ঈদ ছাড়াই একই দিনে মুক্তি পাচ্ছে ভিন্ন স্বাদের ৩ সিনেমা

ঈদ ছাড়াই একই দিনে মুক্তি পাচ্ছে ভিন্ন স্বাদের ৩ সিনেমা

শারদীয় দুর্গাপূজার মহোৎসবকে কেন্দ্র করে ঢাকাই চলচ্চিত্রে বড় পর্দায় দর্শক টানার প্রস্তুতি নিচ্ছেন দেশীয় নির্মাতারা। ঈদ উৎসবের বাইরে বড় কোনো উৎসবের ছুটিকে কাজে লাগানোর এই প্রয়াসকে চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা একটি অত্যন্ত ইতিবাচক ও সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। আগামীকাল শুক্রবার (১৬ অক্টোবর)…

শারদীয় দুর্গাপূজার মহোৎসবকে কেন্দ্র করে ঢাকাই চলচ্চিত্রে বড় পর্দায় দর্শক টানার প্রস্তুতি নিচ্ছেন দেশীয় নির্মাতারা। ঈদ উৎসবের বাইরে বড় কোনো উৎসবের ছুটিকে কাজে লাগানোর এই প্রয়াসকে চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা একটি অত্যন্ত ইতিবাচক ও সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। আগামীকাল শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) সারা দেশের প্রেক্ষাগৃহ ও মাল্টিপ্লেক্সগুলোতে একসঙ্গে মুক্তি পেতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত ৩টি ঢালিউড চলচ্চিত্র: ‘চিরকুট’, ‘কাট-পিস’ এবং ‘স্নেহের বন্ধন’।

ভিন্ন প্রেক্ষাপট, স্বতন্ত্র গল্পভাবনা ও নিপুণ নির্মাণশৈলীতে সমৃদ্ধ এই ৩টি বহুল প্রতীক্ষিত চলচ্চিত্রের পেছনে থাকা নানা না-বলা গল্প, তারকাদের উপস্থিতি এবং প্রেক্ষাগৃহভিত্তিক মুক্তির পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা নিয়ে সাজানো হয়েছে এই বিশেষ আয়োজন।

চিরকুট: নব্বই দশকের ক্যাম্পাস নস্টালজিয়া ও সত্য ঘটনা

মুনতাসির আকিব পরিচালিত ‘চিরকুট’ সিনেমাটি নির্মিত হয়েছে নব্বইয়ের দশকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ঘটে যাওয়া একটি সত্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে। চলচ্চিত্রটিতে তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ, তারুণ্যের উচ্ছ্বাস, গভীর বন্ধুত্ব, প্রেম এবং শিক্ষার্থীদের জীবনের নানা আবেগঘন অধ্যায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

ছবিটিতে অভিনয় করেছেন শ্যামল মাওলা, আজিজুন মিম, কাজী নওশাবা আহমেদ, সুমন পাটোয়ারী, আবদুল্লাহ আল সেন্টু প্রমুখ। এছাড়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ শিক্ষার্থী এই চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন।

‘চিরকুট’ সিনেমাটির মূল প্রেক্ষাপট নিয়ে শ্যামল মাওলা জানান, এটি শুধু কোনো সাধারণ প্রেমের সিনেমা নয়, বরং একটি বিশেষ সময়ের দলিল। তিনি বলেন, আমাদের এই সিনেমায় নব্বই দশকের সবকিছুই আছে। তখনকার প্রেম, চিঠির আদান-প্রদান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের নস্টালজিয়া—সবই দর্শকেরা এখানে দেখতে পাবেন। এটি একাধারে সুস্থ, সুন্দর ও একটি চমৎকার অনুভূতির সিনেমা। আমরা চেষ্টা করেছি হারিয়ে যাওয়া একটি সুন্দর সময়কে বর্তমান প্রজন্মের সামনে নতুন করে তুলে ধরতে।

‘চিরকুট’-এর ট্রেলার ও রেহান রাসুলের গাওয়া ‘প্রেমে গেলাম ডুবে’ গানটি অবমুক্ত হওয়ার পর থেকে যে প্রতিক্রিয়া পাচ্ছেন, তা নিয়ে পরিচালক মুনতাসির আকিব বলেন, টিজার, ট্রেলার আর রোমান্টিক গান ‘প্রেমে গেলাম ডুবে’ রিলিজের পর থেকে এত রেসপন্স পাচ্ছি, যা দেখে আমি অভিভূত। চিরকুট একটি বিশুদ্ধ বাংলা সিনেমা। দর্শক যেন শুধু একটি গল্প দেখেন না, বরং একটি সময়কে অনুভব করতে পারেন—সেটাই আমাদের চেষ্টা।

