্যি বলতে, হ্যাঁ। তবে বিষয়টি শুধু আমার আবেগ বা অনুভূতির চেয়ে কিছুটা জটিল। দুঃখজনক যে আমরা একজন শক্তিশালী অংশীদারকে হারাচ্ছি।’
রাতের দিকে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী জানায়, কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই স্টারলিংক স্যাটেলাইট যোগাযোগব্যবস্থার গতি ঘণ্টায় ১০০ মাইলের বেশি বেগে চলা টার্মিনালগুলোর ক্ষেত্রে সীমিত হয়ে পড়ে। ইলন মাস্কের মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের তৈরি এই ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্র সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্কের মাধ্যমেও সামরিক কাজে ব্যবহৃত হয়।
এর ফলে যুদ্ধের সম্মুখসারির পেছনে রুশ অবস্থানে হামলা চালাতে ইউক্রেনের ব্যবহৃত বহু ড্রোন কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে। পরে জানা যায়, রাশিয়ার জেট ইঞ্জিনচালিত হামলাকারী ড্রোন প্রতিহত করতে ইউক্রেনের ব্যবহৃত কার্যকর আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও এতে প্রভাবিত হয়েছে।
জেলেনস্কি বলেন, ‘আমি নিশ্চিত, তারা জানত তারা কী করছে। কারণ রাত ১টার দিকে স্পেসএক্স ও যুক্তরাষ্ট্র স্টারলিংক বন্ধ করে দেয়। এই সিদ্ধান্তের কারণে বহু মানুষ প্রাণ হারাবেন। অবশ্যই মানুষ মারা যাবে।’
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো আগাম সতর্কতা ছাড়াই রাশিয়া টানা দ্বিতীয় রাতের মতো ইউক্রেনে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর সময় এ ঘটনা ঘটে। হামলার আগে রুশ আক্রমণ সম্পর্কে ইউক্রেনকে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করে আসছিল যুক্তরাষ্ট্র।
মঙ্গলবার ট্রাম্প প্রশাসন গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান বন্ধ করেছে এমন দাবি অস্বীকার করেন ট্রাম্প। তবে বুধবার প্রচারিত যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যম এনপিআরকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কি বলেন, ভবিষ্যতে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ সীমিত করা হতে পারে বলে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সামরিক উপদেষ্টাদের হুমকি দেওয়া হয়েছে।
রুশ তেল শোধনাগারে হামলা বন্ধ করতে ইউক্রেনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ট্রাম্প। ডিজেলের উচ্চমূল্যের জন্য এসব হামলাকে দায়ী করেছেন তিনি। তবে অধিকাংশ বিশ্লেষকের মতে, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রভাব বৈশ্বিক জ্বালানির দামে আরও বেশি পড়েছে।
২০২৫ সালের বসন্তে হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে জেলেনস্কির এক সফরকে কেন্দ্র করে দুই নেতার সম্পর্কে বড় ধরনের ফাটল দেখা দেয়। ওই বৈঠকে ট্রাম্প বলেছিলেন, যুদ্ধ জয়ের মতো প্রয়োজনীয় সুবিধা জেলেনস্কির হাতে নেই। ওই বিরোধের পর যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে ইউরোপীয় মিত্রদেরও তৎপর হতে হয়।
বুধবার ডাউনিং স্ট্রিটে জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠক করেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বার্নহাম। বৈঠকের কয়েক ঘণ্টা আগে তিনি ব্রিটিশ সংসদ সদস্যদের বলেছিলেন, জেলেনস্কি ‘খালি হাতে ফিরবেন না’। ইউক্রেনের জন্য আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং সামরিক সহায়তা দ্রুত দেওয়ার উপায় খুঁজতে কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়ার কথাও জানান তিনি।
বৈঠকে বার্নহাম ইউক্রেনের প্রতি যুক্তরাজ্যের অব্যাহত সমর্থনের আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, ‘ব্রিটেনে আপনি সবার সংহতি ও সমর্থন দেখেছেন। আমরা আপনার পাশে আছি, আর তা বদলাবে না।’
বাকিংহাম প্রাসাদে রাজা তৃতীয় চার্লসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন জেলেনস্কি। সাংবাদিকদের সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে তিনি বলেন, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে স্টারলিংক ব্যবহারের সুযোগ এবং গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের বিষয়টি তুলতে চান তিনি।
বার্নহাম ইউক্রেনে ব্রিটিশ হালকা বহুমুখী ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ দ্রুত করার প্রতিশ্রুতি দেন। রুশ ড্রোন হামলা প্রতিহত করতে এসব ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ইউক্রেন। আরও সহায়তার জন্য ‘সব সম্ভাব্য পথ’ খতিয়ে দেখার কথাও জানান তিনি।
জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধে ট্রাম্পের প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতি নিয়েও আলোচনায় আগ্রহ প্রকাশ করেন বার্নহাম। তবে তিনি স্বীকার করেন, মস্কো এ যুদ্ধবিরতি মেনে চলেনি। বার্নহাম বলেন, ‘দুঃখজনকভাবে, ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামোয় রাশিয়ার আরও হামলা আমরা দেখেছি।’
স্টারলিংক ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা আরোপের সিদ্ধান্ত নিজের নয় বলে জানিয়েছেন ইলন মাস্ক। তার মতে, অস্ত্র ব্যবহারে যুক্ত গ্রাহকদের সরাসরি স্টারলিংক ব্যবহারের লাইসেন্স দেওয়া হয় না। ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ‘স্টারশিল্ড’ নামের একটি নেটওয়ার্ক ব্যবহার করছিল, যা যুক্তরাষ্ট্র সরকার পরিচালনা করে।
মাস্ক বলেন, ‘স্টারশিল্ড ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্র সরকারের মালিকানাধীন এবং তাদের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়। এর গতি বা ব্যবহারসংক্রান্ত যেকোনো সীমাবদ্ধতার সিদ্ধান্ত নেয় মার্কিন সামরিক বাহিনী এবং শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট।’
জেলেনস্কির সামরিক প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সেরহি বেস্ক্রেস্তনভ বলেন, ঘণ্টায় ১০০ মাইলের বেশি গতিতে চলা টার্মিনালগুলো হঠাৎ সংযোগ হারায়। সামরিক বাহিনী ও অন্যান্য জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার জন্য ব্যবহৃত স্টারলিংকের একটি সংস্করণেও এ সমস্যা দেখা দেয়। তার মতে, এটি সামরিক অভিযান ব্যাহত করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত লক্ষ্যভিত্তিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার ঘটনা হতে পারে।
বেস্ক্রেস্তনভ বলেন, ‘আমাদের সশস্ত্র বাহিনী এসব বিধিনিষেধের বিষয়ে কোনো সতর্কতা পায়নি। এর ফলে বেশ কয়েকটি অভিযান ব্যর্থ হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এ পদক্ষেপ যে কাকতালীয় নয়, তা স্পষ্ট। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে।’
বেস্ক্রেস্তনভের মতে, ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে স্টারলিংক ব্যবহৃত হচ্ছে জেট ইঞ্জিনচালিত শাহেদ ড্রোন ঠেকানোর সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতিগুলোর একটিতে। রাশিয়া এখন ইউক্রেনে ব্যাপকসংখ্যায় এসব ড্রোন ব্যবহার করছে।
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের অংশীদারদের এই পদক্ষেপে আত্মরক্ষার জন্য হাতে থাকা অল্প কয়েকটি সুযোগের একটি থেকে আমরা বঞ্চিত হচ্ছি।’ রাশিয়া ড্রোনের ইঞ্জিন উন্নত করার পর গ্রীষ্মের শুরুতে শাহেদ ড্রোন প্রতিহত করার হার ৯০ শতাংশের বেশি থেকে কমে প্রায় ৬০ শতাংশে নেমে এসেছিল বলেও জানান তিনি।
স্টারলিংক ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা রাশিয়ার দখলে থাকা ইউক্রেনীয় ভূখণ্ডে মাঝারি পাল্লার ড্রোন দিয়ে হামলা চালানোর ক্ষেত্রেও জটিলতা তৈরি করবে। তবে এর প্রভাব পড়ার কথা নয় রাশিয়ার তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের দূরপাল্লার হামলায়। কারণ, রাশিয়ার ভেতরে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে স্টারলিংক ব্যবহার করতে ইউক্রেনকে নিষেধ করা হয়েছে।
জেলেনস্কি জানান, মঙ্গলবার গভীর রাতে ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোয় বড় ধরনের হামলা চালায় রাশিয়া। কিয়েভ ও খারকিভ লক্ষ্য করে ৩৯টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১২০টি হামলাকারী ড্রোন ছোড়া হয়। পাঁচটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র, গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র এবং বড় শহরগুলোর প্রয়োজনীয় অবকাঠামোতে হামলা হয়।
জেলেনস্কির হিসাবে, অন্তত ছয় লাখ মানুষ বিদ্যুৎবিহীন হয়ে পড়েছেন। পরিস্থিতি আরও বিস্তৃত হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
গত সপ্তাহে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে ‘জ্বালানি যুদ্ধবিরতি’ ঘোষণার কথা জানান ট্রাম্প। তবে এ সমঝোতা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি। জেলেনস্কি বলেন, ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ঘোষণা দেওয়ার আগে এ চুক্তির বিষয়ে তিনি কিছুই জানতেন না।
অন্যদিকে বুধবার ক্রেমলিন দাবি করে, ট্রাম্প নির্দিষ্ট করে বলেননি কোন কোন জ্বালানি অবকাঠামো এ যুদ্ধবিরতির আওতায় পড়বে। তাই রাশিয়া যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করছে এমন দাবি করা যায় না।
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ সাংবাদিকদের বলেন, ‘ট্রাম্পের প্রস্তাবিত জ্বালানি যুদ্ধবিরতির বিস্তারিত নির্দিষ্ট করা হয়নি। তাই রাশিয়া তা মানছে না বলে দাবি করা যায় না।’
সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান








মন্তব্য