আশুলিয়ায় পোশাকশ্রমিক সুমির মৃত্যু, সিসিটিভি ফুটেজে কর্মকর্তার তেড়ে আসার দৃশ্য
ছুটি না পাওয়া ও নির্যাতনের অভিযোগ তুলে আইনি ব্যবস্থার দাবি শ্রমিক নেতার, মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ার কথা বলছে কারখানা কর্তৃপক্ষ
ঢাকা জেলা প্রতিনিধি · ঢাকা
প্রকাশ:
ঢাকার আশুলিয়ায় একটি পোশাক কারখানায় কাজ করার সময় সুমি আক্তার ওরফে মিশু (২৭) নামের এক নারী শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বিকালে ডেকো গ্রুপের প্রতিষ্ঠান আগামী অ্যাপারেলস লিমিটেডে এ ঘটনা ঘটে। কারখানার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, মেশিনে কাজ করার সময় এক পুরুষ কর্মকর্তা বারবার ওই শ্রমিকের দিকে তেড়ে যাচ্ছেন এবং তাঁর মেশিনে আঘাত করছেন। একপর্যায়ে সুমি মেশিনে বসা অবস্থায় মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন।
বিজ্ঞাপন
অভিযোগ উঠেছে, অসুস্থবোধ করায় সুমি কর্তৃপক্ষের কাছে ছুটি চেয়েছিলেন, কিন্তু তাঁকে ছুটি দেওয়া হয়নি। সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও উৎপাদনের চাপে তাঁকে কাজ করতে হচ্ছিল। কাজের সময় এক কর্মকর্তা তাঁর সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন এবং শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালান বলে অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যেই তিনি মেশিনে বসা অবস্থায় পড়ে যান। পরে কারখানার মেডিক্যাল সেন্টারে তাঁর মৃত্যু হয়।
নিহত সুমি আক্তার রংপুরের ডিমলা উপজেলার খোকারহাট এলাকার বজলার মিয়ার মেয়ে। স্বামী সাজ্জাদ হোসেন ও দুই ছেলেকে নিয়ে তিনি আশুলিয়ার কাঠগড়া নয়াপাড়া এলাকায় সালামের বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। আগামী অ্যাপারেলস লিমিটেডে তিনি সুইং অপারেটর ছিলেন।
কারখানার সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী, বিকাল ৫টা ১ মিনিট ৯ সেকেন্ডে সুমি নিজের মেশিনে কাজ করছিলেন। তাঁর পাশে তখন পাঞ্জাবি পরা একজন পুরুষ কর্মকর্তা দাঁড়িয়ে ছিলেন। ৫টা ১ মিনিট ১৪ সেকেন্ডে কিছুটা দূরে দাঁড়ানো পাঞ্জাবি পরা আরেক কর্মকর্তা তাঁর দিকে তেড়ে আসেন। তিনি সুমির মেশিন চাপড়াতে থাকেন এবং কয়েক দফায় উদ্ধত আচরণ করেন। একপর্যায়ে সুমির হাত থেকে কাজের কাপড়টি নিয়ে ফেলে দেন।
ফুটেজে আরও দেখা যায়, এসব ঘটনার মধ্যেই বিকাল ৫টা ১ মিনিট ৩৪ সেকেন্ডে সুমি মেশিনে বসা অবস্থায় ফ্লোরে লুটিয়ে পড়েন। তখন ওই কর্মকর্তা কিছুটা দূরে সরে যান। সুমিকে পড়ে যেতে দেখে পাশের মেশিনে কাজ করা নারী শ্রমিকেরা একে একে তাঁর কাছে এগিয়ে আসেন। বিকাল ৫টা ৪ মিনিট ১৬ সেকেন্ডে তাঁকে একটি স্ট্রেচারে তোলা হয়।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড সোয়েটার শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু সিসিটিভি ফুটেজ এবং নিহতের স্বজন ও সহকর্মীদের বরাত দিয়ে জানান, শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন হলেও কারখানায় উৎপাদন চলছিল। সুমি অসুস্থ শরীর নিয়েই কাজে যোগ দিয়েছিলেন। দুপুরে বাসায় খেতে গিয়ে তিনি ছেলেকে বলেন, শরীর খারাপ লাগছে, কারখানায় প্রচুর কাজের চাপ, ছুটি চেয়েছিলেন কিন্তু ছুটি দেয়নি। এ কথা বলে খাবার খেয়ে তিনি আবার কারখানায় চলে যান।