সিনেমাটি মূলত মাল্টিপ্লেক্স ও সিনেপ্লেক্সগুলোকে লক্ষ্য করে মুক্তি দেওয়া হচ্ছে। ‘ফিল্ম ম্যানিয়া’র ব্যানারে নির্মিত এই ছবিটির ট্রেলার ও ‘প্রেমে গেলাম ডুবে’ গানটি ইতোমধ্যে দর্শকদের মধ্যে বেশ কৌতূহল তৈরি করেছে। এটি একটি নিখাদ পারিবারিক ও বিনোদনধর্মী চলচ্চিত্র।

কাট-পিস: গার্মেন্টসের ঝুট ব্যবসার অন্ধকার জগৎ

তরুণ নারী নির্মাতা ইফফাত জাহান মম’র পরিচালনা ও প্রযোজনায় নির্মিত হয়েছে ক্রাইম-ড্রামা ঘরানার সিনেমা ‘কাট-পিস’। বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক শিল্পের ভেতরের এক অন্ধকার দিক অর্থাৎ ‘ঝুট ব্যবসা’ বা কাপড়ের টুকরোর ব্যবসাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এর গল্প। এই ব্যবসাকে ঘিরে বিপুল অর্থ, রাজনৈতিক প্রভাব এবং ক্ষমতার যে নির্মম লড়াই চলে, তা-ই সিনেমাটির মূল উপজীব্য।

এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক ঘটছে রাফাহ নানজিবা তোরসার (যিনি ‘মালা’ চরিত্রে অভিনয় করেছেন)। তার বিপরীতে রয়েছেন নবাগত সিফাত আমিন শুভ। এছাড়া অভিনয় করেছেন এলিনা শাম্মী, ইমরান আহমেদ সওদাগর প্রমুখ।

রাফাহ নানজিবা তোরসা তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুসারীদের উদ্দেশ্যে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে লিখেছেন, বহু প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে এই ছবিতেই বড় পর্দায় প্রথমবার আসছি ‘মালা’ হয়ে! মালাকে দেখতে প্রস্তুত তো?

‘কাট-পিস’ প্রসঙ্গে তরুণ নারী নির্মাতা ইফফাত জাহান মম জানান, গার্মেন্টসের ঝুট ব্যবসা আমাদের শহরের খুব পরিচিত একটি বাস্তবতা। কিন্তু এই ব্যবসার ভেতরের মানুষ, তাদের অর্থনৈতিক ও ক্ষমতার সম্পর্ক এবং সেই জগতের সংঘাতকে মূলধারার সিনেমার গল্প হিসেবে তুলে ধরার জায়গাটা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। সেই জায়গা থেকেই ‘কাট-পিস’ নির্মাণের শুরু।

‘ব্ল্যাক পেপার ফিল্মস’-এর ব্যানারে নির্মিত এই সিনেমাটি স্টার সিনেপ্লেক্স ও ব্লকবাস্টার সিনেমাসসহ দেশের প্রায় ২৫টিরও বেশি প্রেক্ষাগৃহে একযোগে মুক্তি পাচ্ছে। ঝুটপট্টির চেনা বাস্তবতাকে বড় পর্দায় বাণিজ্যিক আবহে নিয়ে আসায় চলচ্চিত্রটি নিয়ে দর্শকদের মাঝে বাড়তি আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

স্নেহের বন্ধন: পারিবারিক মেলোড্রামা ও অ্যাকশন

বাণিজ্যিক ধারার নির্মাতা কামরুজ্জামান পরিচালিত ‘স্নেহের বন্ধন’ সিনেমাটি মূলত একটি সামাজিক ও পারিবারিক ঘরানার ছবি। সত্য ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে পারিবারিক সম্পর্ক, আবেগ এবং মানুষের মধ্যকার মানসিক টানাপোড়েন ও সংঘাতের গল্প নিয়ে তৈরি হয়েছে এই চলচ্চিত্রটি।

এই সিনেমার মাধ্যমে প্রথমবার জুটি বেঁধে বড় পর্দায় আসছেন জয় চৌধুরী এবং মৌ খান। গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে আরও রয়েছেন কাজী হায়াত।

