সন্তানের জন্য মায়ের অপেক্ষা, এ যেন পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ প্রতীক্ষা। কিন্তু সেই অপেক্ষা যখন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়, তখন সময়ের সঙ্গে বাড়তে থাকে বুকের ভেতর জমে থাকা হাহাকার। চলচ্চিত্র অভিনেত্রী নাসিমা খানের জীবনের শেষ কয়েকটি মাসও কেটেছে এমনই এক অনিশ্চয়তায়। নিখোঁজ হওয়া ছেলে ফিরবে, মায়ের বুকে আবারও ফিরবে- এমন আশায় বুক বেঁধে রাখা সেই মা অপেক্ষার প্রহর গুণেই পাড়ি জমালেন পরপারে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে নিখোঁজ হন অভিনেত্রীর ছোট ছেলে নাবিল নাছির রহমান কুশল। সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত ছেলেটি হারিয়ে যাওয়ার পর থেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন অভিনেত্রী। মায়ের মন বারবার হয়তো খুঁজেছে ফিরে আসার কোনো বার্তা, কোনো সুখবর। কিন্তু সেই অপেক্ষার শেষ কোথায়, তা জানা ছিল না তার।
দিন গড়িয়েছে, মাস পেরিয়েছে, কিন্তু ছেলের কোনো খোঁজ না পাওয়ার কষ্ট বয়ে বেড়াতে হয়েছে তাকে। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শরীরের সঙ্গে যেন প্রতিনিয়ত লড়াই করেছে সন্তানের জন্য উদ্বিগ্ন এক মন।
যে মা একসময় ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে অসংখ্য চরিত্রে প্রাণ দিয়েছেন, বাস্তব জীবনে সেই মায়ের নিজের গল্পটিই হয়ে উঠেছিল গভীর বেদনার। পর্দার আলো-ঝলমলে দিন পেছনে ফেলে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তার সবচেয়ে বড় চাওয়া হয়ে উঠেছিল একটাই, ছেলেকে ফিরে পাওয়া।
জীবনের শেষ সময়ে তার মনে কী চলছিল, তা হয়তো আর কখনো জানা যাবে না। তবে ছোট ছেলেকে ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা যে তাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল, তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল তার বিভিন্ন সাক্ষাৎকারের আকুতিতে।
একসময় সিনেমার পর্দায় নানা চরিত্রে অভিনয় করেছেন নাসিমা খান। কখনো হয়তো হয়েছেন কারও মা, কারও প্রিয়জন, কিংবা কোনো গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র। অথচ বাস্তব জীবনে নিজের গল্পে শেষ পর্যন্ত পূর্ণতা পেল না সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত অধ্যায়টি। ছোট ছেলেকে ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণ রেখেই ৮২ বছর বয়সে গত রোববার (১১ অক্টোবর) বিদায় নিলেন অভিনেত্রী নাসিমা খান। রেখে গেলেন এক মায়ের অপেক্ষার গল্প। যে অপেক্ষার শেষ হলো ঠিকই, কিন্তু পূর্ণ হলো না তার চাওয়া।
অন্যদিকে, বড় ছেলে শাবাব নাসিম রহমান যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন। মায়ের মৃত্যুর সংবাদ পেয়েই দেশে ফেরার উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি সূত্রে জানা গেছে, নাসিমা খানের বড় ছেলে ১৪ তারিখে দেশে ফিরবেন। ১৫ তারিখে তার দাফন হবে। এছাড়া ছেলে দেশে ফিরলেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে অভিনেত্রীর মরদেহ বিএফডিসিতে আনা হবে কি না।
উল্লেখ্য, ১৯৫৯ সালে ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে বড় পর্দায় অভিষেক ঘটে নাসিমা খানের। এরপর ১৯৬১ সালে ‘যে নদী মরু পথে’ সিনেমায় নায়িকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। এ সিনেমার মাধ্যমে দর্শক মহলে পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা অর্জন করেন এই অভিনেত্রী। ষাটের দশক থেকে আশির দশক পর্যন্ত বাংলা ও উর্দু চলচ্চিত্রে নিয়মিত অভিনয় করে নিজের অবস্থান তৈরি করেন নাসিমা খান। সে সময়ের চলচ্চিত্রাঙ্গনে তিনি ছিলেন পরিচিত ও জনপ্রিয় মুখ। দীর্ঘ বিরতির পর ২০১১ সালে ইমপ্রেস টেলিফিল্ম প্রযোজিত ‘কুসুম কুসুম প্রেম’ চলচ্চিত্রে সর্বশেষ তাকে পর্দায় দেখা যায়। ১৯৪৪ সালের ৬ আগস্ট পুরান ঢাকার লালবাগে জন্ম নাসিমা খানের। তার পৈতৃক নিবাস মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার রাঢ়িখাল গ্রামে। তার বাবা মোহাম্মদ মাসুদ খান ছিলেন ব্যবসায়ী।








মন্তব্য