মিন্টুর অভিযোগ, সাপ্তাহিক ছুটির দিনে সুমির বাসায় থাকার কথা থাকলেও তাঁকে কারখানায় কাজ করতে হয়েছে। তাঁর মতে, সিসিটিভি ফুটেজে সুমির অসুস্থতা এবং কাজের চাপের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। মিন্টু বলেন, অসুস্থ সুমি ঠিকমতো উৎপাদন করতে পারছিলেন না। কারখানা ছুটি হওয়ার কথা ছিল ৫টায়, কিন্তু ৫টা বাজার পরও তাঁকে কাজ করতে হচ্ছিল। মেশিনে কর্মরত অবস্থায় ৫টা ১ মিনিট ১৪ সেকেন্ডে এক কর্মকর্তা তাঁর দিকে তেড়ে আসেন এবং দফায় দফায় খারাপ আচরণ, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতে থাকেন। এর মধ্যেই সুমি মেশিনে বসা অবস্থায় লুটিয়ে পড়েন এবং পরে কারখানার মেডিক্যাল সেন্টারে মারা যান। মৃতদেহ নারী ও শিশু হাসপাতালে নেওয়া হয়।
খাইরুল মামুন মিন্টুর দাবি, এ ঘটনায় কারখানা কর্তৃপক্ষের দায় রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, অসুস্থ শ্রমিককে সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও কাজে বাধ্য করা হয়েছে এবং ছুটি না দিয়ে তাঁর ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়েছে। তিনি বলেন, ‘তার মৃত্যুর দায় কারখানা কর্তৃপক্ষ এড়াতে পারে না। কারখানার মালিক ও কর্তৃপক্ষসহ যে কর্মকর্তা ওই নারী শ্রমিককে নির্যাতন করেছেন, প্রত্যেককেই আইনের আওতায় আনতে হবে।’
এ বিষয়ে জানতে আগামী অ্যাপারেলস লিমিটেডের চেয়ারম্যান এম শাহাদাত হোসেন কিরনের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। তবে কারখানাটির মানবসম্পদ বিভাগের এক্সিকিউটিভ অফিসার হাসান মুঠোফোনে জানান, ছুটির ঠিক আগে সুমি মাথা ঘুরে ফ্লোরে পড়ে যান। পরে তাঁকে কারখানার মেডিক্যাল সেন্টারে নেওয়া হয় এবং সেখান থেকে নারী ও শিশু হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানকার চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
বিজ্ঞাপন
সুমি অসুস্থবোধ করায় ছুটি চেয়েছিলেন, কিন্তু তাঁকে ছুটি দেওয়া হয়নি—এ অভিযোগ অস্বীকার করেন হাসান। তাঁর দাবি, সুমি অসুস্থতার কথা জানিয়ে ছুটি চাননি এবং কারখানা কর্তৃপক্ষকেও অসুস্থতার কথা জানাননি। তিনি আরও বলেন, অসুস্থতার কথা বলে ছুটি চাইলে শ্রমিকদের ছুটি দেওয়া হয়। সিসিটিভি ফুটেজে এক কর্মকর্তাকে সুমির সঙ্গে খারাপ আচরণ করতে দেখা যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে হাসান ওই কর্মকর্তার নাম জানাননি। প্রশ্ন করার পর তিনি মুঠোফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
নারী ও শিশু হাসপাতালের সিনিয়র ম্যানেজার (অপারেশন) হারুন-অর-রশীদ জানান, আগামী অ্যাপারেলস থেকে সুমি আক্তার মিশু নামে ওই নারী শ্রমিককে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছিল। চিকিৎসকেরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখেন, তিনি মারা গেছেন। সেখানে নিহতের স্বামী সাজ্জাদ হোসেন ও কারখানা কর্তৃপক্ষ উপস্থিত ছিলেন। হারুন-অর-রশীদের ভাষ্য, স্বামী জানিয়েছিলেন তাঁর কোনও অভিযোগ নেই এবং তিনি মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। পরে মৃত্যু সনদ দিয়ে কারখানা কর্তৃপক্ষ ও স্বামীর কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়।