‘স্নেহের বন্ধন’ সিনেমাটিকে ক্যারিয়ারের একটি বড় মাইলফলক ও আবেগের জায়গা হিসেবে উল্লেখ করে চিত্রনায়িকা মৌ খান বলেন, পূজায় মুক্তি পেতে যাওয়া ‘স্নেহের বন্ধন’ আমার ক্যারিয়ারের অন্যতম একটি আবেগের কাজ বলব। এই সিনেমায় আমার চরিত্রটি ভীষণ চ্যালেঞ্জিং, স্ট্রাগলিং (সংগ্রামী) এবং একই সঙ্গে মায়াবী। এটি এমন এক নারীর গল্প, যে পারিবারিক মূল্যবোধ ও ভালোবাসার জন্য যেকোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে।

সিনেমার গল্প বাছাইয়ের কারণ নিয়ে পরিচালক কামরুজ্জামান জানান, ‘স্নেহের বন্ধন’ একটি নিখাদ পারিবারিক বিনোদনের ছবি। তার ভাষ্যমতে, ‘স্নেহের বন্ধন’ সিনেমাটি একটি সত্য ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। এতে মূল প্রাধান্য পেয়েছে আমাদের বাঙালি সমাজের পারিবারিক সম্পর্ক, ভালোবাসা, গভীর আবেগ এবং মানুষের ভেতরের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ও মানসিক টানাপোড়েনের গল্প।

চলচ্চিত্রটি জুলাই মাসে মুক্তি পাওয়ার কথা থাকলেও পরবর্তীতে পূজার উৎসবকে লক্ষ্য করে এর মুক্তির তারিখ নির্ধারণ করা হয়। সিনেমাটির প্রচারণায় অভিনবত্ব এনেছিল ঢাকা শহরে উন্মুক্ত বাসে করা টিম মেম্বারদের রোডশো। সিঙ্গেল স্ক্রিন এবং মাল্টিপ্লেক্স দুই জায়গাতেই এই সিনেমাটি ভালো দর্শক টানবে বলে আশাবাদী এর প্রযোজক ও পরিচালকেরা।

ঈদ ছাড়াই বড় উৎসবের সাহস

সাধারণত বাংলাদেশে বড় বাজেটের বা বেশি সংখ্যক সিনেমা মুক্তির জন্য ঈদকেই একমাত্র উপযুক্ত সময় মনে করা হয়। তবে এবার দুর্গাপূজার মতো একটি সার্বজনীন উৎসবের দীর্ঘ ছুটিকে কেন্দ্র করে একসঙ্গে তিনটি সিনেমা মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্তকে ঢাকাই সিনেমার জন্য একটি সাহসী রূপান্তর হিসেবে দেখছেন অনেকে।

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এবং ‘স্নেহের বন্ধন’-এর প্রধান নায়ক জয় চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বলেন, ঈদের বাইরে সিনেমা মুক্তি দেওয়া এখনকার দিনে অত্যন্ত সাহসী একটি সিদ্ধান্ত। আমাদের প্রযোজকেরা যে এই সাহস দেখিয়েছেন, তার জন্য তাদের ধন্যবাদ জানানো উচিত।

ক্যাম্পাস লাইফ, ক্রাইম থ্রিলার এবং ফ্যামিলি ড্রামা—একই দিনে সম্পূর্ণ ভিন্ন ঘরানার ও ভিন্ন স্বাদের তিনটি সিনেমা মুক্তি পাওয়ায় দর্শকেরা এবার নিজেদের পছন্দ ও রুচি অনুযায়ী প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে চলচ্চিত্র বেছে নেওয়ার এক চমৎকার সুযোগ পাচ্ছেন। প্রতিটি সিনেমাই নির্মাণশৈলী, প্রেক্ষাপট ও কাহিনীর দিক থেকে অনন্য হওয়ায় উৎসবের এই আমেজ রূপালি পর্দায় আরও জমজমাট হয়ে উঠবে বলে চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। এখন দেখার বিষয়, বৈচিত্র্যময় এই গল্পগুলোর মধ্যে কোনটি দর্শকদের হৃদয় সবচেয়ে বেশি স্পর্শ করতে পারে এবং শারদীয় পূজার এই দীর্ঘ ছুটির বাজারে শেষ পর্যন্ত বক্স অফিসে বাজিমাত করে বাণিজ্যিক সাফল্যের শেষ হাসি হাসে!

মন্তব্য

0 মন্তব্য

আরও পড়ুন